তাকে নিয়ে দলের ভেতরে এবং বাইরে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন তার মতো স্বচ্ছ, যোগ্যতমা ও সতী রাজনীতিবিদ আর নেই। তার মতো লোক দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে সব কিছু রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে যেত।

অন্য পক্ষ বলেন ভিন্ন কথা। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ না হলে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর কিছুই হতো না। তার চেয়ে অনেক বড় দাপুটে নেতা ইতিহাসের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছেন, কেবল দলচ্যুত হওয়ার কারণে। এসব কথা শুনতে শুনতে আমি এক দিন মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা, ভদ্রমহিলাকে খুব কাছ থেকে কখনো দেখিনি।

একজন মানুষকে অতি কাছ থেকে না দেখলে তার চলন-বলন কিংবা অভিব্যক্তি বোঝা একেবারেই অসম্ভব। ২০০৯ সালের প্রথম দিকে এক দিন আমি তাকে বহুৎ চুপিসারে দেখতে গেলাম। সংসদের চার নম্বর লবির পাশে মহিলা সদস্যদের লবিতে তিনি বসা ছিলেন। তিনি বসে আছেন আর সামনে আট-দশজন মহিলা সংসদ সদস্য কী যেন সব বলছেন।

তিনি নির্বিকারভাবে সব কিছু শুনছেন এবং একটু পরপর মাথার ঘোমটা টেনে সামনে আনার চেষ্টা করছেন। তার ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ভঙ্গি, শরীরিক গঠন ও আচরণ নিঃসন্দেহে অন্যদের থেকে আলাদা। আমি কোনো কথা না বলে কেবল তাকে দেখলাম এবং আবার সংসদের ভেতরে ঢুকে আমার জন্য নির্ধারিত আসনে বসলাম।

এ ঘটনার প্রায় এক বছর পর তার সাথে আমার প্রথম কথা হয় টেলিফোনে। বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎই তিনি এক দিন আমায় ফোন করে বসলেন। টেলিফোনের ওপর প্রান্ত থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বললেনরনি, আমি মতিয়া চৌধুরী।

তোমার এলাকায় বেশ কিছু কৃষি উপকরণ দেবো আইলাবিধ্বস্ত কৃষকদের জন্য। তুমি এখনই আমার অফিসে চলে এসো। একজন নবীন সংসদ সদস্য না হলে আপনি বুঝতেই পারবেন না, সেদিন আমি কতটা খুশি হয়েছিলাম। গর্বে আমার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছিল।

অগ্নিকন্যা আমাকে স্বয়ং টেলিফোন করে যেতে বলেছেন! ভাবতেই নিজেকে বেশ গর্বিত মনে হলো। আমি অতি দ্রুত বলতে গেলে ভৌঁ দৌড় মেরে মতিয়া চৌধুরীর দফতরে চলে গেলাম। আমার অফিসটি সচিবালয়ের ঠিক পেছন দিকে। হেঁটে গেলে বড়জোর ১০-১৫ মিনিট লাগে। আর দৌড়ে গেলে মাত্র পাঁচ মিনিট। গিয়ে দেখলাম তিনি সম্পূর্ণ একা বসে আছেন।

আমি ঢুকতেই তিনি বললেন, এসো রনি বসো। তোমার এলাকার তিন হাজার কৃষককে উন্নতমানের ধানের বীজ, সার, কীটনাশক ওষুধ দেয়া হবে বিনামূল্যে। তুমি সুন্দর করে তালিকা করবে এবং যোগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করবেএ কথা বলেই তিনি মাথা নিচু করে অন্য কাজে মনোযোগী হলেন।

আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার কী বলা উচিত কিংবা কী করা উচিত? আমি এ-ও বুঝতে পারছিলাম না যে, আমাদের মিটিং এই স্বল্প কথার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল কি না, অথবা আমার সালাম জানিয়ে চলে আসা উচিত কি না?

মন্ত্রী মহোদয় বোধ হয় বুঝলেন। তিনি আমার দিকে এবার সরাসরি তাকালেন এবং বললেন, আমি তোমাকে বেশ পছন্দ করি, তোমার বুদ্ধি ও কাজ করার পদ্ধতির জন্য। তুমি যাকে পরাজিত করে নমিনেশন পেয়েছ এবং যার কূটকৌশল মোকাবেলা করে জয়ী হয়েছ; তাতেই বোঝা যায় তুমি কেমন!

