হামাস মিশরের যুদ্ধ বিরতি মেনে নেয়নি। অতএব, তারাই এই মুহূর্তে এ সংঘাতের জন্য দায়ী। একটা জটিল বিষয়ের এর চেয়ে সরলীকরণ ন্যারেটিভ আর হয় না !

২০১২ সালে মিশর যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল। সে সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন মুহাম্মদ মুরসি। মুরসি বা মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে হামাসের সখ্যতার কথা সবাই জানে। আদর্শিকভাবে হামাস মুসলিম ব্রাদারহুডের অফশুট। জেনারেল সিসি ক্ষমতায় আসার পর মুরসির বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ আনা হয় এর একটি ছিল তিনি হামাসের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছেন। সিসির সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে এবং দলটিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা করেছে। সাথে হামাসকেও তারা সন্ত্রাসী দল হিসেবে তালিকভুক্ত করেছে।
মুসলিম ব্রাদারহুডের পতনের কারণ সম্পর্কে একটু জানা থাকলে দেখা যাবে যে,সিসির সাথে ইসরাইলের এই বিষয়ে অনেক আগে থেকেই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। মুরসিকে অপসারণের পর ইসরাইল সিসিকে জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়া মুরসির পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে পুরো দেশে জালানি তেল এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়, যেটা মিলিটারি ক্যু এর মাধ্যমে মুরসিকে অপসারণের একিদনের মধ্যেই মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। আসলে এটা ছিল সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে তৈরি একটি কৃত্তিম সংকট। এটা ওপেন সিক্রেট যে মিশরের ইকোনমির প্রায় ৪০ ভাগ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই ব্ল্যাক ইকোনমির ব্যপারে কেউ তাদের কাছ থেকে কোন প্রকার জবাবদিহিতা চাইতে পারে না।

মিশর হুসনি মোবারকের সময়ে করা চুক্তি অনুসারে ২০০৮-২০১২ সাল পর্যন্ত ইসরাইলকে ইন্টারন্যাশনাল দামের চেয়ে ৮০% কম দামে গ্যাস সরবরাহ করে দেশের অনেক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করেছে। এ চুক্তিতে অনেক প্রকার অস্বচ্ছতা ছিল যেটা মুরসি আসার পর বাতিল করার চেষ্টা করেন। ইসরাইলের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ। এছাড়াও ব্রাদারহুডের ক্ষমতায় আসা মানে মধ্যপ্রাচ্যে হামাস সহ বিশ্বব্যাপী ইসলামিক দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়া যেটা ইসরাইলের জন্য চিন্তার কারণ।ব্রাদারহুড মুরসির সময়ে রাফা বর্ডার খুলে দেয় যেটা দিয়ে গাজায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী প্রবেশ করত। এছাড়াও মিশর এবং গাজার মধ্যবর্তী সুড়ঙ্গগুলো খুলে দেয়। কার্যত সে এক বছর ছিল গাজার মানুষের জন্য 'সুইট ইয়ার'। সিসি ক্ষমতায় আসার পর এসব সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দেন। গাজায় সকল নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ওষুধের মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের আমদানি বন্ধ হয়ে যায় এবং এবারে মিশর ইসরাইল থেকে গ্যস কেনা শুরু করে কিন্ত সেটা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও বেশী দামে যেটি ইসরাইলের জন্য বিরাট অর্থনৈতিক অর্জন।


তিন তরুণ সেটেলারকে অপহরণ বা হত্যার বিষয়টি হামাস স্বীকার করে নি। আগে তারা ইসরাইলি সেনা গিলাত শালিতকে অপহরণ করেছিল এবং বিনিময়ে তারা অনেক বন্দি বিনিময় করেছিল। তিন তরুণের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টিতে হামাস জড়িত কিনা এ ব্যপারে ইসরাইলের অভিযোগ ছাড়া কোন নিশ্চিত প্রমাণ নাই। পক্ষান্তরে ইসরাইল হামলা করে গাজার তিন ভাগের এক ভাগ দখল করে নিতে পারে এ খবর মিশরের কাছে ছিল এবং আগের চুক্তির মধ্যস্থতাকারি হিসেবে এই ব্যপারে মিশর কোন ভূমিকা পালন করেনি।

