বিশেষ প্রেক্ষাপটে ১৯২১ সালের ১লা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল একটি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজ সৃষ্টিতে সহায়তা করা। এই মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজই পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনে নেতৃত্ব দান করে। বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে পূর্ব বঙ্গে মুসলিম সমাজে যে নবজাগরণ শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তারই ফলশ্রুতি।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চলাটা শুরুতে যেমন মসৃণ ছিল না, এমনকি এখনও নয়। আর আগামীতে যে হবে তাও দিব্যি দিয়ে বলার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আসলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদকে কেন্দ্র করে পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল সে ক্ষোভকে কিছুটা প্রশমিত করার জন্য ইংরেজ সরকার মুসলমানদের জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর তার ফলশ্রæতিই হচেছ প্রাচ্যর অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণেই হিন্দুরা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে যেকোন মূল্যে ঠেকানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। মুসলমানরা যাতে শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর হয়ে রাষ্ট্রের সকল পর্যায়েই হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে না পারে এই জন্যই তাদের এই বিরোধীতা। কারণ, হিন্দুরা নিজেদেরকে কুলীন বলেই মনে করতেন।
তাই অকুলীনরা যাতে কোন ভাবেই তাদের ধারের কাছে যেতে না পারে সেজন্য ইংরেজ সরকারের এই উদ্যোগের বিরোধীতা করা হয়েছিল। এমনকি এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হিন্দুরা মুসলমানদের জন্য প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মক্কা ইউনিভার্সিটি’ ব্যাঙ্গ-বিদ্রæপ করতেও কসুর করেননি। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ষড়যন্ত্র অতীতে যেমন ছিল, এখনও আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে তা মোটামোটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।
কালের পরিক্রমায় প্রচ্যের অক্সফোর্ড হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় অতীত ঐতিহ্য-গৌবর কিছুটা হলেও হারিয়েছে। যার প্রধান কারণই হলো দেশের অস্থিতিশীল রাজনীতি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ দেশের শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বিদেশী একটি পত্রিকায় নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম করা হয়েছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট সন্ত্রাসের আঁতুরঘর’। যা দেশের সচেতন মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকে বিদেশী পত্রিকার এমন নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতার ধারাবাহিকতা বা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভিনদেশী ষড়যন্ত্র হিসাবেই দেখছেন। আর এমনটি মনে করার যৌক্তিক কারণও আছে বৈকি!
প্রকাশিত সংবাদে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে বলেই মনে হয়। এতে পরোক্তভাবে বর্তমান সরকারের জঙ্গী ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে এবং সরকার যাতে তাদের কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে কথিত ‘সন্ত্রাসের আঁতুরঘর’ দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথাকথিত সন্ত্রাস মুক্ত রাখেন এ জন্য উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ‘আর যাতে সন্ত্রাসী কিশোর তৈরি না হয় সে দিকে কঠোর সতর্কতা সরকারের।..... অঙ্কুরেই বিনাশী শক্তির বিনাশ। তালিকায় ঢাকার ১৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর বাইরে তিনটি। তালিকার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট-ও রয়েছে। গোয়েন্দা তদন্তে উঠে এসেছে দু’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ন’টি মাদ্রাসা, তিনটি মসজিদের নাম’।
বলা হয়. ‘শিক্ষা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যৌথ ভাবে পাহারায় রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অভিযুক্ত শিক্ষায়তনের কর্ণধার, শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রক। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের মত, শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা থাকে চার-পাঁচ ঘণ্টা। বাকি সময়টা কাটায় বাড়িতে বা বাইরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। এ বিষয়ে পারিবারিক সচেতনতা জরুরি। ছেলেমেয়েরা কোথায় কখন কী করছে না করছে তার খবর রাখতে হবে।
পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলে তখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ১৫ দিনের বেশি যদি কোনও ছাত্রছাত্রী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকে তার নামধাম থানাকে জানাতে হবে। নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীদের খুঁজে বার করার দায়িত্ব পুলিশের। তদারকি করছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক’।
প্রকাশিত সংবাদে আরও বলা হয়, ‘সবচেয়ে উদ্বেগ বুয়েটকে নিয়ে। তদন্তে জানা গেছে, তাদের ৭২ শতাংশ শিক্ষকই জামাত বা হিযবত তাহরীরের সদস্য। ছাত্রদের ওয়েবসাইট, ভিডিও ফুটেজ, জেহাদি বই, অডিও সিডি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করাটা তাঁদের কাজ। বুয়েটের উপাচার্য সইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগে যা হয়েছে তার সঙ্গে বর্তমানের তুলনা চলে না। যদি নতুন কোনও অভিযোগ জমা পড়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেব। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কিছু দিন আগেও জঙ্গিদের আঁতুরঘর ছিল। পরিস্থিতি বদলেছে। স্বচ্ছতা ফিরেছে’।
অভিজ্ঞমহল মনে করছেন পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধবংস করে দেশকে পরাশ্রয়ী ও করদরাজ্য বানানোর সুদুরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অভিযোগ করা হচেছ। সন্ত্রাসবাদ মূলত বৈশ্বিক সমস্যা। এটাকে কোন ভাবেই নির্দিষ্ট কোন ভূখন্ডের চৌহদ্দীর মধ্যে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়।
কিন্তু প্রকাশিত সংবাদ এমনভাবে উপস্থান করা হয়েছে যাতে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, শুধুমাত্র বাংলাদেশই সন্ত্রাসবাদের লীলাভূমি। আর দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জঙ্গীবাদ শিক্ষা দেয়া হয়। এর আগে দেশের মাদরাসাগুলোকে নিয়ে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হতো।
এমনকি বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে বিদেশী একটি পত্রিকায় ‘ইবধিৎব ড়ভ ইধহমষধফবংয’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মূল টার্গেটই ছিল দেশের মাদরাসা শিক্ষা। কিন্তু অনেক কসরত করেও সন্ত্রাসবাদের সাথে দেশের মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান ট্রাজেডি সহ সন্ত্রাসবাদী ঘটনার সাথে বিশেষ কোন ঘরানোর মানুষকে দায়ি করাও সম্ভব হয়নি। এমনকি এর ভেতরের খবর তো রীতিমত আৎকে ওঠার মত।
তাই এসব ঘটনাকে অভিজ্ঞমহল অতীতের বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় মনে করছেন। তাই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে আমাদেরকে পেছনেই ফিরে যেতে হবে।
মূলত ১৯০৫ সালের অক্টোবর ১৬ বঙ্গভঙ্গে ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন ‘পূর্ব বাংলা’ ও ‘আসাম’ প্রদেশ সৃষ্টি করা হয়। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার সবচেয়ে উন্নতি ঘটে। কিন্তু ১৯১১ সালের ১ নভেম্বর দিল্লির দরবারে ঘোষণার মাধ্যমে ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।
বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বঙ্গে শিক্ষার যে জোয়ার এসেছিল, তাতে অচিরেই ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অবধারিত ছিল। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে সে সম্ভবনা শেষ হয়ে যায়। এতে পূর্ব বংলার মুসলমানদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভ প্রশমনের জন্য ইংরেজ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সম্মত হয়।
১৯১২ সালে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত নাথান কমিটি। ভারত সচিব ১৯১৩ সালে নাথান কমিটির রিপোর্ট অনুমোদন দেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পথে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহবান জানান।
১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লর্ড চেমস্ফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাসমূহ তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রও থেমে থাকেনি।
ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ তার ঢাকা সফর শেষে কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. রাশ বিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বিরোধী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কি মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধীতা থেকে বিরত থাকবেন?
পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন কোলকাতার হিন্দু ভদ্রলোক ও বুদ্ধিজীবীরা। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন কবিগুরু। ইতিহাস হলো কবিগুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন এবং পরে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।
কবিগুরু দুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। মূলত জমিদার ও ব্যবসায়ী হিসাবে তাঁর ভুমিকা ছিল গণ-বিরোধী। তাঁকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে হয়েছে। সেখানে তিনি নিরপেক্ষ থাকতে পারেননি।
রমেশ মজুমদারের লেখাতে উল্লেখ রয়েছে যে, হিন্দুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছে। ওই হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশ গঠনেরও বিরোধিতা করেছিলেন। মুহম্মদ জাহাঙ্গীর প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ব্রিটিশ সরকারের একটি উপহার। ১৯১১ সালে নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ আসাম প্রতিষ্ঠা রদ করা হলে নতুন প্রদেশের অধিবাসী মুসলমানেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
নবাব সলিমুল্লাগ ক্ষুব্ধ মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গভঙ্গ রদের খেসারত হিসাবে বড়লাট ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। তারই ফল হিসাবে ১৯১২ সালের ২৭শে মে মিস্টার নাথানকে সভাপতি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করা হয়। এই সময়ে যারা বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন করেছিলেন তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা শুরু করেন।
৭ জুন ২০০০ তারিখ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয় “সর্ব-মানবিক প্রেম ছিল তার কবিতার উপজীব্য, কিন্তু কার্যত তিনি নিজে বাস্তবে ছিলেন ব্রিটিশ রাজশক্তির অনুগত উপাসক। এই রকম একজন স্ববিরোধী ও
আত্ম-বিভক্ত এবং নিপুণ দ্বৈতাচারী মানুষ কি করে মানুষের আদর্শ হতে পারে ? কারো অজানা নয়, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল বিশাল জমিদারী। কিন্তু মুসলমান অক্ষর জ্ঞান লাভ করতে পারে, এই আশঙ্কায় এই প্রজা-হিতৈষী জমিদার তার এলাকায় একটি প্রাইমারী স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেননি। কেন করবেন? তিনি মানব দরদী ছিলেন বটে, কিন্তু ছিলেন আপাদমস্তক বঙ্গীয় মুসলমানদের প্রতি বিরূপ ও বৈরী ।
জহরলাল নেহেরু তাঁর বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ বইতে বলেছেন, ‘ ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বংগদেশে মুসলমানের সংখ্যা বেশী। এরা গরীব প্রজা। সাধারণত হিন্দুরাই ছিল জমিদার।গ্রামের বানিয়াও ছিল হিন্দুরা। কাজেই জমিদার ও বানিয়ারা যৌথভাবে মুসলমানদের শোষণ করত। মনে রাখতে হবে হিন্দু মুসলমান বিবাদের মূলই হচ্ছে এই শোষণ। পেশাগত দিক থেকে কবিগুরু ছিলেন একজন জমিদার ও বানিয়া।
তাই তিনি পূর্ববঙ্গ প্রদেশ গঠন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের বিরোধিতা করেছেন। নতুন প্রদেশ গঠনের দিন ১৬ই অক্টোবর তিনি শোক দিবস পালনের আহŸান জানিয়েছিলেন। একই ভাবে ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কোলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা যে সভা করে তাতে সভাপতিত্ব করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। নীরদ চৌধুরী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ জমিদার হিসাবে পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজাদের লাভ স্টক বা গৃহপালিত পশু মনে করতেন।
১৯১২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করার জন্যে স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বড়লাটের সাথে দেখা করেন। প্রতিনিধি দলের যুক্তি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বংগদেশ অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হবে।
ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাবু গিরিশ বানার্জী, ড. স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করে ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন খাঁটি হিন্দু। তিনি তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসকে কখনই ত্যাগ করেননি। এ ব্যাপারে তা কোন লুকোচুরি ছিলনা। কবিগুরু নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ আমি ভারতীয় ব্রহ্মচয্যের প্রাচীন আদর্শে আমার ছাত্রদিগকে নির্জনে নিরুদ্বেগে পবিত্র নির্মলভাবে মানুষ করিয়ে তুলিতে চাই।
বিদেশী স্লেচ্ছতাকে বরণ করা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়, ইহা হৃদয়ে গাঁথিয়া রাখিও।’ কবিগুরু সম্পর্কে রমেশ মজুমদার লিখেছেন, ‘ হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও সজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনই এর উপস্থিতি স্বীকার করেননা। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে , ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ, যার পৃথিবী খ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সংগে কিছুতেই সুসংহত করা যায়না।
