বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে সারা পৃথিবী মাতোয়ারা। ছেলে বুড়ো সবার দৃষ্টি এখন ব্রাজিলের দিকে। এই সুযোগে সেখানকার প্রমোদবালারাও বিভিন্ন ভাবে মিডিয়ার মনোযোগ আকর্ষন করার চেষ্টা করছে। কোন কোন দেশের সমর্থকদের জন্যে বিশেষ ডিসকাউন্টের ঘোষণা দিয়ে চমক সৃষ্টি করছে।

একদল প্রমোদবালা আবার একটি ফুটবল দল গঠন করেছেন। দলের নাম দিয়েছেন ‘ন্যাকেড ফুটবল ক্লাব’। ব্রাজিলের রাস্তায় তারা ফুটবল খেলেছেন ‘খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক গ্রুপ’ এর সঙ্গে। নেকেড বললেও তারা যথেষ্ট কাপড়চোপড় পরেই অর্থাৎ পুরাদস্তুর জাতীয় দলের জার্সি পরিধান করেই ফুটবল খেলেছেন ।

‘ যৌনবালাদের অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার লক্ষ্যে এই ম্যাচের আয়োজন করে " খ্রিস্টান ধর্মযাজক গ্রুপ’ । আয়োজকরা যে ম্যাসেজটি ছড়াতে চাচ্ছেন তাহলো ‘আপনি শুধু মানুষকে ভালবাসুন, তাদের বিচার করবেন না, তাদের পরিবর্তন করবেন না, শুধু ভালবাসুন।’

এই বেহিসাবী ভালোবাসায় পশ্চিমা সমাজ অনেকটাই দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। ইন্দ্রিয় সুখের কোন ব্যাপারেই ধর্ম কিংবা রাষ্ট এখন প্র্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায় না। মানুষের ইন্দ্রিয় যা চায় তাতেই নৈতিকতার প্রলেপ ও সমর্থন জোগাতে গিয়ে সেখানকার মরাল ইনস্টিটিউশনগুলিও ভেতর থেকে একদম ফাকা হয়ে পড়েছে । প্রস্টিটিউশন সেখানে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন ধর্মীয় বা নৈতিক অনুমোদনটিও জুটে গেছে।

প্রমোদবালাদের প্রতি যাজকদের বেহিসাবী ভালোবাসার মত একই ধরনের ভালোবাসা পোষণ করে বর্তমান সরকার তাদের পোষ্য সন্ত্রাশী ও সমাজের দুর্বৃত্তশ্রেণীর প্রতি। উপরোক্ত ধর্মযাজকদের মত এরাও প্রচার করে, ' ক্রিমিনালদের শুধু ভালোবাসুন ( ওসমান পরিবারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা দ্রষ্টব্য) , তাদের বিচার করবেন না ( র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর গোস্বা দ্রষ্টব্য) , তাদের পরিবর্তন করবেন না , শুধুই তাদেরকে ভালবাসুন।’

শুধু সরকার নয়, সরকার বান্ধব মিডিয়া ও সুশীল সমাজ একই বেহিসাবী ভালোবাসায় আবদ্ধ। প্রফেসর জাফর ইকবাল প্রায়শই 'তোমরা যারা শিবির করো' বলে নসিহত করেন। কিন্তু একই ধরনের নসিহত ছাত্রলীগের জন্যে হাজারগুন জরুরি হয়ে দেখা দিলেও তা কখনই করেন না। ছাত্রলীগকে ভালোবাসতে চান,পরিবর্তন করতে চান না।

প্রশাসন ও পুলিশের সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিবির নেতার পায়ের গোড়ালি কেটে দিয়েছে ছাত্রলীগ। ঘটনাটি উল্টো হলে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জগতে রিক্টার স্কেলে দশ বা ততোধিক মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়ে পড়ত। এই নৃশংস কর্মটির ব্যাপারে এখন যারাই কথা বলবেন তাদেরকেই জামায়াত শিবির হিসাবে গণ্য হয়ে পড়তে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক জগতের এই ফাদ বা ফাকটি দিয়েই দেশে আজ নুর হোসেনের মত হাজার হাজার দানব সৃষ্টি হয়ে পড়েছে। এই দানবরা এখন শিবির এবং অ- শিবির দুটোই খাওয়া শুরু করেছে । এটা দেখেই আমাদের টনক এখন কিছুটা নড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

১৯৯৬-২০০১ সালে শেখ হাসিনা তাঁর সুহৃদদের এক সমাবেশে বলেছিলেন, ' তোমাদের গরল (বিষ) পান করতে করতে আমি নীলকন্ঠী হয়ে পড়েছি।' এই ধরনের গরল এই টার্মে তিনি আরো বেশি করে পান করেছেন। এবার শুধু তিনি নিজে নন, পুরো সরকার এবং পুরো দেশটিই নীলকন্ঠী হয়ে পড়েছে। চোরের জাত(পদ্মা সেতুর দুর্নীতির কারনে),বাটপারের জাত(সম্মাননা ক্রেষ্টে ভেজাল) হিসাবে এই দেশ পরিচিতি পেয়ে গেছে।

সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে গণশত্রুদের প্রতি এই ধরনের প্রশ্রয় একটি সমাজকে কোথায় ঠেলে নিতে পারে আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। নিজের সোনার ছেলে ও সোনার মন্ত্রীদের কুকীর্তি ঢাকতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মায়ের গহনা বানালেও স্বর্ণকার তা থেকে সোনা চুরি করে !

এই ধরনের প্রশ্রয় পেয়েই চেটে খাওয়ার দল এখন গোগ্রাসে খাচ্ছে। কয়েকজন আবুল মিলে পুরো পদ্মা সেতু সাবাড় করে ফেলেছে।

সেই আবুল হোসেনকে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী সার্টিফাই করেছেন সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক হিসাবে । শেয়ার বাজার কেলেংকারীর হোতাদের নাম উচ্চারণ করতে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আতকে উঠেছেন । সব কেলেংকারীর মূল হোতাদের চেহারা স্পষ্ট হলেও তাদের কেউ কখনই পাকড়াও হয় নি।

এই সব সম্ভব হয়েছে ক্রিমিনালদের প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের এই বেহিসাবী ভালোবাসার কারনেই। শামীম ওসমানদের প্রতি তার আপার এই বেহিসাবী ভালোবাসা দেখে জনগণ আতংকিত হয়েছে।

হল মার্কের এমডিকে গ্রেফতার করে জনরোষ কমানো হলেও সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের কারও শরীরে একটা সামান্য টোকাও লাগে নি। রানা প্রাজার রানার প্রতি আওয়ামী এমপির মহব্বত বা বেহিসাবী ভালোবাসা দেখেছে সারা দেশবাসী। সেই রানা প্লাজার রানাকে নিয়ে অনেক লেফট রাইট করা হলেও এখনও সেই রানার কিছুই হয় নি। বরং সেই বেহিসাবী ভালোবাসা প্রদর্শনের কারনে আরো নতুন নতুন রানার পয়দা হচ্ছে।

হল মার্কের সাথে যে উপদেষ্টার নাম জড়িয়েছিল তার গায়ের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য জায়গা থেকে আজ পর্যন্ত একটি লোমও খসেনি। এই লুটেরাদের কেউ কেউ যখন টক শোতে এসে জাতিকে এখনও নৈতিকতা শেখান, নানা উপদেশ বিলান তখন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা লাগে।

এখানে ছোট ছোট ক্রিমিনালদের স্কেইপ গোট বানিয়ে সামান্য, বিচার করা হলেও বড় বড় ক্রিমিনাল বা পালের গোদাদের কোন বিচার হয় না। বরং এরা এমপি হলে মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মন্ত্রী জামাতা সাত খুনের দায়ে অভিযুক্ত হলেও এবং মন্ত্রী পরিবারের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট হলেও সেই মন্ত্রী মনে করেন যে প্রধানমন্ত্রী এবং আল্লাহ ছাড়া তাকে আর কেউ কিছু করতে পারবে না।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সরকার গঠন করলে আগাছা পরগাছা এসে সরকারে যোগ দেয়। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বা উপলব্দি সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তবে একটাই প্রশ্ন , এই আগাছা- পরগাছা চিহ্নিত হলেও তাদের উপড়ানো হচ্ছে না কেন ?

ডিএনএ টেষ্টের ফলাফল জনগনের কাছে পৌছে গেছে। একই জরায়ূ থেকেই এদের সকলের সৃষ্টি। জনগণ বুঝে ফেলেছে এগুলি আগাছা বা পরগাছা নয় - এগুলিই মূল গাছা ।

লেখক- মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

(লেখকের মতামতটি একান্তই নিজস্ব, যার জন্য টাইমনিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়)

ঢাকা, ১৮ জুন(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস