প্রশ্নটা উঠে এল অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি কর্তৃপক্ষের মুদ্রিত সংস্করণ বন্ধ করে শুধু ই-ভার্সন প্রকাশের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে।
কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল কয়েক দিন ধরেই৷ তা থেকে ফুলে ফেঁপে উঠছিল এক আশঙ্কা৷ প্রত্যেক আশঙ্কার কালো মেঘের পেছনে যেমন চিলতে আশার আলো লুকিয়ে থাকে, এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি কোনও৷ তবে তাতে লাভ হল না কিছু৷
বাস্তবায়িত হতে চলেছে এক অমোঘ এবং প্রবল অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন৷ সত্যি হয়ে গেল সেই প্রবল জেনুইন আশঙ্কাই৷ এই ব্রহ্মাণ্ডের সব থেকে বেশি প্রচারিত এবং জনপ্রিয় অভিধান- অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি'র পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণের মুদ্রিত সংস্করণটা আর হাতে পাবে না মানুষ৷ যা পাওয়া যাবে তা হল, ই-ভার্সন, অর্থাৎ আন্তর্জালের (ইন্টারনেট) সংস্করণ৷ কিন্ত্ত কেন এই সিদ্ধান্ত? ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা যাক৷
১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি-২ প্রকাশিত হওয়ার পর এই তৃতীয় সংস্করণটির জন্য কাজ শুরু হয় ১৯৯৪-তে৷ তারপর টেমস দিয়ে কুলুকুলু শব্দে জল বয়ে গিয়েছে গ্যালন গ্যালন৷ জীবনও পেরিয়ে গিয়েছে কুড়ি কুড়ি বছরের বর্ডার লাইন৷ কাজ শেষ হয়নি এখনও৷ গত কুড়ি বছর ধরে সত্তর জনের যে দলটি কাজ করে চলেছে অক্লান্ত ভাবে, সেই দলের প্রধান তথা ওইডি (অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি) মুখ্য সম্পাদক মাইকেল প্রফিট-এর দাবি অনুযায়ী, চল্লিশ খণ্ডের কাজটা শেষ করতে কমপক্ষে সময় লাগবে আরও কুড়ি বছর৷ অর্থাৎ, গোটা কাজ শেষ হয়ে ডিকশনারি প্রকাশিত হতে হতে লেগে যাবে ২০৩৪ সাল৷
সে না হয় লাগুক, যে কোনও মহৎ এবং সৃষ্টিশীল কাজের পেছনেই অনেকটা করে সময় দেওয়া জরুরি, এমন কথা তো পণ্ডিতরা হামেশাই বলে থাকেন৷ তার ওপর এই প্রবল ঐতিহ্যশালী ডিকশনারির পাতায় পাতায় বিদ্যমান ব্রিটিশ সংস্কৃতির গঠনমূলক সহাবস্থান৷ কিন্ত্ত এ ক্ষেত্রে দুটো সমস্যা গুরুতর হয়ে উঠেছে৷ প্রথমত, সেকেন্ডের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে লাস ভেগাসে যোগাযোগ করতে পারার এই যুগে একটা ডিকশনারির পরিমার্জন এবং পরিবর্ধনের জন্য চল্লিশটা বছর সময় নেওয়া খুব কিছু কাজের কথা নয়৷ ঐতিহ্যের পতাকা উড়িয়েও নয়৷ তার ওপর প্রফিট বলছেন, একেবারে ২০৩৪-এ যে হবে তা-ও এখন থেকে হলফ করে বলা যাচ্ছে না৷ আরও বাড়তি কয়েক বছর সময় লেগেই যেতে পারে৷ যদিও এই প্রেক্ষিতে অক্সফোর্ড ডিকশনারির ইতিহাস ঘাঁটলে উঠে আসবে একটা গুরত্বপূর্ণ তথ্য৷ সংস্করণের পরিমার্জনের ক্ষেত্রে বরাবরই প্রবল বিলম্বের সাক্ষী এই ডিকশনারি৷
প্রসঙ্গত, ১৮৫৮ সালে এই ডিকশনারির তৈরির সময় ধরা হয়েছিল দশ বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ হবে গোটা কাজ৷ যা আদতে সম্পূর্ণ হতে সময় লেগেছিল সত্তর বছর৷ দ্বিতীয়ত, গোটা বিশ্ব জুড়েই ভাষার বিরাট হাঁড়িতে নিরন্তর তৈরি হয়ে চলেছে গরম খিচুড়ি৷ সেই ভাষার খিচুড়ি কতটা উন্নত, তা বলার সময় আসেনি যদিও এখনও৷
কিন্ত্ত ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসাবে একটি ডিকশনারি যে সেই খিচুড়ির সুবাস এবং মশলার হাত থেকে নিজের মোটা মলাটটিকে বাঁচিয়ে চলতে পারে না, তা লেখাই সঙ্গত৷ '৮৯ থেকে ২০১৪, এই পঁচিশ বছরে এসএমএস কিংবা সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে স্টোটাস কমেন্ট লাইকে চরম ঘ্যাঁটঘোঁট একজোট করলে খিচুড়ি ভাষার সংখ্যাই গিয়ে পৌঁছবে কয়েক লাখে৷ ঘটনা হলো, এই সমস্ত নতুন এন্ট্রি করানোর পর এমনিতেই প্রায় দৈত্যাকার ডিকশনারিটির কুড়ি বছর পর গিয়ে যে বিশালাকায় ও অকল্পনীয় সাইজ হবে তা সে যুগের সমস্ত রকম পাঠ্যবস্ত্তর সঙ্গেই বেমানান৷
এত কিছু ভেবেই এই সিদ্ধান্ত৷ বিশুদ্ধতাবাদীরা সব কিছুতেই রে রে করে৷ এখানেও তারা একই ভূমিকায় অবতীর্ণ৷ এই চূড়ান্ত ই-নির্ভরতার যুগে 'বই' বা ওই ধরনের জিনিসপত্র যে দিন দিন বেমানান হয়ে পড়ছে, তা আমরা জানি৷ এবং, নিমরাজি হয়েও অনেকাংশে মানিও৷ তবে, তা সেখানে দাঁড়িয়ে অত বড়ো একটা ডিকশনারির আদৌ কোনও দরকার আছে কি না সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ৷ যেখানে উইকিপিডিয়াতে কোনও একটা শব্দ লিখে ক্লিক করলেই অনেক সহজেই মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে পড়ে তার সমস্ত ঠিকুজি কুলজি, সেখানে ডিকশনারি জিনিসটার এই যুগে পেপার ওয়েট এবং বুকশেল্ফ ভরানো ছাড়া আর কোনও প্রয়োজন আছে কি না সেটাও একটা বড়ো প্রশ্ন৷ বাপ-ঠাকুর্দাদের আমলের অনেক কিছুই আমরা ভুলে মেরে দিয়েছি৷ এ বার বোধ হয় সময় এল ওই গাবদা কাল্টটিকে ভোলার৷ তাতে অবশ্য একটা জরুরি সুবিধাও আছে৷ অন্তত ইশকুল বাচ্চাগুলোর পলকা কাঁধ ভারের চোটে বেঁকে যাবে না। সূত্র: ওয়েবসাইট
[b]ঢাকা, ২৬ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি) //এমএ
[/b]