তারপর তিনি বললেন, তুমি নেত্রীর লোক! হয়তো আমার ওপর অভিমান করে আছো। আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জাহাঙ্গীরের নমিনেশনের জন্য তদবির করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম নেত্রী তোমার বিষয়ে অনড় এবং জাহাঙ্গীরের নামও শুনতে পারেন না। যা হোক, তুমি জয়ী হয়ে এসেছ, তাই স্বাগতম।

জাহাঙ্গীরের মাথার প্রতিটি চুলে চুলে বুদ্ধিআর তুমি তাকে অতিক্রম করে এসেছ, সে কারণে ধরে নিচ্ছি তুমি অধিকতর বুদ্ধিমান। এ কথা বলেই তিনি মুচকি হাসলেন। আমি পাত্তা পেয়ে বললাম, আপা তিন হাজার কৃষককে কৃষি উপকরণ দেয়া হবে আর সেই অনুষ্ঠানে হয়তো আরো তিন-চার হাজার লোক উপস্থিত হবে।

কাজেই বিরাট এক জনসভাআপনি চলেনআমি আয়োজন করি। তিনি উত্তর করলেন যে, জরুরি কাজ থাকায় তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। তারপর বললেন, দেখি, সচিব সাহেব যেতে পারেন কিনা। বলেই তিনি সচিব সি কিউ মোশতাক সাহেবকে ইন্টারকমে ডেকে আনলেন। সচিব সাহেব এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।

নির্ধারিত দিনে আমি ও সচিব সি কিউ মোশতাক সাহেব ঢাকা থেকে রওনা দিলাম। সময়টা ছিল প্রচণ্ড বর্ষণমুখর এবং একই সাথে দুর্যোগপূর্ণ। পুরো দক্ষিণাঞ্চলেই কেবল বৃষ্টি আর বন্যা। মন্ত্রণালয় থেকে যথানিয়মে এবং যথাসময়ে উপকরণগুলো চলে গিয়েছিল গলাচিপা কৃষি দফতরে এবং আমি সেমতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, ইউএনও এবং ওসিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলাম।

কাজেই সচিব সাহেব গলাচিপা উপস্থিত হয়ে হাজার হাজার মানুষের ঢল, বৃষ্টিবন্যা উপেক্ষা করে হাজারো মানুষের শুভেচ্ছা স্বাগতম ধ্বনি তুলে মিছিল ইত্যাদি দেখে যারপরনাই খুশি হলেন। তিনি হয়তো ঢাকা ফিরে মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমার অনেক প্রশংসা করেছিলেন। ফলে কয়েক দিন পর মতিয়া চৌধুরী আবার আমাকে ফোন করলেন এবং তার অফিসে যেতে বললেন।

এবার আমি গেলাম আগের তুলনায় অধিকতর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে। ইচ্ছা ছিল কৃষি বিষয়ে আমার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতার কথা মন্ত্রী মহোদয়কে খুলে বলা। রুমে ঢুকতেই তিনি বললেন, আমাদের একটি জাতীয় আলু কমিটি আছে। সচিবের নেতৃত্বে অত্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি এটি। তুমি একজন অভিজ্ঞ কৃষকের নাম দাও, যাকে আমরা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেব।

গলাচিপা অঞ্চলে ইতোপূর্বে আলুর চাষ হতোই না বলতে গেলে। জনৈক কৃষক এলাকায় আলু উৎপন্ন করে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। আমি সাথে সাথে তাকে কৃষক ভদ্রলোকের নাম প্রস্তাব করলাম। মন্ত্রী কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি হয়তো ভাবছিলেন, আমি কৃষকের নাম জানব না এবং পরে জেনেশুনে হয়তো কারো নাম প্রস্তাব করব।

আমি মন্ত্রী মহোদয়কে বললাম, দেশে কৃষিবীজের অবস্থা কী? তিনি বললেন, ভয়াবহ। বিগত সরকার বিএডিসিকে কার্যত অচল করে দেয়ায় আর এ দেশে বীজ উৎপাদনই হচ্ছিল না। পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। মন্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশ।

এ দেশের মানুষ যে পরিমাণ ভাত ও রুটি খায়, তা পরিমাণের দিক থেকে সর্বোচ্চ  অথচ এই খাদ্যের মূল উপকরণ অর্থাৎ বীজটি আমাদের হাতে নেই। কোনো কারণে একবার যদি আমদানিকৃত বীজ নষ্ট প্রমাণিত হয় বাংলাদেশের খাদ্যের হাহাকার পৃথিবীর কোনো দেশই মেটাতে পারবে না।

মন্ত্রী আরো বললেন,  আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে একাধিকবার বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ  যে কোনো মূল্যে বিএডিসিকে সচল করতে হবে এবং ধানে ধানে দেশের প্রয়োজনীয় সব শস্যবীজ এ দেশেই উৎপন্ন করতে হবে। সেভাবে সব কিছু এগিয়ে যাচ্ছে।

বিএডিসি বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ বীজ সরবরাহ করতে পারছে। আগামী পাঁচ বছরে এটি ৬০ শতাংশে উন্নীত করার কাজ পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে। এরপর তিনি বিএডিসি, মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা বললেন।

তিনি কিছু সৎ কর্মকর্তার নাম উচ্চারণ করলেন এবং একই সাথে কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার নামও বললেন। আমি একজন অতি উত্তম শ্রোতা হিসেবে কেবলই শুনছিলাম এবং অবাক হয়ে ভাবছিলাম অগ্নিকন্যা সাধারণত এত কথা কারো সাথে বলেন না কিংবা কাউকে সে ধরনের সুযোগও দেন না।

তবে কি আমার কপাল খুলতে যাচ্ছে! আমি তার মন্ত্রণালয়ের জুনিয়ার মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছি? কারণ বাজারে জোর গুজব  মতিয়া চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে যার নাম বলেন তাকেই নাকি মন্ত্রী করা হয়। আমি মনে মনে চিন্তা করতে থাকলাম  মন্ত্রী হলে কোন রুমে বসব। আবার ভাবলামনা, আমি মন্ত্রণালয়ে বসব নাসারা বছর মাঠেঘাটে থাকব-কৃষকদের বাড়ি বাড়ি যাব, কিষানির উঠোনে ঘুমাব আর ঘুমানোর আগে নয়া ফসলের ঘ্রাণ শুঁকব।

আমি কল্পনার জগতে দোল খাচ্ছিলাম এবং মন্ত্রী মহোদয়ের কথা শুনছিলাম। হঠাৎ করেই আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা এলো। আমি তাকে বললাম, আপা, আমাদের খাদ্যশস্যের এক বিরাট অংশ উৎপাদিত হয় উত্তরবঙ্গে। ক্রমাগত একই ফসল উৎপাদন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির দ্বারা সেচকাজ করায় আগামী ২০-২৫ বছর পর পুরো উত্তরবঙ্গের জমির উর্বরতা মারাত্মক হ্রাস পাবে।

ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবে এবং পুরো এলাকা আর্সেনিক আক্রান্ত হবে। ফলে খাদ্য উৎপাদন কম করে হলেও ৪০-৪৫ শতাংশ হ্রাস পাবে এবং অন্য দিকে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে ১৫-২০ শতাংশ। এই বিপুল ঘাটতি মোকাবেলা করতে হবে কেবল আমদানির মাধ্যমে।

তিনি আমার কথা শুনলেন এবং কৃতজ্ঞ দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। আমার মনে হচ্ছিল, আমি সেই কথাগুলোই তাকে বললাম যেগুলো তিনি এতকাল একাকী ভেবে আসছিলেন। হয়তো অবাক হয়েছিলেন আমার উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে। কারণ, সচরাচর মন্ত্রী-এমপিদের উৎসাহ থাকে অন্য দিকে।

