“তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৯৩)। “তাদেরকে (দীনের শত্রুদের) যেখানেই পাও তাদের সাথে যুদ্ধ করো।

যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে তোমরাও তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দাও। কেননা মানব হত্যা যদিও খারাপ কাজ, তবে ফিতনা সৃষ্টি মানবহত্যার চেয়েও খারাপ। –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৯১)।

প্রশ্ন হলো, ফিতনা কি? ফিতনার নির্মূলই বা কেন মানবহ্ত্যার চেয়ে অধীক গুরুত্বপূর্ণ রূপে বর্নিত হলো? ফিতনা হলো এমন এক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি যা অসম্ভব করে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ।

শত্রু শক্তির পক্ষ থেকে এটি হলো আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সত্য দীন বিলুপ্তির চেষ্টা। সে বিলুপ্তির মধ্য দিয়েই ফিতনা সৃষ্টিকারীরা অসম্ভব করে শরিয়তের পালন তথা ইসলাম পালন। তাদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে বা রাষ্ট্রের বুকে তারা শক্তি সঞ্চয় করলে তারা অসম্ভব করে মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনী এজেন্ডার বাস্তবায়ন।

এখানেই ফিতনার বিপদ। কারণ তা অসম্ভব করে জান্নাতে পথে পথ চলা। স্রেফ নিহত হওয়ার জন্য কেউ জাহান্নামে যায় না; বরং যায় পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণে। এবং সে পথভ্রষ্টতা বাড়ায় ফিতনা সৃষ্টিকারীরা। শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে লাগাতর বিদ্রোহের জন্ম দেয়াই তাদের কাজ।

বিদ্রোহের সে কাজটিই প্রবলতর হয় যদি দেশ কাফের বা ইসলাম বিরোধীদের হাতে অধিকৃত হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় সেক্যুলার রাজনীতি, ইসলাম-বর্জিত শিক্ষা-সংস্কৃতি, সেক্যুলার প্রশাসন ও শরিয়ত বিরোধী আইন-আদালত। ফিতনা সৃষ্টি করে এমন কি সে সব মোল্লা-মৌলভী, পীর-দরবেশ ও আলেমগণও -যারা বলে স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের মধ্যেই প্রকৃত ইসলাম এবং তাতেই জুটবে জান্নাত।

তারা শুধু ইসলামের কয়েকটি খুঁটি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু ইসলামের পূর্ণ ইমারতের নির্মাণ নিয়ে ভাবে না। এভাবে তারা অসম্ভব করে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিশ দেশগুলিতে এরূপ ফিতনা কারীরাই বিজয়ী। ফলে দেশের আইন-আদালত থেকে বিলুপ্ত হয়েছে মহান আল্লাহতায়াল শরিয়তি বিধান এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইংরেজ কাফেরদের প্রণীত কুফরি আইন।

এর ফলে অসম্ভব হয়েছে চুরি-ডাকাতি, ব্যাভিচার, খুন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে শরিয়তি বিধানের প্রয়োগ। দেশ থেকে ফিতনা নির্মূল না করলে নির্মূল হয় ইসলাম –বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ। ফলে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত ও হুদুদের প্রয়োগ, খেলাফতের বিধান, জিহাদ এবং প্যানইসলামিক মুসলিম একতা, তা বাংলাদেশে বেঁচে নেই।

পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের। ...তারা জালেম। ...তারা ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত, ৪৪, ৪৫, ৪৭)।

পবিত্র কোর’আনের অন্যত্র নির্দেশ দেয়া হয়েছে “উদখুল্ ফিস্ সিলমে কা’ফফা” অর্থঃ তোমরা ইসলামে প্রবেশ করো পূর্ণ ভাবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, জীবনের কোন একটি অংশ বা পর্ব –সেটি রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ হোক, সেটিকে ইসলামী বিধানের বাইরে রেখো না।”

মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করা নয়; বরং সেটি হলো জীবনের প্রতিটি দিনের প্রতিটি ঘন্টা ও প্রতিটি সেকেন্ডকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের পূর্ণ আনুগত্যের মধ্যে কাটানো। অবাধ্যতা কাফেরে পরিণত করে।

শরিয়তি বিধানের মাঝে রয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার অসংখ্য হুকুম। এ হুকুমগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে কোন ব্যক্তি মুসলিমের ঘরে জন্ম নিয়েও কি মুসলিম হতে পারে? সে তখন কাফের, জালেম ও ফাসেকে পরিণত হয়। উপরে বর্নিত সুরা মায়েদা’র আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তো নিজের সে ফয়সালাটিই জানিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা না দেয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা হুকুমের বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহটাই অতি প্রবল ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু তা নিয়ে ভাবনা নাই। ভাবনা নাই এমন কি তাদেরও যারা নিজেদেরকে আলেম বা ঈমানদার রূপে জাহির করে। কথা হলো, এরূপ ভাবনা শূণ্যতা নিয়ে তারা আখেরাতে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কীরূপে হিসাব দিবে?

পবিত্র কোর’আনের অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় হলো, মহান আল্লাহতয়ালার কেবল মাত্র একটি হুকুম অমান্য করার অপরাধে ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, যারা পদে পদে শরিয়তের হুকুম, সূদ-ঘুষের হুকুম, পর্দার হুকুমের ন্যায় অসংখ্য হুকুম অমান্য করছে তারা কি ইবলিসের চেয়ে কম শয়তান? অথচ মুসলিম দেশগুলিতে তাদের সংখ্যাটি বিপুল এবং প্রতিটি মুসলিম দেশ মূলতঃ তাদের হাতেই অধিকৃত।

কথা হলো, এরূপ বিদ্রোহ নিয়ে কি দোয়া করলে কি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হয়? দোয়া কবুলেরও শর্ত আছে। পবিত্র কোর’আনে সে শর্তটির কথা বলা হয়েছে সুরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে। আয়াতটিতে বলা হয়েছেঃ “(হে নবী), আমার বান্দাহগণ যখন আমার ব্যাপারে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে (তখন তাদেরকে বলে দাও) আমি নিশ্চয়ই তাদের নিকটে, তারা যখন দোয়া করে তখন আমি তাদের দোয়ার জবাব দেই। তবে (তাদেরও দায়িত্ব হলো) তারা অবশ্যই আমার হুকুমও মান্য করবে এবং অবশ্যই ঈমান আনবে আমার উপর। (এবং এমনটি হলেই) আশা করা যায় তারা সঠিক পথে পরিচালিত হবে।"

কথা হলো, মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আনুগত্য তো তার শরিয়তি আহকামগুলি মেন চলার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে শরিয়তি হুকুমের বদলে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রণীত আইনের। এটি কি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়? এরূপ বিদ্রোহ নিয়ে দোয়ার আসরে, আখেরী মোনাজাতের মজলিসে বা আরাফাতের ময়দানে হাত তুলে চোখের পানি যতই ফেলা হোক–সে দোয়া কি কবুল হয়? কারণ, এরূপ দোয়ায় দোয়া কবুলের শর্তই তো মানা হয়নি।

প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ হাত তুলে দোয়া করলে তাদের সাহায্যে হাজার হাজার ফেরেশতারা নেমে আসতো। আকাশ থেকে বৃষ্টি নামতো, নদীর প্লাবন থেমে যেত। ইতিহাসে এর প্রমাণ রয়েছে। এর কারণ, তাদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার কোন হুকুমের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ ছিল না। কোন রূপ বিদ্রোহের কথা তারা ভাবতেই পারতো নয়।

কারণ বিদ্রোহ তো শয়তানের খাসলত, মুসলিমের নয়। অথচ আজকের মুসলিমদের বাঁচাটিই বিদ্রোহ নিয়ে। এবং সে বিদ্রোহের আলামত হলোঃ আদালতে ব্রিটিশ কাফেরদের রচিত আইন, রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের বিজয়, অফিসে অফিসে ঘুষ, প্রতি নগরে সূদি ব্যাংক, অলিতে-গলিতে পতিতাপল্লি, মহিলাদের মাথায় বেপর্দা-লেবাসে বিদ্রোহের ঝান্ডা।

দোয়া কবুল নয়, বরং শাস্তিই যে পাওনা -তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? বিদ্রোহীদের জন্য এমন শাস্তির কথা তো পবিত্র কোর’আনে বার বার শোনানো হয়েছে।

লেখক: ফিরোজ মাহবুব কামাল।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এএস