আমরা আদৌ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক! আদৌ কি বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম! এই প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। বিস্ময় লাগছে ইন্ডিয়ায় বিজেপির বিজয়ে কিছু মানুষের আনন্দ উল্লাস দেখে। কেউ ভেতরে ভেতরে উল্লসিত। কেউ প্রকাশ্যে ইচ্ছার প্রকাশ করছেন। ইন্ডিয়ায় হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজিপি ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। তাতে আমাদের কি? কি লাভ হবে বাংলাদেশের মানুষের? তারপরও একদল মানুষ আনন্দিত উচ্ছ্বাসিত।
প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিতে যাচ্ছেন প্রচণ্ড হিন্দুত্ববাদী নেতা নরেন্দ্র মোদী। উল্লসিত এবং উচ্ছ্বাসিতদের যুক্তি হচ্ছে এবার বাংলাদেশে পরিবর্তন আসবে। মোদী বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন। বেশ ভালো কথা। আমরা বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারি না। মোদী এসে আমাদের অধিকার আদায় করে দেবেন। আমাদের রাজনীতি এতদিন নির্ভর ছিল সোনিয়ার ইচ্ছার উপর। এখন মোদীর ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। মুসলমানদের প্রতি তার রয়েছে চরম বিদ্বেষ। ২০০২ সালে গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ২ হাজার মুসলমানের বাড়ি-ঘর ধ্বংস করা হয়েছিল। ট্রেনে আগুন দিয়ে পুড়ে মারা হয়েছিল হাজারের বেশি মুসলমান। এর জন্য বিভিন্ন তদন্তে মোদীকে দায়ী করা হয় তখন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন নরেন্দ্র মোদী। এবারও তিনি নির্বাচনী জনসভায় মুসলিম এবং বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক উত্তাপ ছিল তার নির্বাচনী বক্তব্যে। ১৯৯১ সালে বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার পেছনেও রয়েছে মোদীর সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা। আনন্দে উদ্বেলিতদের প্রত্যাশা সেই মোদী হবেন এখন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অবতার। হায়রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, হায়রে সার্বভৌমত্ব!
আশ্চার্য এবং বিস্ময় হলো অন্য জায়গায়। হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের বিজয় হয়েছে। চরম হিন্দুত্ববাদী নেতা মোদী হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তারপরও আমাদের আনন্দ এবং উল্লাস কেন! পত্রিকাগুলোতে নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আসছে। আওয়ামী লীগের পতন হবে এমন আশাবাদও ব্যক্ত করছেন কেউ কেউ। কোনো কোনো পত্রিকায় সংবাদের শিরোনাম হয়েছে আওয়ামী শিবিরে হতাশা—বিরোধী শিবিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। এর পেছনেও যুক্তি রয়েছে। তার পাল্টা যুক্তিটা কারো মুখ থেকে শোনা যায়নি। দেখা যায়নি পাল্টা যুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা।
মোদী কেন বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন! এই প্রশ্নটার সঠিক জবাব কারো কাছে পাওয়া যায়নি। তার এমন কি দরদ রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য। বাংলাদেশে তো আর সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক হিন্দু নয়। মুসলমানদের জন্য মোদীর এত দরদ কেন হবে! মোদী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইন্ডিয়ার জাতীয় স্বার্থ দেখবেন, নাকি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ দেখবেন? ইন্ডিয়া বাংলাদেশের উপর যেই হিংস্র থাবা বিস্তার করেছে সেটা তাদের জাতীয় স্বার্থে। পদ্মা নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে ইন্ডিয়া। বাংলাদেশের ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আটকে দেয়া হয়েছে। এটা করেছে ইন্ডিয়ার জাতীয় স্বার্থে। ইন্ডিয়ার জাতীয় স্বার্থেই তারা আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় সব নদীর পানি তারা নিয়ন্ত্রণ করবে। ব্যবহার করবে তাদের কৃষি, নৌসহ জাতীয় স্বার্থে। মোদীর এমনকি ঠেকা পড়বে তার জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের কল্যাণ চাইবে! মোদীর নির্বাচনী বক্তব্যে কি কখনো বলেছেন বিজয়ী হলে কোন নদীর পানি আটকানো হবে না। কখনো কি বলেছেন, স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান থাকবে নদীর পানিতে।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের দেশের ভেতর অবাধে বিচরণ করতে পারে। বাংলাদেশের ভেতর থেকে লোক ধরে নিয়ে যায় ইন্ডিয়ায়। ইন্ডিয়ার পত্রিকায় খবর বের হয়েছে ঢাকা এয়ারপোর্টে অভিযান চালিয়ে ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা একজনকে ধরে নিয়ে গেছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা সদস্যদের রয়েছে প্রকাশ্যে আনাগোনা। পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ইন্ডিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ইন্ডিয়ার স্বার্থ প্রাধান্য দেয়া হয় পররাষ্ট্রনীতিতে। তেল-গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্লক ইন্ডিয়াকে ইজারা দেয়া হয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন হচ্ছে ইন্ডিয়ার স্বার্থে। এজন্য বিদ্যুত্ ট্রানজিটের চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশের উপর এই দখলদারিত্ব কি মোদী কখনো হাতছাড়া করতে চাইবেন! চাইলে ভালো কথা। বাংলাদেশের মানুষ অন্তত রেহাই পাবে ইন্ডিয়ান খবরদারি থেকে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার পেছনে ইন্ডিয়ার একটি স্বপ্ন ছিল। পাকিস্তান ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করার পাশাপাশি মুসলমানদের শক্তি বিভক্ত করা। আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে করদরাজ্যে করা। প্রথম উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত সফল হয়েছে তখনই। পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। খর্ব হয়েছে শত্রুর শক্তি। খবরদারির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীতে কিছুটা হোঁচট খায়। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কিছুটা হলেও ছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তির পর দেশে আসেন। ফেরত আসার পথেই ইন্ডিয়ান সেনা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান ইন্দিরা গান্ধীকে। তার কঠোর অনুরোধে ইন্ডিয়া সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। নতুবা ইন্ডিয়ান দখলদারিত্ব তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। সেনা প্রত্যাহারের পরই সরাসরি ইন্ডিয়া দখলমুক্ত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। তারপরও নানা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার করতলে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
