ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এস ওয়াই কোরেশী এসেছিলেন বাংলাদেশের মানুষকে তাদের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করতে। যদিও তিনি স্বত:প্রণোদিত হয়ে আসেননি। বাংলাদেশের দুটি মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ এবং ‘ব্রতীর’ উদ্যোগে “India’s General Elections – 2014” অর্থাৎ “ভারতের সাধারণ নির্বাচন -২০১৪” শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান বক্তা হিসেবেই তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গত ২৪ মার্চ ২০১৪ এই কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় ভারতের সাবেক সিইসি দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য প্রদান করেন। সেই ১৯৫০ সাল থেকে ভারতে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালুর পর থেকে আজ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকা এবং এই দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৬ দশকের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন ছিল তার রীতিমতো দীর্ঘ ফিরিস্তি তুলে ধরেন কোরেশী। নির্বাচন কমিশনের শতভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা, নির্বাচনে আধুনিক প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের ভূমিকাসহ সুষ্ঠু নির্বাচনে কার কী করণীয় তার নানা দিক তুলে ধরেন ভারতের সাবেক এই সিইসি।
তবে, কোরেশী তার বক্তব্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ভূমিকাকে।
যাই হোক এই লেখনিতে ভারতের সিইসিএর একটি বক্তব্যই তুলে ধরতে চাই। নির্ধারিত আলোচনা শেষে ভারতের সাবেক সিইসি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। ওই কর্মশালায় এই প্রতিবেদকেরও অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের সাবেক সিইসি কোরেশী বিভিন্ন কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলেন, “In India the ruling party very often hates the Election Commission and the opposition loves the commission. On the other hand, the same ruling party when in opposition loves the election commission and the same opposition when in power starts hating the commission”. অর্থাৎ ভারতে ক্ষমতাসীন দল অধিকাংশ সময় নির্বাচন কমিশনকে ঘৃণা করে এবং বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনকে ভালোবাসে। একই ক্ষমতাসীন দল যখন বিরোধী দলে থাকে তখন নির্বাচন কমিশনকে ভালোবাসে এবং একই বিরোধী দল যখন ক্ষমতায় আসে নির্বাচন কমিশনকে ঘৃণা করতে শুরু করে।
এই সরল উক্তি দ্বারা ভারতের সাবেক সিইসি অনেক কিছুই একই সাথে পরিষ্কার করে দিলেন সবার সামনে। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সবসময়ই একটি গোপন অভিলাস থাকে যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন তাদেরকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর জন্য একটু হলেও ভূমিকা রাখবে। এটা একটি সহজাত প্রবণতা। তাই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে গেলে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন কমিশনের ওপর একটু হলেও নাখোশ হবেই।
এছাড়া, মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করা। আর তাই যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশেই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ যেখানে মানুষের চাওয়া পাওয়া অধিকাংশ সময় অপূর্ণ থেকে যায়, নানা প্রত্যাশা অপূরণের যন্ত্রনা নিয়ে মানুষকে দিনাতিপাত করতে হয়, সেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অন্যতম হাতিয়ার সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে ভোট দেয়া। এসব কারণে ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে ক্ষমতাসীনরা সবসময়ই নির্বাচন এলে ক্ষমতা হারানোর ভয় তটস্থ থাকেন। তাই ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন কমিশনের মতো নির্বাচনকালীন গুরূত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের পক্ষে নিতে যারপরনাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কিন্তু গণতন্ত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভারতে ক্ষমতাসীনদের এই খায়েশ পূরণ না হওয়ায় দেশটির নির্বাচন কমিশনকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না শাসকশ্রেনী। তবে, বাংলাদেশের চিত্র যেন একেবারেই ভিন্ন। উদাহরণস্বরুপ সবশেষ ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত ৪র্থ উপজেলা পরিষদের ৪র্থ বারের নির্বাচনের দিকে একটু নজর দিলেই আমরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবো। এ নির্বাচনের বিষয়ে পরদিন ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতায় নিহত ৩ জন’-এমন শিরোনামে বিবিসি বাংলার ওয়েব সাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হুবহু তুলে ধরা হলো:
“কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ৪৩টি জেলার ৯১টি উপজেলায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ পর্বের ভোট গ্রহণ। মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, জেলার গজারিয়া উপজেলায় ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে নিহত হন সেখানকার ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি শামছুদ্দিন প্রধান। তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সকাল সাড়ে দশটার দিকে বড় রায়পাড়া কেন্দ্রের কাছে এ ঘটনা ঘটে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণের শেষ পর্যায়ে একটি কেন্দ্র দখলের চেষ্টা হলে বিজিবি গুলি ছোড়ে তাতে একজন নিহত হন।তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা পুলিশ নিশ্চিত হতে পারে নি। ওদিকে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় একজন যুবলীগ কর্মী নিহত হয়েছে।”
