পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবারের রাজনীতিও এই পরিস্থিতির কারণে চাপের মুখে পড়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে মেডিকেল বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

স্বাভাবিক সাংবিধানিক ব্যবস্থায় এগুলো একজন বন্দির মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় চিকিৎসার অধিকারও বড় ধরনের সাংবিধানিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকার আদালতের রায়ের একটি অংশ চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করায় পরিস্থিতির বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনী প্রকৌশল, রাজনৈতিক মামলা, দমন-পীড়ন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা যেখানে সহনীয় হয়ে উঠেছে, সেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়াই যেন বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।

ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা। জনসভা, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা, একের পর এক মামলায় ব্যস্ত রাখা এবং তার দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো।

রাষ্ট্র একজন রাজনীতিককে বন্দি করেছে, আর সেই বন্দিত্বই তাকে একটি রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করেছে।

এটাই আসিম মুনিরের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।

একজন সুস্থ বন্দিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু একজন দৃশ্যত অসুস্থ রাজনৈতিক বন্দি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতীকে পরিণত হতে পারেন। আর কারাগারে কোনো রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু ঘটলে তা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

ইমরান খানকে মুক্তি দেওয়া হলে তিনি কারাগারে যাওয়ার আগের সেই রাজনীতিক হিসেবে ফিরবেন না। বরং বয়স, শারীরিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বন্দিত্ব তাকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করতে পারে।

তার হাতে তখন থাকবে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক যুক্তি—একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো থেকে বিরত রাখতে রাষ্ট্রের পুরো কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, কারাগারে ইমরান খানের মৃত্যু ঘটলে বিষয়টি আর রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

একজন জীবিত রাজনীতিককে সমালোচনা, ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো যায়। কিন্তু মৃত রাজনৈতিক বন্দি অনেক সময় স্মৃতিতে একটি সরল প্রতীকে পরিণত হন। তখন আইনি যুক্তি কিংবা মামলার দীর্ঘ বিবরণ মানুষের মনে ততটা প্রভাব ফেলে না।

শেষ পর্যন্ত থেকে যেতে পারে একটি দৃশ্য—দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকার পর চিকিৎসার দাবির মধ্যেই একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু।

এই পরিস্থিতিতে শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবারও রাজনৈতিক দায় এড়াতে পারবে না বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

একদিকে তারা গণতন্ত্র ও সাংবিধানিকতার কথা বলে, অন্যদিকে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার স্থিতিশীলতা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিষ্ক্রিয় রাখার ওপর নির্ভর করছে।

তারা বেসামরিক কর্তৃত্বের কথা বললেও রাওয়ালপিন্ডির দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় ক্ষমতা পরিচালনা করছে। ফলে জনগণের কাছে নির্বাচনী রাজনীতি ক্রমেই একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশ কেবল একজন বন্দির চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র একজন চিকিৎসককে ভয় পাওয়ার কথা নয়। একজন আত্মবিশ্বাসী সরকার একজন বন্দির পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার নিয়ে আদালতে লড়াই করার প্রয়োজন বোধ করে না।

ইমরান খানকে জীবিত রাখলে তার রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জ করবে। মুক্তি দিলে সেই শক্তি আবার রাজপথে ফিরতে পারে। আর কারাগারে তার মৃত্যু হলে সেই শক্তি আরও দীর্ঘস্থায়ী প্রতীকে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থাৎ, ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামো এক ধরনের রাজনৈতিক ফাঁদে আটকে পড়েছে।

রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতাকেন্দ্র এমন একজন বন্দিকে পেয়েছে, যাকে সহজে মুক্তি দেওয়া যায় না, রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া যায় না, আবার হারিয়েও ফেলা যায় না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ইমরান খানের মুক্তি বা কারাবাসের নয়। প্রশ্নটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা কতটা অবশিষ্ট রয়েছে—সেটি নিয়ে।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

এস