মন্ত্রী এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সেলফ থেকে কী যেন একটা বুকলেট বের করলেন। নিজে মনোযোগসহকারে পড়ার পর আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। এটি ছিল তথ্যপূর্ণ একটি পুস্তিকা। এতে বলা হয়েছে, আগামী দিনের শস্যবীজের উৎপাদন, বর্ধন ও বিতরণ সম্পর্কে মূল্যবান কিছু কথা। বিদেশী একটি জার্নাল।

দেখেই মনে হলো, দুষ্প্রাপ্য এবং তা সংগ্রহ করা হয়েছে কষ্ট করে, সংরক্ষণ করা হচ্ছে সযতনে। সেখানে বলা হয়েছে, কিভাবে বিশ্বায়নের কারণে ভূমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভূমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের নিম্নাঞ্চলগুলো আগামীতে কী কী সম্ভাব্য বিপদে পড়বে, বিশেষত কৃষিক্ষেত্রে, তার কিছু চমকপদ বর্ণনা রয়েছে সেখানে।

আমি এগুলো জানার পর মন্ত্রীকে বললাম, সরকারের উচিত অতি দ্রুত লবণাক্ততা সহনশীল বীজ খামার গড়ে তোলা। তা না হলে বাংলাদেশ আগামী দিনে মারাত্মক খাদ্য সমস্যায় পড়বে। মন্ত্রী মুখে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যত টাকা লাগে তত টাকাই তিনি বরাদ্দ দেবেন। কিন্তু কৃষিবীজের জন্য খামার করতে তো ৩০০০-৪০০০ একর জমি দরকার।

দেশের মানুষের যে মনমানসিকতা তাতে দু-চার একর জমি একোয়ার করতে গেলেই লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দেয় এই দেখো না আড়িয়াল বিলে কী হয়ে গেল। অনেকটা না বুঝেই বললামজমির সমস্যা হবে না। আমি ৫০০০ একরের ব্যবস্থা করব। তিনি সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমার জিদ বেড়ে গেল।

আমি পুনরায় বললাম, আপা, আপনি সিদ্ধান্ত নিন যে, বাংলাদেশে একটি বৃহৎ বীজবর্ধন খামার প্রতিষ্ঠিত হবে, যা কিনা আগামীতে দেশের খাদ্যশস্যের উৎপাদন দ্বিগুণ বানিয়ে ফেলবে। সেই খামারের জন্য আমার নির্বাচনী এলাকায় পাঁচ হাজার একর জমি একোয়ার করে দেয়া হবে। সব দায়িত্ব আমার। মন্ত্রী এবার হেসে দিলেন এবং বললেন, আচ্ছা! সময়মতো দেখা যাবে।

সে দিনের মতো আমি সচিবালয় থেকে আমার অফিসে ফিরে এলাম এবং বিকেলেই টের পেলাম অগ্নিকন্যা আসলে কী জিনিস! তিনি বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় সাত-আটবার টেলিফোন করলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এত জমি কিভাবে দেবে। ওই সব এলাকায় তো হাজার হাজার বাসিন্দা রয়েছে।

তারা তো আন্দোলনে নামবে। আচ্ছা, জমিগুলো কেমন! নদীগুলোই বা কেমন। বন্যা হয় কি না! জোয়ারের পানি কত দূর পর্যন্ত প্লাবিত করে। কত ফুট গভীরে গেলে নলকূপে পানি ওঠে। মাটি ও পানিতে খনিজের পরিমাণ কী। বৃষ্টিপাত হয় কেমন। কত মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। মাটির গঠন কীরূপ। মাটিতে বালুর পরিমাণ। কী কী ফসল হচ্ছে।

একরপ্রতি বর্তমান উৎপাদন কতএমনই হাজারো প্রশ্ন। আমার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। আমি বুঝলাম মন্ত্রী খুব সিরিয়াস প্রকৃতির মানুষ। আমি যা বলেছি তা করে দেখাতে হবে। না হলে রক্ষে নেই। আর তিনি যা জিজ্ঞাসা করছেন সেগুলোর উত্তরও দিতে হবে নির্ভুলভাবে। সারা রাত আমার ঘুম হলো না টেনশনে।

নিজেকে ধিক্কার জানালাম নির্বুদ্ধিতার জন্য। আফসোস হতে থাকল  কেন আমি আগ বাড়িয়ে বাহাদুরি দেখাতে গেলাম। নতুন এমপি হয়েছি সবে। এখনো জানি না জমির দলিল কিভাবে হয়, কিংবা জমি কিভাবে একোয়ার হয়। এক একর জমি এক সাথে জীবনে মেপে দেখেনি  সেই মানুষ হুট করে বলে ফেললাম পাঁচ হাজার একর জমির কথা। মন্ত্রীর এত সিরিয়াসনেস দেখে আমার মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ মিটে গেল। ভাবলাম এই ভদ্রমহিলার অধীন যদি আমি দারিত্বপ্রাপ্ত হই, তবে আমাকে খাটিয়ে খাটিয়ে একদম মেরেই ফেলবে।

পরের দিন বিএডিসির চেয়ারম্যান ড: নাজমুল ও সচিব মোশতাক সাহেব ফোন করলেন। ড: নাজমুলের নেতৃত্বে বিএডিসির একটি বিশেষজ্ঞ টিম আমার এলাকায় যাবেন জমি দেখার জন্য। মন্ত্রীর সিরিয়াসনেস দেখে আমি এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম। যা হোক, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ড: নাজমুল ও তার সহকর্মীদের দশমিনা উপজেলার চরগুলোতে নিয়ে গেলাম।

তারা এলাকাটিকে পছন্দ করলেন, অতি দ্রুততার সাথে এবং জমির পরিমাণ, গুণগত মান ইত্যাদি দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। ড: নাজমুল অগ্নিকন্যার অতীব প্রিয় এবং আস্থাভাজন কর্মকর্তা। তার কাছে শুনলাম, মন্ত্রীবৃত্তান্ত। সারা দিন শয়নে স্বপনে শুধু কৃষি আর কৃষি। তিনি বললেন, কিভাবে পাটের জিনোমে আবিষ্কারের পেছনে মন্ত্রী দিনরাত পরিশ্রম করেছেন।

কিভাবে তিনি নিষ্ঠার সাথে নামাজ, রোজা ও তজবি তাহলিল করেন ইত্যাদিও বললেন। আমি বেশ অবাক হলাম মতিয়া চৌধুরীর নামাজ পড়ার কথা শুনে। কারণ এ দেশে যারা বাম ঘরানার রাজনীতি করেন, তারা সাধারণত নামাজ কালাম পড়েন না- এমনকি আল্লা-খোদাও বিশ্বাস করেন না। আমি বললাম, বলেন কী।

ড: নাজমুল তার অভিজ্ঞতা থেকে বেগম মতিয়া চৌধুরীর কিছু গুণাবলির কথা বললেন, বিশেষত ফরজ ও নফল ইবাদত-বন্দেগি সম্পর্কে। তিনি যখন গাড়িতে চলাফেরা করেন তখন নাকি এসি চালান না। নিজ হাতে এখনো হাটবাজার করেন ইত্যাদি নানা কীর্তিকাহিনী।

ঢাকা ফেরার পর মন্ত্রী আবার আমাকে ডাকলেন। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ডমন্ত্রণালয়ের সব গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিকে জড়ো করেছেন। এখন আমাকে বক্তব্য রাখতে হবে প্রকল্প এলাকার ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া, বাসিন্দাদের পুনর্বাসন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে। আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে সব কিছু বর্ণনা করলাম। মন্ত্রী প্রীত হলেন এবং সাথে সাথে ডিপিপি, অর্থাৎ প্রকল্প প্রণয়ন এবং তা অনুমোদনের জন্য অতি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠাতে বললেন।

কথাবার্তা শুনে যা মনে হলো তাতে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে হয়তো পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। আমি ধারণা করলামএত টাকা খরচ করে বাংলাদেশে কৃষি প্রকল্প, তাও আবার অবহেলিত দক্ষিণবঙ্গের দশমিনায়  অসম্ভব! হবে না কিছুই হবে না  আর আমাকে ঝামেলা পোহাতে হবে না। ওমা, একি! সাত দিন যেতে না যেতেই ড: নাজমুল ফোন করে জানালেন, প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন।