সিসি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করবেন। কিন্তু ঘোষণার পর পরই আরও ২৯ টি সুড়ঙ্গ গুড়িয়ে দেয়া হয়।সিসি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসরাইলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং ইসরাইলের সাথে মিলে মুরসিকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র , প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইসরাইলের উল্লাস এবং ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি , হামাসকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে গাজার সাথে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হামাসের বর্তমান অবস্থানের কারণ। হামাসের জন্য মিশরের মধ্যস্থতা মেনে নেয়া আর ইসরাইলের কথা শুনা একই কথা। ইনফ্যাক্ট সিসি ইসরাইলের কিছু এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করতে আসবেন। ২০১২ সালের সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধিকাংশ শর্ত ইসরাইল রক্ষা করে নি। সিসির সরকার এ ব্যপারে কোন ভ্রুক্ষেপ করে নি কারণ সে চুক্তি করেছিল মুরসির সরকার।

হামাস চায় কাতার বা তুরস্কের মধ্যস্থতা। সৌদি-আরব আমিরাত সহ সব আরব দেশ যখন মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করার পেছনে সমর্থন এবং অর্থ দিয়েছে সে সময় কাতার এবং তুরস্ক তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আগে বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সাহায্য ছাড়াও হামাস সরকারের ৫০ হাজার এমপ্লিয়র বেতন পরিশোধ করার জন্য সম্প্রতি অনুদান দিয়েছে যেটি মাহমুদ আব্বাসের সরকারের সাথে হামাসের ঐক্যমতের সরকার হওয়ার পরও তারা এখনো সে টাকা দেয়নি। উপরন্তু, ফাতাহ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ইসরাইলের স্বরে বক্তব্য দিয়ে বলেছেন-"ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে যতক্ষণ পর্যন্ত রকেট নিক্ষেপ চলতে থাকবে। ইসরাইলের এই প্রতিশোধ ঠিক আছে যতক্ষণ এটা সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে এবং হামাসের শক্তি বৃদ্ধি না করে"।

এছাড়া তুরস্ক অনেক বছর ধরে গাজার থেকে ইসরাইলের অবরোধ উঠানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে। গাজায় প্রেরিত তুরস্কের ত্রান জাহাজকে আক্রমণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরাইল তুরস্কের মধ্যে সম্পরকের অবনতি ঘটে। তুরস্ক ইসরাইল থেকে নিজদের দূত প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনঃরায় স্থাপনের জন্য ইসরাইলের ক্ষমা, ক্ষতি পূরণ সহ গাজার উপর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস প্রবেশের উপর অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার শর্ত আরোপ করে। যখন তুরস্ক গাজায় ত্রাণ জাহাজ প্রেরণ করে সে সময়ে ইসরাইল এবং তুরস্কের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ছিল যার বড় অংশ পরবর্তীতে কমে যায়।

ঘরে বাইরে শত্রু বেস্টিত হামাসের জন্য তাই কোনভাবেই মিশরকে বিশ্বাস করার প্রশ্ন যৌক্তিক না। তারা চায় তাদের পরিক্ষিত মিত্র কাতার বা তুরস্কের মধ্যস্থতা যার ফলে গাজার উপর আরোপিত অবরোধ নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারি দেশ চুক্তির বিভিন্ন শর্ত মানা হচ্ছে কিনা সে ব্যপারে খেয়াল রাখবে। সাথে সাথে হামাসের অফিসিয়ালরা বলেছেন এ অবস্থায় তারা চান অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চুক্তি হোক কেননা শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, আহত হচ্ছে, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। তবে তারা চান সকল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবে এমন কোন পরীক্ষিত মিত্র আলোচনার সূত্রপাত করুক। তারা সিসির সরকার দ্বারা প্রতারিত হতে চায় না যেটা অত্যন্ত যৌক্তিক অবস্থান।

জাহিদুল ইসলাম রাজন
শিক্ষার্থী, কে টি এইচ রয়েল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, স্টকহোম, সুইডেন

 

তথ্যসূত্র: লেখাটি বিডি টুডে থেকে নেওয়া।

রেফারেন্সঃ
১। http://webapps.aljazeera.net/aje/custom/2014/egyptlostpower/index.html
২।http://www.middleeasteye.net/news/exclusive-hamas-rules-egypt-out-negotiator-ceasefire-643526903
৩। http://tariqramadan.com/english/2013/07/09/egypt-coup-detat-act-ii/
৪।http://www.dailysabah.com/politics/2014/07/14/turkeys-erdogan-says-no-normalization-with-israel
৫।http://www.frequency.com/video/israel-speech-made-by-erdogan-3-days-ago/181163390/-/5-241
৬।http://tariqramadan.com/english/2013/08/17/horror-in-egypt-saying-it-once-saying-it-again/

 

ঢাকা, ১৫জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম)// টিআই