৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-–সমালোচনার অন্ত নেই। বিরোধীরা এ নির্বাচনকে তামাশা ও ভাঁওতাবাজীর নির্বাচন বলতেই পুলকবোধ করেন। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থানটা বিরোধী দলের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা এ নির্বাচনকে গণতন্ত্র সুরক্ষার নির্বাচন বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এ নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের অবস্থান পরষ্পর বিরোধী হলেও বহুল আলোচিত-সমালোচিত এ নির্বাচন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

এমনকি এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে বিনা ভোটেই জাতীয় সংসদ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। যা বিশ্ব ইতিহাসের এক অভিনব ও নজীরবিহীন ঘটনা। অবশিষ্ট যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই নগন্য। অভিজ্ঞমহল এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫% এর মধ্যেই সামীবদ্ধ মনে করেন। কিন্তু এ নির্বাচনকে ভিত্তি ধরেই বর্তমান সরকার প্রায় তিন বছর ক্ষমতায়। আর বতর্মান সংসদ যদি মেয়াদও পূর্ণ করে তাহলে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। পরিণতিটা সে দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। যদিও শুরু থেকেই সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ ছিল শুরু থেকেই।

সরকার প্রথম দিকে এ নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলেই উল্লেখ করেছিল। সে কথার ভিত্তি ধরেই বোধহয় বিরোধী পক্ষ তাদের অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার নিজেদের কথার উপর স্থির থাকতে পারেনি বরং এ নির্বাচনকে ভিত্তি ধরেই তারা সংসদের মেয়াদপূর্ণ, ১৯ সাল এমনকি ৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী। এর একটা সঙ্গত কারণও আছে।

কারণ,কোন ভাবে যদি ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় তাহলে এ সুযোগ তো সকলেই কাজ লাগাবে; অন্তত তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। কারণ, আমরা মুখে গণতান্ত্রিক হলেও মেধা, মনন ও মানসে পুরোপুরিই আত্মকেন্দ্রীক। আর এ আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থ চর্চার রাজনীতি আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বনাশের মূল কারণ। আমরা কোন ভাবেই এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছি না। আর সহসাই এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি ঘটবে বলে আপাত মনে করার কোন কারণও দেখা যাচ্ছে না।

যাহোক ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও এ নির্বাচনের ভিত্তিতেই সরকার প্রায় তিন বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে। আর বাকি দু’বছর পূর্ণ করতে খুব সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলোও বোধহয় বিষয়টা অনেকটাই মেনে নিয়েছেন। আর এটাই বাস্তবতা। তাই সাম্প্রতিক এ বিষয়ে তাদেরকে খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে শোনা যায় না। এমনই প্রেক্ষাপটে হঠাৎই দেশে নির্বাচনী আবেশ তৈরি হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে একটা অঘোষিত রণ প্রস্তুতি বেশ লক্ষণীয়। যদিও বিষয়টি খুব স্পষ্ট নয়। বর্তমান সংসদের মেয়াদই রয়েছে পুরোপুরি দু’বছর। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে যেন আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি শো-ডাউনই হয়ে গেছে। যা নির্বাচনী রিহার্সেল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধামহল।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সদ্য সমাপ্ত কাউন্সিল বেশ আলোচিত। দফায় দফায় তৃণমূল নেতাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সদ্য সমাপ্ত এ বর্ণাঢ্য কাউন্সিলে। বিষয় ছিল একটাই আর তা হলো নির্বাচন। কারণ যেকোন মূল্যে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতার মসনদটা পাকাপোক্ত রাখার সরকারের ইপ্সিত লক্ষ্য। কাউন্সিলে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। পরে গণভবনে আলাদা সভায়ও নেতাদের একই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি করে ভোটারদের কাছে যেতে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম জনগণের সামনে তুলে ধরতে নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মূলত নির্বাচন প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই ওবায়দুল কাদেরকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। আর দলীয় সভানেত্রী তার উপরই অধিক আস্থা রেখেছেন বলেই মনে হচ্ছে।

সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ভাবমূর্তি কোনো সংকট না থাকলেও তার কোন ভাল অর্জন আছে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বোদ্ধামহল। দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তিনি দলকে যথেষ্ট সময় দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু অভিযোগ নয় বরং বাস্তবতার বিষয়টিও অস্বীকার করার মত নয়। তৃণমূলের সঙ্গে তার তেমন কোনো সংযোগ গড়ে ওঠেনি। সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তার সক্রিয়তা নিয়ে বেশ প্রশ্ন রয়েছে। তিনি প্রায়ই দেশের বাইরে থাকেন বলেও দলীয় ফোরামে অভিযোগ আছে।

অন্যদিকে, মাঠের রাজনীতিবিদ ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সাংগঠনিক দক্ষতার জন্যও খ্যাতি রয়েছে তার। সেই সাংগঠনিক ক্যারিশমা তিনি নির্বাচনের মাঠে দেখাতে পারবেন বলেই মনে করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাই সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ধুমকেতুর মতই আবির্ভাব ঘটেছে ওবায়দুল কাদেরের। মূলত আওয়ামী লীগের এখন সবকিছুই আবর্তিত হচ্ছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। যা জাতীয় জীবনে ঘোর অন্ধকারের মধ্যে আলোর ঝলকানি। কারণ, দেশে অন্তত একটা নতুন নির্বাচনের পূর্বভাস পাওয়া যাচ্ছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের মতো প্রকাশ্য না হলেও আড়ালে-আবডালে বিএনপিতেও এক ধরনের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দলনেত্রীও দলকে নির্বাচন মুখী করে তুলছেন বলেই মনে হচ্ছে সর্বসাম্প্রতিক তৎপরতায়। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা নিয়ে দলটির ভেতরে কাজ চলছে এমন খবর নির্ভরযোগ্য সূত্রেই পাওয়া যাচ্ছে। মামলাজনিত কারণে প্রার্থী সংকট তৈরি হলে বিকল্প প্রার্থীর তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদেরও নির্বাচনী মাঠে নামানোর একটা প্রয়াসও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের বেশ কয়েক জনের সঙ্গেই বিএনপির হাইকমান্ড যোগাযোগ করেছে।

তবে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি তার দুর্বলতা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মনে করেন বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক। দলটির তৃণমূল পর্যায়ে পুনর্গঠন নিয়ে বছরের পর বছর কাজ চললেও সে কাজ এখনো শেষ হয়নি। অনেক কেন্দ্রীয় নেতা অকার্যকর হয়ে পড়েছেন। কেউ ইচ্ছায়, কেউ অনিচ্ছায়। যা বিএনপির জন্য নেতিবাচকই বলতে হবে। আর বিরোধী দলে থাকলে এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই সামনের দিকে এগুতে হয়।

সদ্য সমাপ্ত কাউন্সিলে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রথম পর্ব সেরে ফেলেছে আওয়ামী লীগ। পুরো সম্মেলনই আবর্তিত হয়েছে নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে। অন্যান্য প্রসঙ্গও এসেছে। তবে প্রাধান্য পেয়েছে নির্বাচনের কৌশলের বিষয়টিই। নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের টপ এজেন্ডাতেও রয়েছে নির্বাচন। বেশি ইস্যু নিয়ে কাজ করবেন না তিনি। নিজেই বলেছেন, এক ঝুড়িতে বেশি ডিম রাখলে তা ভেঙে যেতে পারে। এ কারণে হাতে এজেন্ডা রেখেছেন কম। তার প্রধান এজেন্ডা নির্বাচনের প্রস্তুতি। এ কারণেই তাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনৈতিক বোদ্ধামহলের পক্ষে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দলে প্রধান ব্যক্তির পরিবর্তন হবে এমনটা কেউ আশা করেন না। সাধারণত সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন হয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে এবার সেটাই হয়েছে। স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে একটানা দুই মেয়াদের বেশি কেউ থাকেননি। তাই সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জায়গায় এবার ওবায়দুল কাদের এসেছেন। তার মতে, বর্তমান কমিটি আগামী নির্বাচন পরিচালনা করবে। সে ক্ষেত্রে দল এমন একজনকে বেছে নিয়েছে, যার সাংগঠনিক দক্ষতা আছে। কর্মীদের পাশে থাকার মানসিকতা আছে। সেটা আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে খুবই জরুরি।

