‘ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫): সাউদার্ন রুট’ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে আসবে প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরে পর্যালোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা করা হয়। সর্বশেষ পুনর্মূল্যায়নে আরও ২ হাজার ২১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমিয়ে ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় নামানো হয়েছে। অর্থাৎ মূল প্রস্তাবের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় কমেছে ৯ হাজার ১১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রকল্পের কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্রের নথি প্রস্তুত করা হয়েছে। সিপি-১ থেকে সিপি-৪-এর চূড়ান্ত দরপত্র নথি প্রস্তুত হয়েছে এবং এডিবির সম্মতিও পাওয়া গেছে। সিপি-৬ ও সিপি-৭-এর নথি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিপি-৮ ও সিপি-৯-এর দরপত্র নথিও প্রস্তুত করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, ডিপিপির আর্থিক বিশ্লেষণে নিট বর্তমান মূল্য ঋণাত্মক ৫ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও শূন্য দশমিক ৯৫ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ভাড়া ও পরিচালন আয় বিবেচনায় নিলে প্রকল্পটির বিনিয়োগ পুরোপুরি ফেরত আসবে না। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সময় সাশ্রয়, যানজট কমানো, জ্বালানি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো বৃহত্তর সুফল বিবেচনা করে প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক দেখানো হয়েছে।
দুই দফা ব্যয় কমিয়ে প্রকল্পটি এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায়। অনুমোদন পাওয়া গেলে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তকে যুক্ত করা এই মেট্রোরেল করিডোরের ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র ও নির্মাণ প্রস্তুতির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের বাজেটে ঋণের সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জ রাখার প্রয়োজন নেই। অর্থ বিভাগের নিয়মিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব পরিশোধ করা হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে ডিপিপি থেকে বড় একটি ব্যয়ের খাত বাদ পড়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণও কমানো হয়েছে। শুরুতে ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর জমির প্রয়োজন ধরা হলেও সর্বশেষ তা কমিয়ে ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর করা হয়েছে। এতে ভূমি অধিগ্রহণ খাতেই প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। গাড়ি কেনা, পরামর্শক ব্যয়, সম্মানি ও অন্যান্য প্রশাসনিক খাতেও ব্যয় কমানো হয়েছে।
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পুরো রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ। গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাসিরাবাদ ও দাশেরকান্দি এলাকায় মোট ১৫টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি হবে পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন।
পাতাল অংশের টানেল মাটির উপরিভাগ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে হাতিরঝিলের নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণের কারণে প্রকল্পের নির্মাণকাজ হবে জটিল। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত বড় অংশ ভূগর্ভস্থ হওয়ায় এই অংশের নির্মাণে সময় ও ব্যয় দুটিই বেশি হবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
৩০ মিনিটে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি
ডিএমটিসিএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পুরো পথ অতিক্রম করতে সময় লাগবে প্রায় ২৮ মিনিট। বর্তমানে যানজটের কারণে একই পথে যাতায়াতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। শুরুতে ছয় কোচের ১৯ সেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে। ট্রেন চলাচলের ব্যবধান শুরুতে ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড রাখা হবে। পরে তা কমিয়ে ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিএমটিসিএলের হিসাবে, মেট্রোরেলটি চালু হলে বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে এবং জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুতগতির গণপরিবহন যোগাযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমি অধিগ্রহণে প্রায় এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। এ সময়ের মধ্যে দরপত্রসহ অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ সরকার দেবে। ফলে বৈদেশিক ঋণ চূড়ান্ত হতে সময় লাগলেও প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। পাতাল টানেল নির্মাণেই প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব বলেন, প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সভায় উপস্থাপন করা সম্ভব না হলেও পরবর্তী একনেক সভায় এটি তোলা হবে।
তিনি জানান, প্রকল্পের বড় অংশই পাতাল। গাবতলী থেকে হাতিরঝিল হয়ে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশ মাটির নিচ দিয়ে এবং আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে।
সর্বশেষ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে ঋণের সুদ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক খাতের ব্যয় বাদ দেওয়া। প্রকল্প পরিচালক আব্দুল ওহাব বলেন, সর্বশেষ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস এবং সুদের হিসাব সংশোধন করা হয়েছে। ঋণের মোরাটোরিয়াম শেষ হওয়ার পর যে সুদ পরিশোধ করতে হবে, তা প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব থেকে আলাদা করা হয়েছে। এ পরিবর্তনের ফলে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমেছে।
প্রকল্প পরিচালক আব্দুল ওহাব বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন আটকে থাকা প্রকল্পটি আবার সক্রিয় হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং ভূমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এনএইচ