আমার ওপর শুরু হলো নতুন উপদ্রবমন্ত্রী সকাল-বিকেল ফোনের মাত্রা, পরিমাণ ও সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেন। সংসদে গেলে কাছে ডেকে নেন, অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেন হররোজ। আমার সহকর্মীরা তো অবাকতারা জিজ্ঞাসা করেন মতিয়া আপার সাথে তোমার এত কিসের খাতির।

আমি বলি তেমন কিছু না। তারা আবার বলেন, কী কথা কও? আমি জবাব দেই না। কারণ আমরা যা নিয়ে আলাপ করি সে কথা কিভাবে বলি। মন্ত্রী রাতদিন চিন্তা করেন প্রকল্প এলাকার কোন জায়গায় বাঁধ দিতে হবে। পুল হবে কোথায়। কালভার্ট লাগবে কয়টি। লোকজনকে কি উচ্ছেদ করবেন, নাকি প্রকল্প এলাকায় বসতি বানিয়ে কাজ করাবেন বেতনভুক্ত কৃষক হিসেবে।

প্রকল্পের ভেতর হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বৃষ্টি থেকে পানি ধরে তা সংরক্ষণ করা, পুকুর ও খাল কাটা, গোডাউন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করতে করতে যদি তার কোনো প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দেয়অমনি তিনি আমায় ফোন করেন। ফোনে যদি আমি বুঝাতে না পারি তবে পরের দিন তিনি ডেকে নেন তার কাছে।

সম্মানিত পাঠকগণ! শুনে অবাক হবেনএশিয়ার বৃহত্তম বীজবর্ধন খামার কিন্তু এখন বাংলাদেশে। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী নিজে গিয়ে সেটি উদ্বোধন করে এসেছেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলোসাধারণ উদ্বোধন করার পর কাজ শুরু হয়। কিন্তু ওখানে হয়েছে উল্টোটা। প্রকল্পের আংশিক কাজ শুরু হয়ে গেছে সেই ২০১১ সালে।

ঠিক এক বছর পর প্রধানমন্ত্রী যখন সেটি উদ্বোধন করলেন তখন প্রকল্প এলাকায় হরদমে কাজ চলছে বীজ উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ হাজারো কর্মসব একসাথে এবং যুগপৎভাবে। পুরো প্রকল্পটি চালু হয়ে গেলে দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদন যেমন দ্বিগুণ হবে তেমনি প্রাণ ফিরে আসবে দক্ষিণ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। আগামী ২০-২৫ বছর পর উত্তরবঙ্গের ভূমি যখন খাদ্যশস্য উৎপাদনের উর্বরতা হারাবে, তার ঠিক ১০ বছর আগেই পুরো দক্ষিণ বাংলা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যশস্য সরবরাহ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকবে।

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, তুমি মিয়া আর কাজ পাইলা না, যে সরকার তোমারে চোর গুণ্ডা, টাউট-বাটপারের মতো গ্রেফতার করল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লুটেরাকে খুশি করার জন্য আর তুমি কিনা তাদের সফলতা বর্ণনা করছ! এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য, আমি যা করছি তা কেবল আল্লাহকে খুশি করার জন্য।

আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার প্রতি যে নেয়ামত দান করা হয়েছে তার শুকরিয়া আদায় করো (ওয়া আম্মা বি নিয়ামতে রাব্বিকা ফাহাদ্দিস)। সরকারের মন্দ কাজের যেমন অকৃপণ সমালোচনা করছি, তেমনি তাদের ভালো কাজের প্রশংসা করাও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। প্রত্যেক দলেই ভালো লোক রয়েছেন, আমরা যদি তাদের প্রশংসা না করি তবে তাদের অস্তিত্ব যেমন বিলীন হয়ে যাবে তেমনি ভালো কাজ করতে কেউ উদ্যোগী হয়ে উঠবেন না। সমাজে ভালো নেতা কিংবা রাষ্ট্রীয় কাজে ভালো কর্তা পাওয়া মানুষের জন্য অতি সৌভাগ্যের বিষয় এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক অতি উত্তম নেয়ামত। আমাদের উচিত সেই নেয়ামতের প্রশংসা করা।উৎসঃ নয়াদিগন্ত

ঢাকা, ৮ জুলাই (টা্ইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