একথা স্বীকৃত যে, আমাদের দেশ অবক্ষয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে দুর্নীতির ভয়াবহতা স্পর্শ করেনি। সরকারের পক্ষে দুর্নীতি বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতা’ কথা বলা হলেও বাস্তবতায় রীতিমত অশ্বডিম্ব। কারণ, এসব দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের সাথে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশ ক্ষমতাসীন ঘরানার।

কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা দেখা যায় না। কালেভদ্রে কিছু লক্ষ্য করা গেলেও তা হয় খুবই ক্ষণিকের; শুধুই লোক দেখানোর জন্য। ক্ষেত্র বিষয়ে তা আবার লোক হাসানোর অনুসঙ্গও হয়। কারণ, দুর্নীতি ক্ষমতাহীনরা করে না বরং এর কলকাঠি ও নিয়ন্ত্রণ থাকে ক্ষমতাসীনদের কব্জায়।

ক্ষমতাসীনরা যখন মাত্রারিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে; তাদের জবাবদিহীতার যখন কোন বাধ্যবাধকতাই থাকে না তখনই দুর্নীতি ও অনাচার হয়ে ওঠে একেবারে লাগামহীন। ‘মিড নাইট’ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কারণ, জনগণের ম্যান্ডেটহীনতার অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারের না আছে জবাবদিহীতা, আবার না আছে কোন দায়ব্ধতা। সঙ্গত কারণেই সারা দেশেই দুর্নীতি, অনিয়ম, অনাচার ও দুর্বৃত্তায়ন এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে মনিষী জন ডালবার্গ (John Dalberg) মতামতটা খুবই প্রাসঙ্গিক। তার ভাষায়, ‘Power tends to corrupt and absolute power corrupts absolutely’. অর্থাৎ ‘ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির প্রতি ঝোঁক থাকে। সীমাহীন ক্ষমতা সীমাহীন দুর্নীতির কারণ’। আমাদের ক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

অবশ্য রাজনীতিকরা আমাদেরকে সব সময়ই আশার বাণী শুনিয়ে থাকেন। আর রাজদন্ড যাদের হাতে এক্ষেত্রে তারা অনেকটাই অগ্রগামী। তাই আমরা তাদের প্রতিশ্রুতিতে আশান্বিত না হয়েও পারি না। কারণ, রাজনীতিকদেরই জনগণের ভাগ্যনিয়ন্তা বলে মনে করা হয়। সঙ্গত কারণেই আমরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখি নতুন এক সোনালী প্রভাতের। কিন্তু সে স্বপ্ন পুরুণ হয় না বরং দুর্ভাগ্য হয় আমাদের নিত্যসঙ্গী। আর এটিই হচ্ছে আমাদের দেশের রূঢ় বাস্তবতা।

মূলত দেশে যখনই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে তখনই আমরা রাজনীতিকদের মুখে নতুন নতুন আশার বাণীই শুনেছি। এমনকি মহান স্বাধীনতা সংগ্রামেও আমাদেরকে অনেক স্বপ্ন দেখানো হলেও আমরা শুধু ভৌগলিক স্বাধীনতায় পেয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। অবাধ গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ, সমাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন আজও আমাদের কাছে অধরা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ’৭৫ এর পট পরিবর্তন, ’৮২তে এরশাদের ক্ষমতা দখল, ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থান ও ২০০৬ সালের ১/১১-এর মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনের কথা বলা হলেও আমাদের ভাগ্যে তেমন কিছুই জোটোনি বরং ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে শ্রেণি বিশেষের। যখন যারাই ক্ষমতার দৃশ্যপটে এসেছে, তখন তারাই মানুষকে স্বপ্নচারি বানিয়েছে। কিন্তু আমরা সেই প্রতিশ্রুত প্রভাতের সন্ধান পাইনি বরং রাতের গভীরতা আরও বেড়েছে। মাঝে মাঝে সুরঙ্গের প্রান্তদেশে একটুখানী আলোর ঝলকানী দেখা গেলেও তা কখনোই বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি বা হতে দেয়া হয়নি। ফলে আমাদের ভাগ্যবিড়ম্বনারও অবসান হয়নি।

