রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল থেকে নিহতদের স্বজনেরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন। প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করতে না পারায় তাঁদের মধ্যে শোক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, নিহত ১০ জনের মধ্যে সাতজনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে পুলিশ। তাঁদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, আগুনে মরদেহগুলো এমনভাবে পুড়ে গেছে যে, দেখে কোনটি কার মরদেহ তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, দগ্ধ ও বিকৃত মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। কক্সবাজারে এ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ল্যাব ও যন্ত্রপাতি না থাকায় নমুনা ঢাকার অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে পাঠাতে হচ্ছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহগুলো হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
নিহতদের স্বজনদের একজন সামুশুদ্দোহা জানান, তাঁর পরিবারের চারজনের মরদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছোট শিশুটির হাতে ব্যাটারিচালিত একটি খেলনা থাকায় তিনি তাকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে অন্যদের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হবে। প্রিয়জনদের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
এখন পর্যন্ত যাঁদের পরিচয় জানা গেছে, তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাঁদের মধ্যে দুজন নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ।
অগ্নিকাণ্ডের পর যশোরের একই পরিবারের চারজনেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা হলেন নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোবাইনা (৭) ও সুনাইনা (৩)।
গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিসোর্টটির ২০২ নম্বর কক্ষে তাঁদের থাকার বুকিং ছিল। নিহতদের তালিকায় তাঁদের নাম না থাকলেও শনিবার রাত পর্যন্ত তাঁদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁরা অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন কি না, তা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
নাহিদুর রহমান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে ঢাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তারেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার তিনি দুই বান্ধবী আইরীন জাহান ও ইসরাত জাহানের সঙ্গে টুপটুপ রিসোর্টে উঠেছিলেন।
আইরীন জাহান জানান, শনিবার ভোরে তাঁরা সূর্যোদয় দেখতে সমুদ্রসৈকতে যান। নাসরিনকে সঙ্গে যেতে বললেও ঘুমানোর জন্য তিনি রিসোর্টে থেকে যান। কিছুক্ষণ পর তাঁরা ফিরে এসে দেখেন, রিসোর্টে আগুন জ্বলছে।
খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসেন নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল। তিনি ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি। ছয় বছর আগে নাসরিনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। নাসরিন আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।
দেওয়ান ফয়সাল বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টে ছুটে গিয়েও নাসরিনকে পেলাম না। হাসপাতালে লাশের যে অবস্থা দেখলাম, কারও পরিচয় শনাক্ত করার উপায় নেই। পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট লাগবে।’
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির নির্মাণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের ভাষ্য, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, রিসোর্টটিতে কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। সেখানে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এসবের কোনোটিই পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, কাঠের তৈরি স্থাপনাটিতে সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, রিসোর্টটি অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি অপসারণের জন্য কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস একাধিকবার নোটিশ দিয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরও সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছিল।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে উখিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর আহমদ (তানভীর সুলতান মিয়া), তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদ, রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পর রিসোর্টের মালিক আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটক নিহত হন এবং দগ্ধ হন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উড়োজাহাজে ঢাকায় পাঠানো হয়। বাকি দুজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
এস
















