প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। তাঁর সেই লেখাটির শিরোনাম 'আওয়ামী লীগই পারে, আওয়ামী লীগই পারবে'।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামক দলটির জন্ম হয়েছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে এই দেশ তার স্বাধীনতা খুইয়েছিল। আবার ২০১৪ সালের ২৩ জুন এদেশের মানুষ এই দুটি দিবসের সংবাদের সাথে সাথে আরো একটি বিশেষ সংবাদ পত্রিকার পাতায় আবিস্কার করল। সেটি হলো গৌরীপুরের কলতাপাড়ার প্রান্তরে এক প্রফেসর সাবের ইজ্জত-আভ্রু খোয়ানোর খবর।

দেশের স্বাধীনতা খোয়ানো, দেশের গনতন্ত্র খোয়ানো (একই দিনে জন্ম নেয়া দলটির হাতে) এবং সর্বশেষ জনগণের ইজ্জত-আভ্রু খোয়ানো সব এক লাইনে দাড়িয়ে পড়েছে।

মনে প্রশ্ন জেগেছে, ২৩ জুনের এই দিনটি কি আসলেই অপয়া? এই দিনটিতে জন্ম হয়েছিল বলেই কি মওলানা ভাসানী ও শামসুল হকদের প্রতিষ্ঠিত সেই দলটি আজ শামীম ওসমান,হাজারী, মায়া, কামরুল,হানিফ, হাসান মাহমুদ প্রমুখদের দল হয়ে পড়েছে? সুস্থ্য স্বাভাবিক কোন মানুষকে এই দলটিতে এখন বাটি চালান দিয়ে খুজতে হবে।

যে দিনটিকে উপলক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই লেখাটিকে কথার মালা দিয়ে সুশোভিত করেছেন সেই একই সময় তাঁর সোনার ছেলেরা এক প্রফেসর সাবকে দিগম্বর করেছেন। ময়মনসিংহের মমিনুন্নেছা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহযোগি অধ্যাপক মোঃ ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদকে সরকার দলীয় এমপি এবং সদ্য প্রাক্তন এক মন্ত্রীর কর্মী সমর্থকগণ উলঙ্গ করে ফেলেছেন । অধ্যাপক সাবের অপরাধ, তিনি মহামান্য এমপি সাবের বিরুদ্ধে নাকি কটু কথা বলেছেন, তার সমালোচনা করেছেন।

কাজেই প্রধানমন্ত্রীর লেখার শিরোনাম দেখে জনগণের মুখ থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছে, 'প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, আসলেই ওরা সব পারে, ওরা সব পারবে'। দুনিয়াতে এমন কোন কাজ নেই যা প্রধানমন্ত্রীর এই সোনার ছেলেরা করতে পারবে না।

ওরা সচিবালয়ের কর্মচারী থেকে শুরু করে কলেজের সম্মানিত অধ্যাপক পর্যন্ত সবাইকে অনায়াসেই দিগম্বর করে দিতে পারে। এরা হলমার্কের চুরি করা কয়েক হাজার কোটি টাকাকে পি-নাট বলতে পারে আবার মাত্র কয়েক কোটি টাকা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদেরকে মরিচের গুড়ার স্প্রে মারতে পারে।

ওরা সংখ্যালঘুদের জন্যে মায়া কান্না করতে পারে আবার বিশ্বজিতের মত যে কাউকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে মেরে ফেলতে পারে।

ওরা নিজেদেরকে সবচেয়ে প্রগতিশীল বলে দাবি করতে পারে আবার দুর্গতি সৃষ্টির নিমিত্তে সকল কাজে আঞ্জাম দিতে পারে। ওরা ধর্ষণে সেঞ্চুরী করতে পারে। সে কথা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দিতে পারে। সেই সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষককে সরকার চাকুরি দিতে পারে। পরিমলের মত পশুদেরকে শিক্ষক হিসাবে মেয়েদের স্কুলে ঢুকিয়ে দিতে পারে।