আমাদেরকে পর্বত প্রমাণ স্বপ্ন দেখিয়েই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। দুর্নীতিমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ, ঘরে ঘরে চাকুরী, উদার গণতন্ত্র ও সুশাসনের উপহার দেয়ায় ছিল এই সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। টানা ২ মেয়াদ শেষ করে তৃতীয় মেয়াদেরও প্রায় এক বছরের শেষ এলো কিন্তু কৃত অঙ্গীকারের তেমন বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা গেল না। কিছু ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া দেখা গেলেও দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। বিষয়টি রূপপুরের বালিশ, ফরিদপুরের পর্দা ও চট্টগ্রামের টিন কেলেঙ্কারীসহ বিভিন্ন সাগর চুরির ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এর আগে শেয়ারমার্কেট, হলমার্ক, ব্যাসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কেলেঙ্কারীর মাধ্যমে আমরা সারাবিশে^ই দুর্নীতিগ্রস্ত জাতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছি। সম্প্রতি ইসলামী ফাউন্ডেশনের ডিজির বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরতর অভিযোগ আমাদের দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের ভয়াবহতার দিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। আবার ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার কথা বলা হলেও বেকারত্ব আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে গণহারে চাকুরীচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে। সরকারের একদেশদর্শী পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই বৈদেশিক শ্রমবাজারও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি বরং ক্ষেত্র বিশেষে সঙ্কুচিতই হয়েছে।

ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে র‌্যামিটেন্স প্রবাহে ভাটির টান পড়েছে। সম্প্রতি সৌদী আরব সহ মধ্যপ্রচ্য থেকে শ্রমিক বিতাড়নের ফলে সার্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে সরকার ক্রমেই ঋণনির্ভর হতে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলোতেও দেখা দিয়েছে রীতিমত তারল্য সঙ্কট। এমনকি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চলছে মন্দাভাব। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর। ফলে দেশের গণতন্ত্র হয়ে উঠেছে নাম সর্বস্ব প্রতিকী অনুসঙ্গ। বিষয়টি মহাজোটের অন্যতম শরীক ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তিতে খুবই স্পষ্ট।

তিনি সম্প্রতি দাবি করেছেন, ’গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি’। সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা তো দিতে পারেই নি বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে খুনের মহোৎসবের অভিযোগ উপেক্ষা করার মত নয়। সাম্প্রতি বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড তার স্পষ্ট প্রমাণ। সম্প্রতি ভোলায় ধর্মপ্রাণ মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ গুলী চালিয়ে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা শান্তিপ্রিয় ও বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। ফলে সুশাসনের বিষয়টি প্রশ্নাতীত হয়নি বরং আগের তুলনায় অবনোমনই ঘটেছে। যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে। 

টানা ১১ বছরের শাসনে সরকারের কিছু অর্জন থাকলেও লাগামহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাষ্ট্রের সকল বিভাগ দলীয়করণ, বিরোধী দলের উপর দমন-পীড়ন, গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যা, কথিত এনকাউন্টারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ও প্রতিবেশীর সাথে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তির অভিযোগ রয়েছে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে। শাসন কাজের কোন ক্ষেত্রেই সরকার খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান জনমনে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টিকে সকল শ্রেণির মানুষ ইতিবাচক হিসাবেই নিয়েছিল। মনে করা হয়েছিল যে, সরকার বোধহয় চেতনা ইতিমধ্যেই ফিরে পেয়েছে।

রাজধানীর ক্লাবপাড়ায় অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য এবং টেন্ডারবাজিসহ নানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার জনমনে নতুন করে আশাবাদেরও সৃষ্টি হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অনমনীয় মনোভাব সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ থেকে আগাছা নির্মূলের এ অভিযানে ক্ষমতাসীন দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি করেছিল উৎসাহ-উদ্দীপনা। কিন্তু সেই আশাবাদে ইতোমধ্যেই ভাটির টান পড়েছে।

কারণ, শুরুটা দুর্নীতি বিরোধী অভিযান নামে হলেও এ অভিযানটি শেষ পর্যন্ত ক্লাবপাড়ায় অবৈধ ক্যাসিনো ও চুনোপুটি ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর ধীরে ধীরে তাও স্তিমিত হতে শুরু করেছে। এখন তা সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও কমিশনার রাজীবের গ্রেফতার এবং রিমান্ডের বৃত্তেই আটকা পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ফলে পর্বত যে মুশিকও প্রসব করতে পারেনি তা মোটামোটি স্পষ্ট। মূলত খাজনার চেয়ে বাজনাটা বেশি হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। তাই ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে জনমনে যে প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল, প্রাপ্তিটা কিন্তু তেমনটা হচ্ছে না বরং পুরো বিষয়টি দেশের আত্মসচেতন মানুষকে আশাহতই করেছে।

ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে চাঁদাবাজির অভিযোগে অব্যহতি দেয়ার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠতে থাকায় এর বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরা হয়। ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অপসারণের মধ্য দিয়ে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। সে ধারাবাহিকতায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী দুর্নীতি ও ক্যাসিনো-সংশ্নিষ্টতায় খালেদ, মিজান, শামীম, সম্রাট প্রমুখ গ্রেফতারও করেছে। সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে যুবলীগ নেতা ওয়ার্ড কাউন্সিলর রাজীবকে।

মূলত দুর্নীতিবিরোধী নাম দিয়েই ক্যাসিনো অভিযান শুরু হয়। অবৈধভাবে ক্যাসিনো বাণিজ্য পরিচালনা এবং টেন্ডারবাজির অভিযোগে যুবলীগ এবং কৃষক লীগের কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। কার্যত অভিযানটি পরে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে ক্লাবগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর এখন অভিযান আদৌ চলছে কিনা, সেই প্রশ্নই উঠতে শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী তাও স্পষ্ট নয়। ফলে রাজনৈতিকভাবে একটা সাময়িক কৌশল হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন তো এখন মানুষের মুখে মুখে। অবশ্য কেউ কেউ সরকারের ক্যাসিনো অভিযানকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানোর অনুসঙ্গ বলেও মনে করছেন।

সঙ্গত কারণেই সাম্প্রতিক অভিযানে সাধারণ মানুষ খুব একটা আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ, এই অভিযান সাময়িক চমক সৃষ্টি করতে পারলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থায়ী বা বড় ধরণের সংস্কারের পক্ষে অবস্থানের বিষয়টি মোটেই প্রশ্নাতীত নয়। সরকারের পদক্ষেপগুলো খুবই খন্ডিত ও ক্ষুদ্র পরিসরের বলেই মনে করছে অভিজ্ঞমহল। কারণ, ছাত্রলীগের দু’জন নেতাকে সড়িয়ে দেয়া বা যুবলীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাকে সরকারের স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নিজে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখা এবং সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি এমন মন্তব্যও করেছিলেন যে, ওয়ান-ইলেভেনের প্রয়োজন হবে না। কারণ তার সরকারই দুর্নীতি দমন করবে এবং এই অভিযানে কাউকে ছাড় দেবে না। কিন্তু বাস্তবতার সাথে তার খুব একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে না বরং দিন যতই যাচ্ছে সন্দেহ আরও ঘনিভূতই হচ্ছে। আর ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে দুর্নীতি রথী-মহারথীরা।

অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান মূলত চাপা পড়েছে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হতকান্ডের পর পর। বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের নেতারা আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর আলোচনার লাইম লাইটে ওঠে আসে আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড। বুয়েট শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনা এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এরপর ফেনীর চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলা এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞা আলোচনা এসেছে। নতুন করে তার সাথে যুক্ত হয়েছে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামে দন্ডাদেশ বহালের আলোচনা।

ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর আলোচনা থেকে হারিয়ে গেছে দুর্নীতিবিরোধী তথা ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের আলোচনা। ফলে কথিত অভিযানের কোন কিছু এখন দৃশ্যমানও হচ্ছে না। ক্যাসিনো ও দুর্নীতি বিরোধী অভিযান নিয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ এর কথা ঘোষণা করে হলেও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজির বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোন ব্যবস্থায় গ্রহণ করা হচ্ছে না। ইফাতে নাকি ৫শ’ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ডিজি মহোদয় নাকি ইতোমধ্যেই ৩১ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অনুকূলে ফেরৎও দিয়েছে। ক্যাসিনো নিয়ে অনেক লম্বা-চওড়া কথা বলা হলে বিসিবি সভাপতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেই। তার বিরুদ্ধেও ক্যাসিনো সম্পৃক্তর প্রামাণ্য দলিল পাওয়া গেছে। ফলে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও বিশ্লেষকদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

সরকারের দাবি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের কারণে এতে কিছুটা ধীর গতি আসলেও অভিযান থেমে যায়নি। এমনকি সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব নিয়েই এগুচ্ছে। ক্লাবগুলো ক্যাসিনো-বাণিজ্যের মতো অনৈতিক কাজ হতো, সেগুলো ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। এখন গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে পুলিশ এবং র‍্যাবের কর্মকর্তারাও একই ধরণের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েই পুলিশ এবং র‍্যাব অভিযানে নামে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ থেমে নেই, এ অভিযানের সমাপ্তিও টানা হয়নি।

কিন্তু বাস্তবতার সাথে এসব দাবির কোন সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না বরং সরকারি দলের কোন কোন নেতার কথা মালার ফুলঝুড়ির মধ্যেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে টিআইবি’র মূল্যায়ন হলো, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু নেতাকর্মীর অপরাধমূলক কর্মকান্ড এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলা হলেও তা পরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অন্যদিকে নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় টার্গেট নিয়ে অভিযান চালানোর কথা বলে তা ক্লাবগুলোর মধ্যে ছোট পরিসরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন তো তাও বন্ধ। এতে দুর্নীতি দমনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। ক্যাসিনো আর ম্যাসেজ পার্লার পর্যায়ে দুর্নীতি দমন অভিযান পরিচালিত হওয়ায় সমালোচকদের কেউ কেউ বিষয়টিকে এক ধরনের আইওয়াশ বলেও মনে করছে’।

মূলত দুর্নীতিটা আমাদের দেশে কাঠামোগত। বাংলাদেশে এই ধরনের অভিযান জনগণকে তুষ্ট করার জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয় কিন্তু এই সব অভিযানে মূলত চুনোপুঁটি ধরার বিষয়ে মনোযোগ দেয়া হয় বেশি। আর রাঘববোয়ালরা বরাবরই অধরায় থেকে যায়। ব্যাংক ঋণ আর নির্মাণের সাথে জড়িত বড় দুর্নীতিগুলোতে হাত দেয়া হয় না। দুর্নীতির বরপুত্র সরকারি দলের রাঘব-বোয়ালদের কেশাগ্রও স্পর্শ করা হয় না। আসলে সরকারের নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতার কারণেই তা এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য।

সাম্প্রতিক অভিযানে ক্যাসিনো নিয়ে অনেক অজানা তথ্যই বেড়িয়ে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে নানাবিধ প্রশ্নেরও অবতারণা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার ও প্রশাসনের নাকের ডগায় এতদিন ধরে অবৈধভাবে ক্যাসিনো বাণিজ্য চলেছে কিভাবে? অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ দুর্নীতি বিরোধী চলমান অভিযানে এখন র‍্যাবকে একক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ, অন্যদের ওপর নাকি এ বিষয়ে আস্থা রাখা হয়নি। কিন্তু মজার বিষয় হলো পুলিশ, র‍্যাব ও সরকারসহ সংশ্লিষ্টরা এর দায় নিতে রাজি নয়। কিন্তু সরকারের অর্থমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের নজরের বাইরে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য চলেছে কিভাবে ? সরকারি দলের হোমরা-চোমরাদের বিরুদ্ধে উঠেছে ক্যাসিনো সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। কিন্তু এসবের কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

মূলত ঢাকায় পুলিশ ষ্টেশন থেকে অল্প দূরত্বেই বিভিন্ন জায়গায় ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য ধরা পড়েছে। ফলে এসব চলার পেছনে পুলিশ প্রশাসনের দিকেই আঙুল তোলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। আর বিষয়টির যৌক্তিকতাও অস্বীকার করার মত নয়। অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে পুলিশ এতদিন কেন ব্যবস্থা নেয়নি, সে প্রশ্নও এখন সবার মুখে মুখে। মূলত দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাসিনো বাণিজ্য চলার দায় পুলিশ বা র‍্যাব কেউই এড়াতে পারে না। আর এক্ষেত্রে সরকারের দায়টা আরও বেশি। আর এই অপকর্মের সাথে সরকার সংশ্লিষ্টরা বেশি জড়িত। আসলে সীমিত পরিসরে বা কোন লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না বরং এজন্য আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত খুবই জরুরি।

আসলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে সবার আগে রাজনীতিকে অনিয়ম-অগণতান্ত্রিকতা-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করতে হবে। সবার আগে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আনতে হবে স্বচ্ছতা। সরকারেরই যদি বৈধতা না থাকে তাহলে সে সরকারের কোন উদ্যোগই সফল ও সার্থক হবে না। কারণ, নাপাকি দিয়ে কখনো নাপাকি দূর করা যায় না। একথা সংশ্লিষ্টরা যত তাড়াতাড়ি উপলদ্ধি করবেন ততই কল্যাণ। একথা সবাইকে মনে রাখতে হবে-রাজনীতি ঠিক না হলে সমাজ ঠিক হবে না, উন্নয়নের দুর্নীতি দুর হবে না। ছাত্রলীগ-যুবলীগ সহ ছাত্র রাজনীতিকেও ঠিক করা যাবে না। তাই সাম্প্রতিক অভিযান কোন সঙ্কীর্ণ বৃত্তে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং আরও বিস্তৃত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শুধু পুলিশি অভিযান নয় বরং রাজনীতিতেও চাই সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান। অন্যথায় কোন অর্জনই স্থায়িত্ব লাভ করবে না।

মূলত ক্যাসিনো অভিযান নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল তা কিন্তু ইতোমধ্যেই শুণ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। কারণ, দেশে ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহে ক্যাসিনো অভিযানের বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে আবরার হত্যাকান্ড। তার সাথে আবার নতুন করে যোগ হয়েছে ভোলা, নুসরাত হত্যা মামলা, ক্রিকেট ও জামায়াত নেতার দন্ডাদেশের ঘটনা। তাই দুর্নীতি বিরোধী অভিযান কিছুটা হলেও অতীত অনুসঙ্গ। মূলত জনগণের অসহায়তা, অসচেতনা ও রাজনীতি বিমুখতার কারণেই নানা উপসর্গ জাতির ঘারে চেপে বসেছে। ফলে অপশাসন-দুঃশাসন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। আর এটাকে আমাদের জন্য এক ধরনের শাস্তিই বলা যায়। তাই দার্শনিক প্লেটোর (Plato) ভাষায় বলতে হয়, ‘রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনীহার অন্যতম শাস্তি হচ্ছে নিজের তুলনায় নিকৃষ্টদের দ্বারা শাসিত হওয়া’। মূলত এটিই সত্য; এটিই বাস্তবতা! শুধু নেই আমাদের উপলব্ধি ! 

 

[email protected]

 

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই) 

 

এমবি