কাউন্সিলে দলের নেতাদের নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা দেয়ার পর গণভবনে আলোচনায়ও নেতাদের একই নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলা নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, সামনে ইলেকশন, মনে রাখতে হবে। ইলেকশনের প্রস্তুতি নিতে হবে। জনগণের জন্য কী কী কাজ করলাম, জনগণকে তা জানাতে হবে। আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে আরো উন্নয়ন হবে। অর্থনীতিকে সুসংহত করার জন্য যে কাজগুলো আমরা করে যাচ্ছি এই কথাগুলো না বললে মানুষজন জানবে কিভাবে? এখন থেকেই কাজ শুরু করার তাগিদ দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচকই বলতে হবে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগকে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি। কোনো প্রতিদ্ব›িদ্বতার মুখোমুখি হতে হয়নি প্রার্থীদের। চ্যালেঞ্জ ছিল প্রশাসনিক। বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন মোকাবিলা করা হয়েছে প্রশাসনিকভাবেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক্ষেত্রে সফলতার পরিচয়ও দিয়েছে। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে এক পর্যায়ে আন্দোলন থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিরোধী শিবির বলেই মনে করা হয়। কিন্তু আগামী নির্বাচনে সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলোর অংশ নেয়ার সম্ভবনার প্রেক্ষপটে সরকারকে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে। আর সর্বসাম্প্রতিক সরকারি দলের তৎপরতা যে সরকারের সে হিসাব-নিকাশেরই অংশ তা মোটামোটি নিশ্চিত করে বলা যায়।

মূলত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও ছিল সরকারের ওপর। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার বেশ মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছে। ইস্যুর পর ইস্যু তৈরি করে অত্যন্ত কৌশলে সে চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। এখন সরকারকে মোটামোটি নির্ভারই মনে হচ্ছে। কারণ, প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্র বর্তমান সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। সরকারও মনে করছে এই পরিক্ষিত প্রতিবেশী যতদিন তাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে ততদিন অন্তত ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিটা থাকবে না। সরকারও সে প্রতিবেশীকে খুশী রাখার জন্য সকল কিছুই করছে বলে মনে হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যে কোনো পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারে বিএনপি। কারণ, বিএনপি দীর্ঘ পরিসরে ক্ষমতার বাইরে থাকার স্বাদ গ্রহন করেছে এই প্রথমই। তাই তাদেরকে এখন বেশ নির্বাচন মুখীই মনে হচ্ছে। আর বিএনপি সহ সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন সরকার দলীয় প্রার্থীরা। অবাধ ও সুষ্টু নির্বাচন হলেও প্রার্থীদের ভরাডুরি আশঙ্কা করছেন সরকার দলের নীতিনির্ধারকরা। এ কারণেই এখন থেকে ভোটের প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে। যাতে যেকোন ভাবেই আবারও নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় আসা যায়। যদিও বিএনপি’র পক্ষে সম্প্রতি বলা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না।

পরিস্থিতি যাই হোক, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কথা বার্তায়ও সে ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। এর বাইরে দলটির সামনে তেমন কোনো বিকল্পও নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে কী পরিস্থিতিতে বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে হয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন দলটির নীতিনির্ধারকরা। নাটকীয় কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে দলটিতে। একটি মামলায় উচ্চ আদালতে এরইমধ্যে সাজার রায় হয়েছে বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমানের। আপিল না করলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাটিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলাতেও তারেক রহমান আসামি। অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অন্তত দুটি মামলা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর কোনো মামলাতে সাজা হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি-না সে প্রশ্নও রয়েছে।

বিএনপির আরো অন্তত একশ’র বেশি নেতা এ ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব বিষয় মাথায় রেখেই বিএনপিতে এক ধরনের নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করতে না পারলে ডা. জোবায়দা রহমান রাজনীতিতে আসতে পারেন- এ ধরনের একটি আলোচনাও দলের ভেতরে রয়েছে। তার উচ্চ শিক্ষা এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি দলের জন্য সহায়ক হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। যদিও বিএনপি চেয়ারপারসন এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। তবে প্রতিটি আসনেই দলে বিকল্প প্রার্থী ঠিক করার কাজ চলছে। নেতাকর্মীরা যেন নতুন করে মামলায় না জড়ান সে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে হাইকমান্ড। কর্মীদের যথাসম্ভব আইনি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। নীরবে বিএনপির ভেতরে এক ধরনের প্রস্তুতি শুরু হলেও সাংগঠনিক দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে দলটি।

উভয় পক্ষের সাজসাজ রব দেখে মনে হচ্ছে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অবশ্যই অত্যাসন্ন। কিন্তু এ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে সে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। কারণ, দেশে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে তা নির্বাচন কেন্দ্রীক নয় বরং নির্বাচন পদ্ধতি কেন্দ্রিক। কিন্তু বিষয়টির একটি রাজনৈতিক সমাধান হওয়ার আগেই দেশে নতুন করে নির্বাচনী ঢামাঢোল শুরু হয়েছে। কিন্তু কিভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে তা নিয়ে কারো মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হয় না।

মূলত সবার আগে আসন্ন নির্বাচনকে কীভাবে সকল দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করা যায় সে বিষয়টিই সক্রিয়ভাবে ভাবা দরকার। কারণ, দেশের মানুষ আর কোন জবরদখল বা চরদখলের নির্বাচন দেখতে চায় না। কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে রণপ্রস্তুতি শুরু হয়ে তাতে মনে হয় সরকার বোধহয় জনগণের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। আর বিরোধী দলগুলোও আস্থা রাখতে পারছে না সরকারের উপর। তাই আসন্ন নির্বাচন সমরে কে কতখানি পেশীশক্তি প্রদর্শন করতে পারে সেদিকেই মনোযোগটা বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনটা বোধহয় জনমতের প্রতিফলন নয় বরং কুরুক্ষেত্র মহাসমর। ভাবসাব দেখে মুর্শিদা গানের জঙ্গনামার কথায় বারবার স্মরণ হচ্ছে-
.......................
আরেক সাজিল মর্দ
নামে মদন ঢুলি
আশি মন তামা তার
ঢোলের চারটা খুলী।
.........................
তুগুলী-মুগুলী সাজে
তারা দুই ভাই
ঐরাবতে সাইজা আইল
আজদাহা সিপাই।।

মূলত কোন নির্বাচনে যদি জনমতের প্রতিফলন না ঘটে তাহলে সে নির্বাচনকে নির্বাচন না বলে প্রহসন বলায় অধিক যুক্তিযুক্ত। জনমতের তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র নিয়মরক্ষার নির্বাচনের মাধ্যমে কখনোই জনগণের স্বার্থ ও অধিকারের নিশ্চিত হতে পারে না। কারণ, জনগণের স্বার্থ রক্ষায় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অন্যতম মূলমন্ত্র। লর্ড ব্রাইসের মতে, ‘The aggregate of the views men hold regarding matters that affect the interest of the community..’
অর্থাৎ জনমত সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনগণের অভিমতের সমষ্ঠি।

তাই আসন্ন নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটুক এটাই দেশের মানুষ আশা করে। তাই নির্বাচনকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগেই গ্রহণযোগ্য করার ব্যবস্থা গ্রহণই প্রাক নির্বাচনী প্রস্তুতি হওয়া উচিত। সবার আগে নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ। এমন নির্বাচন কমিশন জনগণ প্রত্যাশা করে যে কমিশন যেমন প্রার্থীতা ও প্রার্থীদের সুরক্ষা দেবে, ঠিক তেমনিভাবে প্রার্থীদের প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সুযোগও নিশ্চিত হওয়া দরকার। কারণ, অতীত সংস্কৃতিটা মোটেই সুখকর নয়। জনগণ দেশে আর ‘মদন ঢুলি’ মার্কা নির্বাচন আর দেখতে চায় না।

 

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)