‘গো-মাতা’র প্রতি অহিংসা প্রকাশ করতে ভারতে ‘গো-রক্ষা’ জনতা ভয়ানক সহিংসতা শুরু করেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলিম গরু-খামারি, কসাই এবং গোশত বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি প্রকাশ্য রাজপথে পেহলু খানকে যেভাবে আঘাতে আঘাতে জর্জড়িত করে মারা হলো, সে দৃশ্য প্রত্যক্ষদর্শী জনতার হাতে ডজন ডজন স্মার্টফোনে ধারণ হয়ে সোস্যাল মিডিয়া এবং টিভির মাধ্যমে প্রায় গোটা ভারতের জনগণ দেখেছে।
ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যে এখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির শাসন চলছে। ‘গো-মাতা’র সুরক্ষা করার নামে বিজেপির অনুপ্রেরণা ও আস্কারায় তথাকথিত গো-রক্ষাকারী জনতা যেভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি হিংস্রতার ঘটনা ঘটাচ্ছে, তার লোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর আন্তর্জাতিক সংস্করণের (৬ মে, ২০১৭ সংখ্যা) উপসম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় ‘ইন্টেলিজেন্স’ (তদন্ত) সেকশনে। দিল্লি থেকে খ্যাতনামা লেখিকা আতিশ আসির এই তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বর্ণিত হয়েছে সম্প্রতি রাজস্থান রাজ্যে সম্প্রতি কি মর্মান্তিকভাবে পেহলু খান নামের ৫৫ বয়স্ক এক গরু-খামারিকে রাস্তায় ঘিরে ধরে পিটিয়ে এবং খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হলো! খানকে যখন মারা হচ্ছে, তখন চারদিকে ঘিরে দাঁড়ানো দর্শকদের হাতে হাতে স্মার্টফোনে সে হত্যাদৃশ্য ভিডিও রেকর্ড হয়ে সোস্যাল মিডিয়া এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে সারা ভারতে জনগণ দেখল! ভারতের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের অনেকেই এ দৃশ্য দেখে অবশ্য উল্লসিত হয়েছে!
আতিশ আসির লিখেছেন, ‘গরু রক্ষার জন্য জনগণের মধ্যে এই হিংস্র উন্মাদনা পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে তার নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার গো-হত্যাকে উৎসাহিত করে ভারত থেকে গরুর গোশত রফতানি করার ষড়যন্ত্র করছে বলে জোর গলায় অভিযোগ তুলে জনগণকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংস্রতার উন্মাদনায় উত্তেজিত করতে থাকেন।
মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রথম বছরই ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তথাকথিত ‘গো-মাতা রক্ষাকারীদের’ হামলায় প্রথম মুসলিম গরু-খামারি নিহত হন। মোদি সে সময় এ ঘটনার নিন্দা করেননি, দুঃখও প্রকাশ করেননি। ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করলে প্রধানমন্ত্রী মোদি কট্টর হিন্দু (যিনি সব সময় গেরুয়া পরিধান করেন) যোগি আদিত্যনাথকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করেন।
তার নির্বাচনী প্রচারণায় যোগি আদিত্যনাথ গো-রক্ষাকারীদের হাতে নিহত হওয়া মুসলিম গরু-খামারির পরিবারকে ‘বেআইনিভাবে গরুর গোশত মওজুদ করে রাখার অপরাধে’ বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন ‘একজন হিন্দুকে হত্যা করা হলে তার প্রতিশোধে ১০ জন মুসলমানকে হত্যা করো।’
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম পদক্ষেপেই তিনি লাইসেন্সবিহীন কসাইখানা এবং গোশতের দোকানগুলো বন্ধ করে দেয়ার অভিযানে নামলেন। উত্তর প্রদেশে যদিও অগণিত লাইসেন্সবিহীন কারখানা, রন্ধনশালা, দোকানপাট ইত্যাদি রয়েছে। তিনি অভিযান শুরু করলেন শুধু কসাইখানা এবং গোশতের দোকানগুলোর বিরুদ্ধে, যেগুলো একচেটিয়াভাবে মুসলিমরাই চালায়।
ভারতের রাজ্যগুলোর বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীরা এখন প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কত বেশি ‘গো-প্রেম’ দেখাতে পারে। তারা তথাকথিত ‘গো-রক্ষাকারী’ জনতাকে উসকিয়ে দিচ্ছে গরুখেকো মুসলিমদের ওপর প্রতিশোধ নিতে। তার ফলেই রাজস্থানে রাস্তায় পেহলু খানকে হত্যা করা হলো। হত্যাকারী ‘গো-রক্ষাকারী’রা বয়সে নবীন, গায়ে দেয় স্ট্রাইপ দেয়া টি-শার্ট এবং পরণে তাদের ব্লুু জিন্স্! প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এদের পাকড়াও করে না, করে এক-আধজন নিরপরাধ প্রত্যক্ষদর্শীকে!
২০১৫ সাল থেকে মুসলিম হত্যাগুলোর মধ্যে পেহলু খানের হত্যা হচ্ছে ছয় নম্বর হত্যা। এরপর, অতি সম্প্রতি যোগ হয়েছে দুই কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। পেহলু খানের হত্যাকাণ্ডের পর রাজস্থানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিভিশনের সামনে ঘটনাটিকে হাল্কা করার চেষ্টা করলেন এই বলে ‘এটা একটা ঝগড়ার পরিণতি।’ এরপর বললেন ‘যারা তাকে মারধর করেছে, তাদের চিন্তাভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।’
ভারতের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ বাস করে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিশাসিত রাজ্যগুলোতে। মার্চে মোদির জন্মভূমি গুজরাট রাজ্যে কেউ গরু জবাই করলে, তাকে আজীবন কারাবাসে দেয়ার আইন করা হয়েছে। বিজেপিশাসিত ছত্তিশগড় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ‘ যে গরু হত্যা করবে তাকে আমরা ফাঁসিতে ঝুলাব।’ ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলিমদের সংখ্যা ১৭ কোটির চেয়েও বেশি। তাদের এক-চতুর্থাংশ বাস করে উত্তর প্রদেশে!
ভারতের অনেক অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো; বিশেষ করে হাইটেক, শিল্প ও বাণিজ্যক্ষেত্রে। কিন্তু গরু রক্ষার নামে মুসলমানদের প্রতি সহিংসতা যেভাবে বাড়ছে এবং তীব্র হয়েছে, তা অহিংস নীতির প্রবর্তক মহাত্মা গান্ধীর ভারতকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে, তা ভাবার বিষয় হয়ে উঠেছে। নয়াদিগন্ত
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবাসী





