মায়ানমারের সামরিক বাহিনী মনে করেছিল যে, রাখাইনের মুসলমানদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারলেই সব সমস্যা মিটে যাবে। পুরো দেশকে মুসলিম মুক্ত করে মায়ানমারকে বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হবে। আরাকান রাজ্যের অফুরন্ত সম্পদ ভান্ডরও তাদের হস্তগত হবে।
মুসলমানদের নাম-নিশানাও মিশে যাবে আরাকান থেকে। কিন্তু তারা কাজটা যত সহজ মনে করেছিল আসলে কাজটা তত সহজ হচ্ছে না। তারা রূঢ় বাস্তবতাকে কোন ভাবেই উপেক্ষা করতে পারছে না। দেশটি নানা ছলছুতায় সময় ক্ষেপন করলেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেনি।
কারণ, আন্তর্জাতিক মহল মায়ানমারের এমন অমানবিক ও গর্হিত আচরণকে কোন ভাবেই মেনে নেয়নি। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের অবস্থা এখন ত্রাহি মধুসূদন বলেই মনে হচ্ছে। আর যত দিন যাবে তা আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছেন কুটনৈতিক সূত্রগুলো।
জাতিসংঘ দাবি করছে যে, মায়ানমার সরকার জাতিগতভাবে নিধনের জন্যই রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে। প্রথম দিকে ভারত, রাশিয়া ও চীন মায়ানমারের পক্ষে কথা বললে তারা এখন বেশ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনিও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পক্ষেই কথা বলেছেন। চীনও অনুরূপ প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্ত করছে সর্বসাম্প্রতিক সময়ে। রাশিয়াও তাদের পূর্বের অবস্থান পরিবর্তন করার আভাস পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ পূর্ণ মর্যাদায় নিজ দেশে ফেরৎ যাওয়ার পক্ষে এবং তারা বিষয়টি নিয়ে জোড়ালো অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাই রোহিঙ্গা ইস্যু মায়ানমার এখন অনেকটাই একঘরে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের জন্য যথেষ্ট চাপের মুখে পড়েছে মায়ানমার সরকার।
শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমারের পক্ষে কথা বলেনি। এখন দেশটি মায়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। যা দেশটিকে রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ, দেশটি নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার অতীতের সকল সীমা লঙ্ঘন করেছে।
মায়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এবার রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভারত ও চীনের সক্রিয় তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বড় দুই শক্তি অবশ্য দেশটির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে নিজস্ব উপায়ে দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। সংকট নিরসনের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মায়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে কাজ করছে ভারত।
অপরদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন কোনো পক্ষপাতমূলক অবস্থান নিচ্ছে না। চীনের কাছে উভয় দেশেরই গুরুত্ব রয়েছে। তাই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন। ঢাকার কুটনৈতিক সূত্রগুলো এমনই আভাস দিয়েছে।
চীনের বিশেষ দূত গত ২৫ অক্টোবর ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ ও মায়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে সংকট নিরসন করুক এটাই চায় চীন।
এ বৈঠকে চীনের দূত জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন কোনো পক্ষপাতমূলক অবস্থান নেবে না। চীনের কাছে উভয় দেশেরই গুরুত্ব রয়েছে।
অপরদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ওইসিডি ও ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি অবহিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৈঠক শেষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তবে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমার কোনো সাড়া না দিলে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ভাবছে বলে জানান বার্নিকাট। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যু মায়ানমার অনেকটা গ্যাড়াকলেই পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
প্রাপ্ততথ্যে জানা গেছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরকালে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সফরের সময় সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন, রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কেননা এই পরিস্থিতির ফলে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ভারত এসব রোহিঙ্গাদের টেকসই উপায়ে রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানোর প্রতি জোর দিয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে ফিরে গিয়ে তারা যাতে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তা নিরসনে মানবিক ত্রাণ নিয়ে ‘অপারেশন ইনসানিয়াত’ পরিচালনা করেছে ভারত। ভারত ইতিমধ্যে ৯২ হাজার ফ্যামিলি প্যাক খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে।
ভারতীয় কুটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, ‘আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি। তবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি দেখালে তার ফল খারাপ হতে পারে। আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোসহ সংকটের সার্বিক সমাধানের জন্য দ্বিপক্ষীয়ভাবে যুক্ত আছি। আমাদের এ সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি রাখাইনে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণে আমরা আগ্রহী। রোহিঙ্গাসহ সব সম্প্রদায়কে সেখানে বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে এটা জরুরী।’
এক প্রশ্নের জবাবে সূত্রটি জানায়, ‘রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। খালেদা জিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এই ইস্যুতে তার দলের জোরালো অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে রোহিঙ্গা বিষয়ে আলোচনা করতে চীনের এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সুন গোসিয়াং গত ২৫ অক্টোবর ভোরে এক দিনের সফরে ঢাকায় আসেন। তিনি পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গুসিয়াংয়ের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এটি দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফর। ইতিপূর্বে এপ্রিলেও তিনি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।
সুন গোসিয়াং মায়ানমারে শান্তি প্রক্রিয়া নিয়েও কাজ করে থাকেন। মায়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ক্ষমতায় গিয়ে দেশটিতে জাতিগত সংহতি প্রতিষ্ঠায় পালং সম্মেলন করেছেন। মায়ানমারে সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মী সম্প্রদায়ের বাইরে ১৩৫টি জাতি গোষ্ঠী রয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মীরা চান তারাই মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তার করে থাকবেন। এ নিয়ে জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে নানা বিদ্রোহী গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মধ্যে চীন সীমান্ত এলাকাতেও একটি বিদ্রোহী গ্রুপ রয়েছে। ওই সীমান্তে মিয়ানমার যাতে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করে তা নিয়ে কাজ করেন সুন গোসিয়াং।
মায়ানমারে রোহিঙ্গারা ১৩৫টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাইরে। কেননা রোহিঙ্গাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই। ফলে জাতিগত সংহতি উদ্যোগে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সুন গোসিয়াং এপ্রিলে বাংলাদেশ সফরকালে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে না নেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তারপর ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের বড় ধরনের ঢল বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করায় বিষয়টির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি পড়ে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য ভেটো দেয়ার আশঙ্কায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ‘চীনের বিশেষ দূত বলেছেন, বাংলাদেশ ও মায়ানমার উভয়েই চীনের বন্ধু। উভয় দেশই চীনের কৌশলগত অংশীদার। চীন কোনো পক্ষেই যাবে না। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে দ্বিপক্ষীয়ভাবে যুক্ত হওয়াকে চীন স্বাগত জানায়। তবে চীনের নীতি হল কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।
ফলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার মিলে এ সংকট সমাধানে সমর্থ হবে বলে আশা করি।’ চীনা দূতাবাস সূত্র জানিয়েছে, ‘চীন রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাধা দিলে এ ইস্যু নিরাপত্তা পরিষদে উঠল কিভাবে? আমরা আমাদের পথে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভূমিকা পালন করছি। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো পক্ষ চীনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে চীন রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের বিপক্ষে বলে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।’
অপরদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত ২৫ অক্টোবর ৩৫ দেশের জোট ‘দ্য অর্গানাইজেশন ফল ইকোনমিক কো অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (ওইসিডি) এবং ব্রাজিল, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্র সচিব। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমারের নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের কথা অভিযোগ করা হয়। বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোর রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রচেষ্টা চালানো উচিত’।
চীন ও ভারতের ভূমিকা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে এ দু’দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোনো মতপার্থক্য নেই। তারাও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়। আমরাও এ সংকটের সমাধান চাই।’ মার্কিন রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মায়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাংলাদেশে যুক্ত থাকার প্রশংসা করেন। তবে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, সংকট নিরসনে মিয়ানমার সাড়া না দিলে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তা স্থগিত, নিপীড়নকারীদের বিচারের আহবান এবং মিয়ানমারের ওপর গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইন প্রয়োগের হুমকি দিয়েছে। রাখাইনে গণহত্যার বিরুদ্ধে ও যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে। ফলে মায়ানমারের জন্য এখন উভয় সংকট দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিধন চালানোর কারণে মায়ানমারের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি শুরু করেছে জাস্টিস ফর বেটার ওয়ার্ল্ড। ক্ষতিগ্রস্থ ছয় হাজার রোহিঙ্গা নারী-শিশুর কাছ থেকে গণহত্যাসহ মানবতার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাদের অপরাধের তথ্য-প্রামাণাদি সংগ্রহ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু, তুলাতুলিসহ বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম জনগোষ্ঠির বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে মিয়ানমারের সেনারা। সেই আগুন আর নির্বিচারে হত্যার শিকার হয়ে অনেকে হারিয়েছে সবকিছু। এমনই একজন কিশোরী হারিয়েছে পরিবারের ২২ সদস্যের মধ্যে বাবা-মাসহ ২০ জনকে। আর বাবা-মাসহ ৭ ভাইবোনের সবাইকে হারিয়েছে এক কিশোর।
অনেক কিশোরী বধূদের স্বামীরা আর ফিরে আসেনি। স্বামী আর ছেলেকে হারিয়েছেন এমন বৃদ্ধার সংখ্যাও কম নয়। এমন অসংখ্য হত্যা ও ধর্ষণের তথ্য প্রমাণ পেয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক মানবাধিবার সংস্থা জাস্টিস ফর বেটার ওয়ার্ল্ড-এর পক্ষ থেকে টেকনাফ উখিয়া ও নাইক্ষ্যাংছড়ির বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে এ পর্যন্ত ছয় হাজার ক্ষতিগ্রস্ত নারী-শিশু ও পুরুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে মানবতা বিরোধী অপরাধের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
মিয়ানমার থেকেও সংগ্রহ করা আরো তথ্য-প্রমাণ। এই প্রমাণ নিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে। এর আগে বসনিয়া, চিলি, উগান্ডাসহ বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তের গনহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে মামলার অভিজ্ঞতা নিয়েই রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলা করার কথা জানান বিভিন্ন দেশে আইনী লড়াইয়ে যুক্ত থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. সাঈদ মহিউদ্দিন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট। ৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।
সেনাবাহিনীর হামলা ও সহিংসতার মাত্রার ভয়াবহতার কারণে জাতিসংঘ একে ‘পাঠ্যবইয়ে যোগ করার মতো জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকান্ড শুরু করে।
রাখাইন রাজ্যে মায়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্বিচারে গণহত্যা এবং নিধনযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে সেখানে জাতিসংঘ তদন্ত দল বা মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলেকে এতোদিন পর্যন্ত প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে মায়ানমার সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ ও বিশ্বজনমতের উদ্বেগের মুখেই জাতিসংঘকে রাখাইন রাজ্যে খাদ্যসহায়তা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে দেশটির সরকার। সংস্থাটির মুখপাত্র বেটিনা লুয়েশার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের খাদ্যসহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে সবুজসংকেত পেয়েছে সংস্থাটি। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সমন্বয় করার জন্য আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করব।’ ফলে মায়ানমার সরকার যে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রবল চাপের মুখে পড়েছে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
সার্বিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটা ব্যাকফুটে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, মায়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ জঙ্গীদের নির্মমতা বিশ্ববিবেককে রীতিমত স্তম্ভিত করেছে। মূলত বর্মী বাহিনীর নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
তাই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই রোহিঙ্গাদের পক্ষে একটা বিশ্ব জনমত সৃষ্টি হয়েছে। যা মায়ানমার সরকারকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। তারা যে লক্ষ্য ও উদ্দেশে নিয়ে রাখাইনে অভিযান শুরু করেছিল সে লক্ষ্যে পৌঁছা এখন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। তাই আগামীর চথচলাটা মায়ানমারের জন্য সহজ নাও হতে পারে। বাস্তবতাটা সময়ই বলে দেবে।
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





