এই প্রতিযোগিতায় রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডনাটা। জাপানি কনসোর্টিয়ামের অধীনে তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, কারিগরি সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত অপারেটর নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের প্রাধান্য রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে এ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি সেবার মান, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পরিচালন দক্ষতায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় এগিয়ে মেনজিস

আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের ব্যাপ্তি ও অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিযোগিতায় আলোচনায় রয়েছে মেনজিস এভিয়েশন। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৬৫টি দেশের ৩৫০টি বিমানবন্দরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৬৫ হাজার কর্মী।

যাত্রীসেবা, কার্গো ব্যবস্থাপনা, বিমান পরিচালনায় ভূমিসেবা এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঢাকায় আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবলনির্ভর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে তারা।

অন্যদিকে, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন পাঁচটি দেশে ৬০টিরও বেশি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৯ হাজার কর্মী রয়েছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের ব্যাপ্তি বেশি হলেই কোনো প্রতিষ্ঠান চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারিগরি সক্ষমতা, বিনিয়োগের বাস্তবতা, নিরাপত্তা মানদণ্ড, আর্থিক প্রস্তাব এবং বিমানবন্দরের চাহিদা পূরণের সক্ষমতাই চূড়ান্ত নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

১ কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা

বাংলাদেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে মেনজিস এভিয়েশন। বাংলাদেশি মুদ্রায় বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।

প্রস্তাবিত বিনিয়োগের আওতায় গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিচালনব্যবস্থা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, বিমানকে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করা এবং অন্যান্য ভূমিসেবার কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মেনজিসের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। এসব পদের প্রায় ৯৯ শতাংশ স্থানীয়ভাবে নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহনসেবা, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত এসব প্রতিশ্রুতি প্রস্তাবনানির্ভর। চূড়ান্ত অনুমোদন, চুক্তি এবং কার্যক্রম শুরুর পরই বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

দেশে এভিয়েশন প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব

মেনজিসের প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশে একটি এভিয়েশন প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা বিষয়ে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা গেলে দেশে দক্ষ এভিয়েশন কর্মী তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদানের সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হবে।

এভিয়েশন খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে যাত্রী ও ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদাও বাড়তে পারে।

আগে থেকেই প্রস্তুতির দাবি মেনজিসের

বাংলাদেশের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ নতুন নয় মেনজিস এভিয়েশনের। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানিগুলোর লাইসেন্সের জন্য আবেদন আহ্বানসংক্রান্ত এয়ার নেভিগেশন আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা বেবিচকে আবেদন জমা দিয়েছিল।

মেনজিসের দাবি, ওই প্রক্রিয়ায় তাদের আবেদনটি প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পরিচালনাগত নথিপত্রসহ জমা দেওয়া হয়েছিল। এতে নিরাপত্তা নির্দেশিকা, কার্যক্রম পরিচালনার মানদণ্ড এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক নথি অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে মেনজিস বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি স্থানীয় কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে বলেও জানিয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও প্রস্তুত করা পরিচালনব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে তিন মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব বলে তাদের দাবি।

তবে আগের আবেদন বা অনুমোদনের বর্তমান প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিকতা এবং কার্যক্রম শুরুর সময়সীমা সম্পর্কে বেবিচকের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

যাত্রীসেবার মান উন্নয়নই বড় চ্যালেঞ্জ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সরবরাহে বিলম্ব, বিমানকে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত সময় লাগা এবং ভূমিসেবার সমন্বয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর যুক্ত হলে সেবার মান উন্নয়ন, আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার এবং পরিচালন কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করলেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা সূচক, নিয়মিত তদারকি এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ব্যাগেজ সরবরাহের নির্ধারিত সময়, বিমান প্রস্তুতকরণের দক্ষতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেবায় ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জরিমানার মতো বিষয়গুলো চুক্তিতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতার নতুন সুযোগ

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এভিয়েশন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপযুক্ত অপারেটর নির্বাচন করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

মেনজিস এভিয়েশনের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক কার্যক্রম, প্রস্তাবিত বিনিয়োগ, স্থানীয় কর্মী নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রেখেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন, আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব এবং চুক্তির শর্তের ওপর।

সংশ্লিষ্টদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর সেবায় রূপ নেয়। তৃতীয় টার্মিনালের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে নিরাপদ বিমান পরিচালনা, দ্রুত ব্যাগেজ সরবরাহ, উন্নত যাত্রীসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে।

এমএম