তাঁর কবিতা সমূহ শুধুমাত্র শিখ রাজপুত ও মারাঠা কীর্তনে অনুপ্রাণিত হয়েছে। কোন মুসলিম বীরের কীর্তনে তিনি কখনও এক ছত্রও লিখেননি। এ থাকেই প্রমাণিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল ?’ নীরদ চৌধুরী লিখেছেন, রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার সমন্বয় সাধনের জন্যে। মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা , ভাবধারা , ঐতিহ্য কখনই তাদের স্পর্শ করেনি।
কবিগুরু হিন্দু শক্তির উত্থান হিসাবে শিবাজীর গুণ কীর্তন করেছেন। এর একমাত্র কারণ তিনি একজন হিন্দু ছিলেন। শিবাজী সম্পর্কে ইতিহাসবিদ স্যুলিভান বলেছেন, শিবাজী ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুন্ঠক ও হন্তারক দস্যু। শিবাজীর লুণ্ঠন থেকে হিন্দু মুসলমান কেহই রেহাই পায়নি। মারাঠারা বহু মন্দির ধ্বংস করেছে, বহু হিন্দু ব্রাহ্মণকে হত্যা করেছে। মারাঠারা যেখানে গিয়েছে, সেখানেই ধ্বংস ও মৃত্যু রেখে এসেছে।
‘বাঙ্গালী জীবনে রমণী’ গ্রন্থে নীরদ চৌধুরী বলেছেন, ‘একটা একেবারে বাজে কথা সর্বত্র শুনিতে পাই। তাহা এই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি হিসাবে বিশ্ব মানব ও লেখক হিসাবে বিশ্ব মানবতারই প্রচারক। কথাটির অর্থ ইংরেজি বাংলা কোন ভাষাতেই বুঝিতে পারিনা।
আসলে কবিগুরু কখনই মুসলমান স্বার্থের পক্ষে ছিলেন না। তিনি একজন খাঁটি হিন্দু হিসাবে আজীবন হিন্দুদের খেদমত করেছেন। জমিদার হিসাবেও তিনি মুসলমান প্রজাদের উপর অত্যাচার করেছেন। তিনি তাঁর জমিদারীর স্বার্থে ইংরেজদের বন্দনা করেছেন। এতে আমি দোষের কিছু দেখিনা।
দোষের হলো যখন দেখি, আমাদের নামীদামী মানুষেরা তাঁকে দেবতার আসনে বসাতে চান। আসল ইতিহাসকে লুকিয়ে রেখে নকল ইতিহাস প্রচার করে আমাদের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে চান। কবিগুরু আপন জাতির স্বার্থেই মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। তিনি তাঁর ধর্ম পালন করেছেন।
মূলত সন্ত্রাসবাদ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয় বরং এটি বৈশ্বিক সমস্যা তা আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু মহল বিশেষ এ বিষয়ে এমনভাবে কথা বলেন তাতে মনে হয় শুধুমাত্র বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদ মুক্ত করতে পারলেই গোটা বিশ্বর মানুষের মধ্যেই স্বর্গানুভূতি বিরাজ করবে।
যেদেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদের আঁতুরঘর’ হিসাবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে, সেদেশেও সন্ত্রাসবাদীদের উৎপাতটা আমাদের দেশের চেয়ে কম নয়। বরং এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই নিকট প্রতিবেশীর সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধযুদ্ধ খেলা চলছে। কিন্তু তারা নিজের চড়কায় তেল না দিয়ে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মাথা ঘামাতেই বেশী পছন্দ করেন। ফলে তাদের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রছেছে বলেই মনে হয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে বঙ্গভঙ্গ হলে ভারত মাতার অঙ্গচ্ছেদ ঘটবে। তাই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর তারা প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বঙ্গভঙ্গ রদের পক্ষে কবি গুরু অনেক কবিতা ও গানও রচনা করেছিলেন। তিনি সম্মুখ থেকে এই আন্দোলনে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন।
মূলত তাদের আন্দোলনের মুখেই ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদের পর যখন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যায় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গৃহীত হয়, তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সহ ভারতীয় বর্ণহিন্দুরা নানা অজুহাতে এই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীতা করেছিল।
ফলে একথা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতার জন্য যেসব কারণ দাঁড় করানো হয়েছিল সে সব ছিল অজুহাত মাত্র। কারণ, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় যখন বাংলা আবারও বিভাজিত হলো তখন কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যাহোক সম্প্রতি সন্ত্রাসবাদের তকমা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট সহ দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে যে প্রতিবেশী দেশের গণমাধ্যমে যে মাতম শুরু হয়েছে তা বঙ্গভঙ্গ রদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতার
ধারাবাহিকতা মাত্র। এতে কোন অভিনবত্ব নেই। কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে সেদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধবংস করায় যথেষ্ঠ। এই উপলব্ধি থেকেই বোধহয় ঢাবি-বুয়েটকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদেরকে অতিসন্তর্পণেই অগ্রসর হতে হবে।
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
জেড





