প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর নিয়ে শুধু দেশেই নয় বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। সরকার পক্ষ বিষয়টি নিয়ে তেমন রাখ-ঢাক না করলেও এ নিয়ে আলোচনার কমতি নেই বিরোধী মহলে। এমনকি সাধারণ মানুষের মুখে মুখেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশের কি কি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে তা নিয়ে আলোচনাটাও বেশ জমে উঠেছে। আর এ আলোচনার ডালপালা গজিয়ে এখন ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি পর্যন্ত ঠেকেছে। বিষয়টি নিয়ে নিরবতা ভঙ্গ করে সরকারের পক্ষে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। যা চলমান প্রসঙ্গে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

গওহর রিজভীর বক্তব্য হলো ‘ভারত চায় দু’দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষাচুক্তি। আর বাংলাদেশ চায় সমঝোতা স্মারক’। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্মাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভারতের সাথে দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি সরকার করবে না’। আবার ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ‘ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তিটা দ্রুতই সম্পাদিত হওয়া দরকার’। যদিও এ বক্তব্য সরকারের নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে দু’দেশের মধ্যে এতদসংক্রান্ত এক বা একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে তা মোটামোটি নিশ্চিত। কিন্তু প্রস্তাবিত এই প্রতিরক্ষা চুক্তি বা স্মারক দ্বি-পাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্টতায় হচ্ছে, না কোন পক্ষকে একতরফা আনুকুল্য দেয়ার জন্যই হচ্ছে তা নিয়েই যত বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে একথা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য একটা চুক্তির বিষয়ে ভারতে আগ্রহটা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই বেশী। তাই বাংলাদেশের অবস্থাটা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মত। অনেকটা ‘ত্রাহি মধুসূদন’ বলা চলে। আর এর সুবিধাটাও ভারত কড়ায়গন্ডায় বুঝে নিতে চায়। কারণ, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের সমান্তরালে কোন শক্তি বা প্রতিদ্বন্দ্বী মাথাচারা দিয়ে উঠুক তা কখনো চায় না। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও চীন। আর এ দু’দেশের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়েই সরকার অনেকটাই বিপাকে পড়েছে। এমনটাই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

সাম্প্রতিক সময়ে চীন-ভারতের প্রভাব বিস্তারের লড়াইটা বেশ জমে উঠেছে। তাই চীনের সাথে কোন প্রতিবেশীর গাটছাড়া বা সখ্যতা কখনোই পছন্দ করবে না ভারত। আর চীনের ক্ষেত্রেও এমনটাই প্রযোজ্য। তাই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরকে ভারত পুরোপুরি কাজে লাগাতে কসুর করার কথা নয়। সঙ্গত কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকে ঘিরে এই লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। যা চীনের জন্যও এখন রীতিমত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শেখ হাসিনার ভারত সফরে বেইজিং সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলে জানিয়েছে চীনা সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। আর এর যৌক্তিক কারণও আছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল।

সম্প্রতি ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থ সহায়তা দিতে পারে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে বেইজিং এবং নয়াদিল্লির লড়াইয়ের মাঝে এই অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার ভারত-চীনের লড়াই বাড়ছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশি দেশটিতে ভারতের এই অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প উন্নয়নে। এই অর্থ যাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার প্লান্ট, বন্দর, রেলওয়ে ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায়। দুই দেশের মাঝে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি, ভূটানে পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, জাহাজ নির্মাণ, বর্ডার পোস্ট উন্নয়নসহ নয়াদিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।

এছাড়াও চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর দিয়ে ভারতের পণ্য পরিবহনে ট্রানজিট তথা করিডোর সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির তোড়জোড় চলছে বলে জ্ঞাত হওয়া গেছে। উভয় বন্দরে ভারতের আমদানি ও রফতানি পণ্য নৌ, রেল ও সড়কপথে পরিবহনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আবার ট্রানজিট পণ্য হ্যান্ডলিং করার জন্য দুই বন্দরে সুনির্দিষ্টভাবে বিশেষায়িত ইয়ার্ড-শেড পেতে চায় ভারত। শুধু তাই নয়; বিনা মাসুলে ট্রানজিট সুবিধায় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে ব্যবহারের জন্য নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আগামী ৭-১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরকালে ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে ট্রানজিট ব্যবস্থা প্রদান সম্পর্কিত চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলছে।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে ( সেভেন সিস্টার) পণ্যসামগ্রী পরিবহনের জন্য ভারত এই ট্রানজিটের কথা বলছে। বন্দর বিশেষজ্ঞ, ব্যবহারকারী তথা স্টেকহোল্ডারগণ বলছেন, দেশেরই আমদানি-রফতানিমুখী পণ্য পরিবহনের চাহিদার ক্ষেত্রে বর্তমানে উভয় সমুদ্র বন্দর সক্ষমতায় অনেক পেছনে রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথের অবকাঠামোও শুধু সীমিতই নয় বরং অপর্যাপ্তও। সেখানে যদি ভারতীয় পণ্য পরিবহনের ট্রানজিট দেয়া হয় তাহলে জরাজীর্ণ ও সীমিত অবকাঠামোসহ সামগ্রিকভাবে পরিবহন ব্যবস্থা আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ভেঙে পড়বে। এ অবস্থায় ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে ট্রানজিট দেয়া শুধু অদূরদর্শিতাই নয় বরং আত্মঘাতিও হবে।

চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দরকে ট্রানজিট কিংবা করিডোর সুবিধার আওতায় ব্যবহারের জন্য ভারত বিভিন্ন কৌশলে আবদার, চাপ ও পীড়াপীড়ি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। বর্তমান পর্যায়ে এসে উভয় বন্দরে ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত ইয়ার্ড বা জায়গা’ সুনির্দিষ্ট করে পেতে চায় ভারত। এর জন্য ভারতের পক্ষ থেকে ফের পীড়াপীড়ি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের দু’টি প্রধান সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে দেশটি এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে পণ্যসামগ্রী পরিবহন করতে চায়। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের ভূমি-বেষ্টিত ৭টি রাজ্যে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনে ভারত গুরুত্ব দিচ্ছে। উভয় বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কিছু ফি ছাড়া অন্য কোনো রকম ‘শুল্ক-কর’ ‘রাজস্ব’ ‘মাশুল’ অথবা কোনো ধরনের ট্রানজিট ‘ফি’ আরোপ ও আদায় না করার শর্তযুক্ত একতরফা লাভের ট্রানজিটের জন্যও ভারত আবদার করছে।

বৃহত প্রতিবেশী ভারতের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও আঞ্চলিক ইস্যুতে শেখ হাসিনার সরকার ঝানু খেলোয়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ১৯৭১ সহ বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে টানাপড়েন চললেও তাদের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি আওয়ামী লীগ সরকার বরং ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্কও বজায় রেখেছে। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীই বলেছেন, পাকিস্তানের সাথে ঝগড়া-ঝাটিও থাকবে, আবার কুটনৈতিক সম্পর্কও চলবে। যুদ্ধাপাধ ইস্যুতে তুরস্কের সাথে চরম তিক্ততা শুরু হলেও সরকার এ ক্ষেত্রে চরমপন্থা অবলম্বেন করেনি। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।

ভারতের সাথে ক্ষমতাসীনদের মধুচন্দ্রিমা চললে তারা অপ্রকৃতিস্থ হয়নি বলেই মনে হয়। গত বছরে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর সহ বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর থেকেই তা প্রমাণিত। এমনকি চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রথমবারের মত দু’টি সাবমেরিন কেনার ঘটনাও ঘটে। এছাড়াও বন্দর এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প স্থাপনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বিশাল অঙ্কের ঋণ সহায়তা দিয়ে আসছে চীন। বেইজিংয়ের এই ঋণ সহায়তাকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না নয়াদিল্লি। তাই বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার প্রতিবেশি অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ভারত।

আসলে চীনের কাছে সাবমেরিন কেনার বিষয়টি আওয়ামী লীগের অকৃত্রিম বন্ধু ভারত স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বলেই মনে হয়। তারা এই সাবমেরিক কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে জানা যায়। ফলে ভারতের সাথে সরকারের কিছুটা দুরত্ব ও মান-অভিমানের সৃষ্টি হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তাই ভারত একথা মনে করতে শুরু করে যে, বাংলাদেশ সরকার ক্রমেই ভারত নির্ভরতা ছেড়ে চীনমূখী পররাষ্ট্রনীতি শুরু করছে। ফলে ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যটা কিছুটা হুমকীর মুখোমুখী বলে মনে করছেন দিল্লির সাউথ বøক। তাই তারা প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চায়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা না গেলেও পরিস্থিতি সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচেছ।

আসলে চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন কিনে প্রধানমন্ত্রী এখন বিপাকে পড়েছেন। কারণ, ক্ষমতাসীনদের পরীক্ষিপ্ত বন্ধু তা মোটেই ভাল চোখে দেখেনি। তারা মনে করছে শেখ হাসিনার ওপর চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত তার পরীক্ষিত বন্ধুর এ ধরনের বিচ্যুতিতে অনেকটাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। দেশটি এখন শেখ হাসিনার ওপর থেকে চীনের প্রভাব কাটাতেই প্রতিরক্ষা চুক্তি করার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও চারদিকে খেলতে গিয়ে এধরনের হোঁচট খাবেন তা তিনি আগে ভাবতে পারেননি। কারণ, ভারত যে নাছোড়বান্দার মতো তার স্বার্থের অনুকূল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি নিশ্চিত করতে চায়, এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে আটকে পড়তে হবে তা প্রধানমন্ত্রী পূর্বে অনুমান করতে পারেননি। বস্তুত পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নিচ্ছে বলেই মনে হচেছ এবং বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহের কমতি থাকা স্বত্তে¡ও একটি অসম ও বৈষম্যপূর্ণ চুক্তিই হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, যে ভারত বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার উৎস তারা যদি বেঁকে বসেন তাহলে বাংলাদেশ সরকারের জন্য তা মহাউদ্বেগ ও মহা দুশ্চিন্তার বিষয়। বিশ্বস্ত বন্ধুকে অখুশি করে কোনো কাজ করা যায় না। তাই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ভারত অসন্তষ্ট ঝুঁকি নেয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা হারানোর ভয়টা সব সময় তারা করে ফিরছে। তার প্রমাণ মিলে দলীয় সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য থেকে। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ক্ষমতা হারালে বাঁচতে পারবেন না। সঙ্গত কারণেই ক্ষমতা রক্ষার ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে অনেকটা বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি হয়েছে বলেই মনে হচেছ।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত মতে, ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে হবে, এর মাধ্যমে দু’দেশের যৌথ সামরিক মহড়া হবে, এই চুক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে দু’দেশের মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে ইত্যাদি চুক্তির অন্তর্ভূক্ত থাকবে। বোদ্ধামহলের ধারণা এই বিষয়গুলো নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিলীন হয়ে যাবে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা হারাবে। এটার পরিণতি হবে ভয়ানক। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক বলেছেন, সার্বভৌম অক্ষুন্ন রেখেই ভারতের সাথে চুক্তি সম্পাদন করা হবে। কিন্তু তা কতখানি বাস্তবসম্মত হবে তা এখনই দিব্যি দিয়ে বলা যাচ্ছে না। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় পরিস্থিতি খুব অনুকুল বলে মনে হয় না।

স্মরণ করা দরকার যে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকাকে দু’শ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ-সহায়তার ঘোষণা দেয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই সময় নরেন্দ্র মোদি বলেন, সড়ক, রেল, সমুদ্রপথ এবং টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মোদির ওই সফরের আগে সড়ক, রেল ও সমুদ্র পথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতি সুসংহত করতে বাংলাদেশকে আট কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দেয় ভারত।

ভারত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবেশি দেশগুলোকে ঐক্যবন্ধ করতে চায়। তবে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে ভারতের ঋণ সহায়তা চীনের ঋণের তুলনায় অনেক কম। গত বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পাকিস্তানের অবকাঠামো প্রকল্পে অত্যন্ত স্বল্প সুদে দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দেন। এই ঋণ সহায়তা ছাড়াও পাকিস্তানের অন্যান্য প্রকল্পে এবং শ্রীলঙ্কায় চীনের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে।

মূলত আঞ্চলিক প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার ঘুর্ণাবর্তেই বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের কাছে সমান গুরুত্ব বহন করে। তাই কোন পক্ষই বাংলাদেশকে হাতছাড়া করতে রাজী নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারত সবসময়ই বাংলাদেশে তাদের অনুগত ও পছন্দের সরকার দেখতে চেয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে এর ব্যত্যয় ঘটলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত এ বিষয়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। তাই তারা যেকোন মূল্যেই তাদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখতে চায়।

ভারত বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের উপর যেমন আস্থা রেখেছে, ঠিক তেমনিভাবে ক্ষমতাসীনরাও ভারতে প্রতি অকুন্ঠ আনুগত্য করে যাচ্ছে। আর প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে তার ষোলকলা পূর্ণ হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পোয়াবারো হলেও বাংলাদেশের প্রাপ্তিটা শুণ্যই থাকছে বলে মনে হচ্ছে। তিস্তাচুক্তি অনেক কথা বলা হলেও এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি বরং পশ্চিম বাংলার মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশকে ‘স্যরি’ বলেছেন। আর রাজ্য সরকারের সম্মতি ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সাথে তিস্তাচুক্তি করবে বলে মনে হয় না। তাই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে সম্ভাব্য সকল চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)