দৃশ্যমান পরিস্থিতিতে মনে হয়, শেখ মুজিবুর রহমানকে পুরোপুরি ঘায়েল করতে ব্যর্থ হয়েছিল ইন্ডিয়া। স্বাধীনতার দুই বছরের মাথায় শেখ মুজিবুর রহমান ওআইসির সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তান চলে যান। যাদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে, শহীদ হয়েছেন লাখো মানুষ। ইজ্জত হারিয়েছেন অনেক মা-বোন। অথচ শেখ মুজিবুর রহমান সেই দেশ সফরে গেলেন মাত্র ২ বছরের মাথায়। আবার সঙ্গে নিয়ে গেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী শাহ আজিজুর রহমানকে। সেই সফরে জুলফিকার আলী ভুট্টো, স্বাধীনতা যুদ্ধে কসাই বলে খ্যাত টিক্কা খানের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিবেশে আলোচনা করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ার সঙ্গে গোপন চুক্তি ছিল সীমান্তে কোনো পাহারা থাকবে না। কিন্তু পাকিস্তান রাইফেলসেক পরিণত করা হলো বাংলাদেশ রাইফেলস-এ। অর্থাত্ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) হয়ে গেল বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)। সীমান্তে কড়া পাহারার ব্যবস্থা হলো। বাংলাদেশের উপর দিয়ে ইন্ডিয়া যাতায়াত করবে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে। অর্থাত্ ইন্ডিয়ার পশ্চিমাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হবে বাংলাদেশের ভূমি। এই স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিন থেকে। নানাভাবে ট্রানজিট চাওয়া হচ্ছিল। সেই আশা পূরণ হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে। নৌ ট্রানজিট, সড়ক ট্রানজিট সবই এখন উন্মুক্ত হওয়ার পথে।
১৯৭১ সালে যেই স্বপ্ন নিয়ে ইন্ডিয়া স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই জায়গায় আসতে ইন্ডিয়াকে অনেক মেধা, শ্রম এবং ঘাম ঝরাতে হয়েছে। বিডিআর ধ্বংস করতে সময় লেগেছে প্রায় ৪০ বছর। প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে ৪০ বছর পরিশ্রম করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সীমান্তে ইন্ডিয়ান বাহিনীগুলোর সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে। সবগুলোতে বিজয়ী হয়েছে বিডিআর। এখন সীমান্তে যুদ্ধ হবে না। গুলি চালানো নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ সরকার। আক্রান্ত হলেও সরকারের অনুমতি ছাড়া গুলি চালানো নিষিদ্ধ। কাঁটাতার দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছে পুরো সীমান্ত।
নরেন্দ্র মোদীর কি ঠেকা লাগবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে এই সুবিধাগুলো ব্যাহত করার! নরেন্দ্র মোদী ভালো করেই জানেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইন্ডিয়ান খবরদারি পছন্দ করে না। শেখ হাসিনার আমলে যেভাবে ইন্ডিয়ান আধিপত্য বিরাজমান সেটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারছে না। নরেন্দ্র মোদী কি ইন্ডিয়ার এই আধিপত্য ত্যাগ করবেন বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে? যেই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে তিলে তিলে ৪০টি বছর লেগেছে। মোদী কি খবরদারি উঠিয়ে নেবেন বাংলাদেশে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে! নাকি তার জাতীয় স্বার্থটাকে বড় করে দেখবেন!
বাংলাদেশে হারানো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব লাগবে। ইন্ডিয়ান স্বার্থে নয়, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মতওয়ালা নেতৃত্ব ছাড়া স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত। ইন্ডিয়া নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন করে দেবে, হারানো গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এগিয়ে আসবে, সেটা বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা যাদের নেই তারাই কেবল ভাবতে পারেন মোদী এসে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন। নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেবেন মোদী। বিনিময়ে মোদী কি চাইবেন সেটাই হলো বড় প্রশ্ন। শেখ হাসিনা যা দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি ছাড়া মোদী কম চাইবেন বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোরসহ যেসব চুক্তি শেখ হাসিনা এখনো বাস্তবায়ন করেনি সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন মোদী। সেটা কার মাধ্যমে করবেন মোদীর ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে। এতে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরে পাবে না। ইন্ডিয়ান আধিপত্য বজায় রেখেই মোদী সেই কাজটি করবেন। আমরা কি তাহলে ইন্ডিয়ান আধিপত্য থেকে বের হতে পারব না?
[b]লেখক : দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত[/b]
মতামত
নরেন্দ্র মোদীর বিজয়ে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি
বিস্ময় লাগছে ইন্ডিয়ায় বিজেপির বিজয়ে কিছু মানুষের আনন্দ উল্লাস দেখে। কেউ ভেতরে ভেতরে উল্লসিত। কেউ প্রকাশ্যে ইচ্ছার প্রকাশ করছেন। ইন্ডিয়ায় হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজিপি ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। তাতে আমাদের কি? কি লাভ হবে বাংলাদেশের মানুষের? তারপরও একদল মানুষ আনন্দিত উচ্ছ্বাসিত।





