২৯ অক্টোবর তুরস্কের জাতীয় দিবস। এ দিন তুরস্ক ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সালতানাত থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়, যা ১৯২৩ সালের ২৮ অক্টোবর রাত। তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের যুগ যুগ ধরে সুসম্পর্ক। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ে তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাথে নিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের স্ত্রী বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। এখানে এসে যান কক্সবাজারের উখিয়া। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের করুণ অবস্থা দেখে তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন।
তুর্কি সুলতানী আমল থেকে আমাদের দেশের সাথে তুরস্কের সুসম্পর্ক। এর মূলে তিন কারণ- ০১. তুরস্ক একটি মুসলিম দেশ। ০২. পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ০৩. তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত জাহাজ ক্রয় করা।
১২৮৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ৩৭ জন সুলতান ৬৩৬ বছর স্থায়ী ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। প্রথম ৩০০ বছর সুলতানদের যোগ্যতার কারণে জয়জয়কার অবস্থা ছিল। ইউরোপ, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার বিশাল অংশ নিয়ে ছিল তাদের সাম্রাজ্য। শেষের ৩০০ বছরে যোগ্য শাসক ছিলেন কয়েকজন। অপর শাসকেরা ছিলেন অযোগ্য। ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যের বহু অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৮৮১ সালে জন্মগ্রহণকারী সামরিক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল পাশা চরম নাজুক পরিস্থিতিতে তুরস্কের হাল ধরতে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে আসতে থাকেন এবং ১৯২১ সালে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯২৩ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুল থেকে আঙ্কারায় সরিয়ে নেন রাজধানী। ১৩ অক্টোবর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২৮ অক্টোবর রাতে নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও অনুমোদনের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয়। ১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর জাতীয় পরিষদ কর্তৃক আইন পাস করে আতাতুর্ক তথা ‘তুর্কি জাতির পিতা’ হিসেবে ঘোষিত হন মোস্তফা কামাল পাশা। ১৯৩৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
বর্তমান তুরস্কের পরিধি ১০ লাখ এক হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার, যা আমাদের দেশের প্রায় ছয় গুণ বড়। কামাল পাশার পিপলস পার্টি দীর্ঘ সময় ধরে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর ক্ষমতায় আসেন ইসমত ইনোনু। পিপলস পার্টি ৪০-৪৫ বছর ধরে তুরস্ককে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে রেখেছিল; কিন্তু তুর্কিরা মুসলমান বিধায় তাদের মাঝে আরবি শিক্ষা ও ধর্মীয় আচার-আচরণ দানা বাঁধতে শুরু করে। সে এক অনন্য ইতিহাস। তুর্কিদের মাঝে ধর্মীয় দিকে অবদানের দিক দিয়ে ফতেউল্লেহ গুলেনকেও একজন হিসেবে গণ্য করা হতো। শেষ বয়সে এসে তিনি আমেরিকায় অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। এক সময়ের গুলেনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। অবশ্য এখন তাদের সম্পর্ক বন্ধুর নয়, বৈরীর।
এরদোগান একজন সাহসী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৪ সালে তার জন্ম। ১৯৯৪ সালে তিনি একে পার্টি থেকে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে একটি ভাষণের কারণে তিনি চার মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। ২০০১ সালে মধ্যপন্থী রক্ষণশীল একেপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ সালের মার্চ মাসে নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৩ থেকে ১৪ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপর রাষ্ট্রপতি হলেন। শাসনতন্ত্র সংশোধন করে এবং তার অনুকূলে গণরায় নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।
গত বছর এরদোগান সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হন। কিন্তু তার আহ্বানে জনগণ সাড়া দিলে এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অভ্যুত্থানের জন্য তিনি ফতেউল্লেহ গুলেন ও তার অনুসারীদের দায়ী করছেন।
সিরিয়া ও ইরাকে গৃহযুদ্ধের কারণে তুরস্কে প্রভাব পড়ছে। এ দুই দেশের সাথে তুরস্কের সীমান্ত রয়েছে। আইএসের উত্থান এবং ইরাকে কুর্দিস্তানের গণভোটে এরদোগানের পক্ষে নীরব থাকা কঠিন। অপর দিকে, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে তিনি অবদান রাখতে চান। যেমন- কাতার নিয়ে সৌদি আরবের বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তিনি তৎপর। আরাকানে বার্মার সশস্ত্রবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কারণে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে ছুটে আসছে। গতবার তাদের ফিরিয়ে দিলেও এবার বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা এ দেশে এসেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা বিষয়ে তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। রয়েছে কুর্দিসহ সে দেশের নানা সঙ্কট। সম্প্রতি ইরাকি কুর্দিস্তানের গণভোট তুরস্ককে ভাবিয়ে তুলেছে।
তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের প্রাচীনকাল থেকে সুসম্পর্ক। তার যোগসূত্র চট্টগ্রাম বন্দর। তুরস্কের সুলতানরা সামুদ্রিক নৌযানের জন্য চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ নির্মাণ ও খরিদ করতেন। মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়ায় (তখন মিসর তুর্কি শাসনের নিয়ন্ত্রণে) তুর্কি সালতানাতের নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ কারখানা ছিল। তারপরও চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত জাহাজের কাঠ ও নির্মাণ প্রযুক্তি বেশি মজবুত, টেকসই ও সস্তা মনে করতেন তুর্কি সুলতানেরা।
২৯ অক্টোবর তুরস্কের জাতীয় দিবস উপলক্ষে সে দেশের শান্তি সমৃদ্ধি কামনা করছি। আরো কামনা করছি তুর্কি জনগণ এবং প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সার্বিক কল্যাণ, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবন।
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
এমবি





