রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তাঁকে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে রাত পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়। এর পরদিনই প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এল।
দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে তিনি কেন নিজেই অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাজধানীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকা আকস্মিক পরিদর্শন করে বিভিন্ন সেবার মান উন্নয়নে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তখন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য বলেন, ঘটনাটি আর শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও বিব্রত হয়েছেন। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভার ওপরও বর্তায়।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থান পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এসব কার্যক্রমের দিনই বিকেলে ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিবাচক আলোচনা আড়ালে পড়ে যায় বলে মনে করছেন দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
এ পরিস্থিতিতে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আচরণ ও জবাবদিহির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অস্ত্র হাতে অভিযানে যা ঘটেছিল
শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করছেন ইশরাক, ‘এই ধর ধর ধর...।’ এ সময় তাঁর পাশে থাকা একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীদের কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াতে দেখা যায়। তাঁদের একজন এক তরুণকে লাথি মারেন। এ সময় কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ, স্যার।’ অন্য একটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের দৃশ্য দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন। ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তলের ছবি অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা গেছে। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনার পর একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযান পরিচালনার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দেওয়া হয়েছে। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আত্মরক্ষার যুক্তি ইশরাকের
অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে সমালোচনার মধ্যে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ইশরাকের ভাষ্য, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তবে এসব উদ্যোগে সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে ইশরাক বলেন, অভিযানের আগে তিনি জানতে পারেন, মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
নিজের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত দাবি করে ইশরাক বলেন, আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই তিনি সেটি প্রদর্শন করেছিলেন। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযানে চার-পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন ইশরাক। এসব তথ্য উপেক্ষা করে কয়েকটি গণমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী।
তবে অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানান, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে অভিযানের বিষয়ে অবহিত করেননি। পরে তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন।
বিতর্কের জেরে এর আগে পদ ছাড়েন মিষ্টি
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে পড়ার পর এর আগে পদত্যাগ করেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসে। ঘটনাটি নিয়ে সরকার ও দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে সংসদ সচিবালয় তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে।
মিষ্টির পদত্যাগের প্রায় আড়াই সপ্তাহের মাথায় এবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কে জড়ালেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করার পর পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এসেছে।
সূত্র : প্রথম আলো