ওরা বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের লগি বৈঠা দিয়ে সাপের মত পিটিয়ে মারতে পারে । মরার পর সেই লাশের উপর উঠে নাচতে পারে। বিরোধী দলের তো বটেই এমনকি নিজের দলের উপজেলা চেয়ারম্যানকে দিনের দুপুরে পুড়িয়ে অঙ্গার বানিয়ে ফেলতে পারে। নিজের দলের প্যানেল মেয়রকে র্যাব ভাড়া করে খুন করতে পারে। সেই খুনীকে নিরাপদে দেশ থেকে পার করে দিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে বড় বড় কথা বলতে পারে। গড ফাদার হাতে নাতে ধরা খেলেও দলের নেত্রী সংসদে দাড়িয়ে সেই গড ফাদারের পক্ষে দাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন ।

এরা র্যাবের মত এলিট ফোর্সকে রক্ষীবাহিনী বানিয়ে ফেলতে পারে। নিজের মেয়ে জামাইকে র‌্যাবে ঢুকিয়ে সর্বত্র ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে। নিজের মেয়ে জামাই সাত খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও ডঃ কামাল হোসেনের মত মানুষকে বেয়াদব ডাকতে পারে।

এরা নিজের নোবেল লরিয়েটকে দইয়ে ভেজাল দেয়ার মামলা দিয়ে কোর্ট পাড়ায় চক্কর খাওয়াতে পারে এবং একই সময়ে প্রতিবেশীর নোবেল লরিয়েটকে মঞ্চে বসিয়ে জাতীয় দিবসের শোভা বর্ধন করতে পারে।

রেলের কালো বিড়াল ধরা খেলেও তাকে উজিরে খামোখা বানিয়ে জাতির ঘাড়ে দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখতে পারে। সাগর-রুনির খুনীদেরকে ইকবাল সোবহানদের মাধ্যমে একটু লেফট রাইট করিয়ে বেমালুম লুকিয়ে ফেলতে পারে।

পদ্মা সেতুতে রাম ধরা খাওয়া আবুলকে সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক উপাধি দিতে পারে।

দরবেশ বাবাজিরা শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করলেও সেই দরবেশ বাবাজিদেরকেই শেয়ার বাজারের হর্তাকর্তা ও দেশের অর্থনীতির ত্রাণকর্তা নিয়োগ করতে পারে।

এসব শুধু তাদের পক্ষে এবং একমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব।

রানা প্লাজার রানার শত শত পোষ্টার এলাকায় ঝুললেও পবিত্র সংসদে দাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মুখ মুছে বলতে পারেন যে রানা যুবলীগের কেউ না। রানা প্লাজা নিয়ে এরকম ডজন ডজন মিথ্যা বলতে পারেন। মিথ্যা বলার পরে আবার হাতে নাতে ধরাও খেতে পারেন। ধরা খাওয়ার পরে আবার অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে কথা বলতে পারেন।

হ্যা, এই সব একমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষেই সম্ভব।

৫ই জানুয়ারীর ভোটার বিহীন নির্বাচন করে পুরো গণতান্ত্রিক বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন । তার পরেও নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক শক্তি বলে দাবি করতে পারছেন। এগুলি একমাত্র সর্ব কালের সর্বশ্রষ্ঠ চাপাবাজদের পক্ষেই সম্ভব।

দেশের মানুষ ও দেশের গণতন্ত্রকে এই প্রক্রিয়ায় বগা বানিয়ে শাহজাহান খাঁনগণ বেগম খালেদা জিয়াকে টিপ্পনি কাটতে পারছেন, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে। এই কথাটি বলার সময় মন্ত্রীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজটি দেখার মত! আওয়ামী লীগের এই দাঁতাল হাসি দেশের গণতন্ত্রকেই উপহাস করছে।

শুধু বিএনপি বা তার নেত্রীকে নয়,পুরো দেশবাসীকেই বাকশালী খাঁন সাহেবরা 'বগা' বানিয়ে ফেলেছেন। কাজেই খালেদা জিয়া একা নন-বাকশালের ডিজিটাল ফান্দে আটকা পড়েছে পুরো দেশটিই। লেখক: মীনার রশীদ- রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

ঢাকা, ২৬ জুন(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস