‘শর্ষের ভেতরে ভুত’ কথাটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত। এই কথা বা প্রবাদটি কেউ শোনেননি, এমন কেউ বোধহয় নেই। কথাটির সরলার্থ করলে দাঁড়ায়, যাকে বা যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যেই গলদ। দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে নিজেরাই দুর্নীতি করেছেন বা আমানতের খেয়ানত করেছেন এসব বোঝাতেই ‘শর্ষের ভেতরে ভুত’ প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়।
“শর্ষের ভেতরে ভুত” সব সময়ই ছিলো, এখনো আছে। যুগে যুগে বিশ্বাস করে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে সবাই না হলেও অনেকেই দায়িত্ব পালনে কারচুপি করেছে। বিশ্বাস ভঙ্গের এই রীতি সব যুগে, সব সমাজেই ছিল, বর্তমানেও আছে। “শর্ষের ভেতরে ভুত” প্রবাদটির উৎপত্তি সময়, প্রবর্তক কে, কাঠ ঠোকরার মতো সারাজীবন মাথা ঠোকালেও তা বের করা যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে নির্দিধায় যে কথাটি বলা যায় তাহলো আমাদের বর্তমান বাস্তবতা প্রবাদটি সংশোধনের দাবি রাখে।
“শর্ষের ভেতরে ভুত” কথাটির সংশোধিত রুপ এমন হতে পারে “চালের ভেতরে ভুত”। চাল নিয়ে বর্তমানে যে ধরনের চালবাজি চলছে তাতে এমন পরিবর্তন যথেষ্ট যৌক্তিক বলেই মনে হয়। তাছাড়া চাল নিয়ে যেমন আমাদের সমাজে চালবাজি পূর্ব কাল থেকেই চলে আসছে, শর্ষে নিয়ে তেমন শর্ষেবাজির খবর আমরা কখনো শুনিনি। তাহলে নিরীহ শর্ষে বেচারারা কেন এমন “শর্ষের ভেতরে ভুত” অপবাদ সারাজীবন বইয়ে বেড়াবে?
প্রবাদটি বর্তমানে কেন সংশোধন করা যৌক্তিক এখন সেই আলোচনায় আসা যাক। দেশের দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকার ১০ টাকা মূল্যের চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বছরের মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর-এই পাঁচ মাস দেশের ৫০ লাখ হত দরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা দরে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল ডিলারের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। কারণ এসময় চালের দাম কিছুটা চড়া থাকে।
এটা নি:সন্দেহে সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কতিপয় দুর্নীতিবাজ, অসাধু ডিলারের কারণে সরকারের এই ভালো উদ্যোগ মাঠে মারা যেতে বসেছে। ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণে নানা ধরণের অনিয়মের খবর পাওয়া যাচ্ছে। মাপে কম দেয়া, ভুয়া নামে বা আত্মীয়-স্বজনের নামে কার্ড বরাদ্দ, ধনীকে গরীব সাজিয়ে কার্ড দেয়া, কার্ড বিতরণে টাকা আদায়, চাল কালোবাজারে বিক্রিসহ নানা ধরণের অভিযোগ রয়েছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। এমনকি সরকারী চাররিজীবি, স্কুল শিক্ষক ও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের নামও রয়েছে উপকারভোগীদের তালিকায়।
ময়মনসিংহের নান্দাইলে ১০ টাকা কেজির ৪৫ বস্তা চাল ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এক নেতার বাড়ী থেকে জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফলনগর ইউনিয়নে ডিলার আব্দুল লতিফের দোকানে জড়ো হওয়া ছালেক মিয়া, মদরিছ আলী, সাফিয়া খাতুনদের অভিযোগ কার্ড তৈরিতে খরচের কথা বলে স্থানীয় ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য ফজলুর রহমান ওরফে বজলু মেম্বার তাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নিয়েছেন। একই এলাকার আফিয়া বেগমের অভিযোগ তার কাছ থেকে ৫০০টাকা নিয়েছেন ওই মেম্বার (সুত্র-প্রথম আলো, ১৮-১০-২০১৬)।
১০ টাকার চাল বিতরণে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে সরকার এরইমধ্যে বেশ কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছে। গত ১৮-১০-২০১৬ তারিখে খাদ্য মন্ত্রী জানান, অনিয়মের কারণে ৪৪ জনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতির এখনো তেমন উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ প্রতিদিনই এই চাল বিতরণে অনিয়মের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
কথায় আছে চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী। এখনো বহাল তবিয়তে অনিয়ম করে যাচ্ছেন ডিলাররা। নেত্রকোনার কেন্দুয়ার বালাইশিমুল ইউনিয়নে হতদরিদ্র তালিকায় মোট ৬৮৮জন সুবিধারভোগীর নামের মধ্যে ৬২৬ নং ক্রমিকে স্বয়ং ডিলার জিয়াউর রহমান ও ৬২৮ নং ক্রমিকে তার স্ত্রী জুলেখার নাম রয়েছে। এছাড়া তার ১০/১২ জন আত্মীয়-স্বজনের নামও তালিকাবদ্ধ করেন তিনি (সুত্র-যুগান্তর, ২৯-১০-২০১৬।
যদিও স্থানীয় টিএনও’র হস্তক্ষেপে জিয়াউর রহমান ডিলারশিপ থেকে নাম প্রত্যাহারে আবেদন করেছেন। এমনকি কিছু কিছু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। অনিয়মের অভিযোগে নীলফামরীতে জনগণ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল পর্যন্ত করেছে বলে খবর বেরিয়েছে (সুত্র-বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৭-১০-২০১৬)।
যাইহোক চাল বিতরণে নানা অনিয়ম এখনো চলছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম চলছে। ডিলারদের কারচুপি ছাড়াও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনৈতিক প্রভাবও দায়ী অনিয়মের জন্য। তাছাড়া অনভিজ্ঞ ডিলারদের মাধ্যমে চাল বিতরণও অনিয়মের একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দরিদ্র মানুষের মাঝে এই চাল বিতরণে অনিয়ম দমনে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। শুধু ডিলারশিপ বাতিল নয়, জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে আশঙ্কা করি অচিরেই “শর্ষেতে নয়, চালের ভেতরে ভুত” কথাটি আপনা-আপনিই চালু হয়ে যেতে পারে। আর তা হলে এমন একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ সংশোধন বা বিকৃত যাই বলি না কেন, তার দায় বর্তমান সময়ের কর্তাদের ওপরই বর্তাবে।
লেখক, সিনিয়র রিপোর্টার বাংলাভিশন, ঢাকা
তাং-২৯.১০.২০১৬
ইমেইল: [email protected]
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