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই ২৩ মার্চের ওই নির্বাচনের সহিংসতা ও অনিয়মের খবর তুলে ধরা হয়। এই ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রবার্ট গিবসনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টের খানিকটা হলো: “উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বৃটেন। নির্বাচনের ধাপে ধাপে সহিংসতা এবং প্রাণহানি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন বলেছেন, মানুষের ভোটের অধিকারকে বাধাগ্রস্থ করা হচ্ছে। জোর করে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও পূর্ণ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।”
কিন্তু দেশ-বিদেশি গণমাধ্যমের খবর ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন নির্বাচনের সহিংসতা ও অনিয়ম নিয়ে দেশের নির্বাচন কমিশন ও সরকারি দলের বক্তব্য যেন হুবহু মিলে যায়। ব্যালট পেপার ছিনতাই, সংঘর্ষ, ভোটকেন্দ্র দখল, হতাহত ও ৩২টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও সার্বিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) আব্দুল মোবারক। তিনি আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনে এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এত অনিয়ম ও প্রাণহানির পরও নির্বাচন সুষ্ঠু হবার দাবি ভারপ্রাপ্ত সিইসির।
আর এই নির্বাচন নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় অনেকটা ভারপ্রাপ্ত সিইসির মতোই। ২৫ মার্চের সমস্ত জাতীয় দৈনিকসহ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরনস্বরুপ দৈনিক আমার দেশের ২৫ মার্চের অনলাইন সংস্করণের খানিকটা তুলে ধরা হলো। ৪ খুন ও ব্যাপক সহিংসতার পরও এইচটি ইমামের দাবি আগের তিনটির চেয়ে চতুর্থ দফা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে-এমন শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, আগের তিনটির চেয়ে এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত কঠোর ও শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করেছে। এজন্য তাদের অভিনন্দন।”
অপরদিকে, আমরা এই নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই একেবারেই ভিন্নরুপে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ রিজভীর-এমন শিরোনামে ২৫ মার্চ দৈনিক প্রথমআলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা ছিল এরুপ: “বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর একজন উপদেষ্টা এবং ‘আজ্ঞাবাহী’ নির্বাচন কমিশন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ‘নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার’ করছেন।
…সরকার ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে নোংরামিতে উৎসাহী হয়ে এখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আরও উলঙ্গ হয়ে নেমেছে।… ‘নির্বাচন কমিশন এখন স্বাধীন, মানুষ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিচ্ছে’—প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে উষ্মা ও শ্লেষ প্রকাশ করেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘আসলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মতো নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবেই কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে মানুষ হত্যা, সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের মহা ধুমধামে কেন্দ্র দখল করা, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, প্রিসাইডিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে জাল ভোট দেওয়া, ব্যালট পেপারে গণসিল মারতে কমিশন স্বাধীনভাবেই কাজ করেছে।’
‘চতুর্থ দফার নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর লোকেরা বিএনপির দুজনসহ চারজনের জীবন নিয়েছে, ৫০০ জনকে আহত করে জাঁকজমকের সঙ্গে ভোট ডাকাতি করেছে। মোটরসাইকেল র্যালি করে আকাশে গুলি ছুড়ে কেন্দ্র দখলের উৎসব করেছে। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, “মানুষ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিচ্ছে।”
এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ভারতের নির্বাচন কমিশন আর বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও গ্রহনযোগ্যতায় আকাশ-পাতাল ফারাক। যদিও বর্তমান সরকার অনেক ক্ষেত্রেই ভারতকে মডেল হিসেবে মনে করে। অথচ এই সরকারেরই ‘আজ্ঞাবহ’ নির্বাচন কমিশন ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কিছুই শিখছে না। ইতোমধ্যেই প্রধান বিরোধী দলগুলোসহ সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচন কমিশন যে পরিমাণ বিতর্কিত ও পক্ষপাতদোষে দুষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়েছে তাতে শুধু সরকারের কৃপা নিয়ে এই কিতাবি ‘স্বাধীন’ নির্বাচন কমিশন কতদিন টিকে থাকবে এবং এতে গণতন্ত্রই বা কতটুকু সুরক্ষিত থাকবে সে প্রশ্নই এখন সবার।
লেখক: সাংবাদিক
ই-মেইল: [email protected]
মতামত
ভারতের নির্বাচন কমিশন বনাম বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন
ভারতের নির্বাচন কমিশন আর বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও গ্রহনযোগ্যতায় আকাশ-পাতাল ফারাক। যদিও বর্তমান সরকার অনেক ক্ষেত্রেই ভারতকে মডেল হিসেবে মনে করে। অথচ এই সরকারেরই ‘আজ্ঞাবহ’ নির্বাচন কমিশন ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কিছুই শিখছে না।





