মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও সিআইডি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি সিআইডির তদন্ত দল অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে আলোচিত এ মামলার খসড়া জমা দিয়েছে। এতে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালক এবং দেশে অবস্থানকারী কয়েকজন ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্তে গতি আসে। এর আগে মামলাটি একাধিকবার তদন্ত করা হয়। সিআইডি চার্জশিট দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে দেয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খানকে অন্তত ছয়বার পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাকে দীর্ঘদিন কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল।

মামলার তদন্তের স্বার্থে যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছিল, রায়হান উদ্দিন খান সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং চিঠি চালাচালির মাধ্যমে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে নানা চাপের কারণে তা আর এগোয়নি। পরে শেখ হাসিনা সরকারের পছন্দের কর্মকর্তাদের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা তদন্তের নামে মামলাটি দীর্ঘায়িত করেন। একপর্যায়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে দেশে রিজার্ভ চুরির মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

জানা গেছে, রায়হান উদ্দিন খান ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মামলাটি তদন্ত করেন। সে সময় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বাইরের ১০ জন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পান। পরে তাঁদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এরপর তাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে জয়পুরহাটে বদলি করা হয়। পরে তাঁকে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে পাঠানো হয়।

তদন্ত চলাকালে ১০১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনার উদ্যোগে তিনি সফল হন। পরে অবশিষ্ট অর্থ ফেরতের চেষ্টা করলেও তাকে সরিয়ে দেওয়ায় সে প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। এখনো উদ্ধার হয়নি ৬৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলাটি নতুন গতি পায়। নতুন করে তদন্ত পর্যালোচনার জন্য ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির একজন সদস্য জানান, তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা, বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান সঠিকভাবে তদন্ত করেছিলেন। তিনি প্রায় সব তথ্যই বের করেছিলেন, কিন্তু তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার পর তিনি তদন্ত শুরু করতে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে ৪১ দিন ক্রাইম সিনে প্রবেশ করতে দেয়নি। অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও অননুমোদিত ব্যক্তিদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সিআইডির ল্যাবে পাঠান। অনুমতি পাওয়ার পর কষ্ট করে আলামত সংগ্রহ করে তদন্তে গতি আনেন।

সিআইডির এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, রায়হান উদ্দিন খান তদন্তে প্রায় ৭০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পান। এ নিয়ে ২০২০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। সেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ সংশ্লিষ্টরা তাঁকে দেশে জড়িতদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সে সময় ব্যাংকের আইটি ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় তদারকির দায়িত্ব একজন ভারতীয় নাগরিককে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণেই এমন বড় ধরনের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

শুধু দেশে নয়, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির এ ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে খসড়া অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশের ১০ জনের নাম রয়েছে। সব মিলিয়ে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও চীনের নাগরিকসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে।

সিআইডির প্রধান আলী আকবর খান ঢাকা মেইলকে বলেন, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান। চার্জশিট দাখিলের পর আইন অনুযায়ী যা যা করার, আমরা তা করব।

তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জমা দেওয়া চার্জশিটের খসড়া বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। শুধু বলেন, আমরা এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিইনি। আরও সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে।

এদিকে সিআইডির একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে একটি খসড়া চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিলের আগেই বাংলাদেশের জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। গ্রেপ্তারের আগে তারা যাতে সীমান্ত ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ওপর নজরদারিও চলছে।

এস