সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় দক্ষতা বিকাশ প্রতিমন্ত্রী অনন্ত কুমার মহীশূরের নবাব টিপু সুলতানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, প্রতি বছরের মতো এবারও ধুমধাম করে ১০ নভেম্বর টিপু সুলতানের জন্মদিন পালন করছে কর্নাটকের কংগ্রেস সরকার। ওই প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী টুইট করেছেন, ‘আমি কর্নাটক সরকারকে বলে দিয়েছি, একজন বর্বর, হত্যাকারী, উন্মাদ এবং ধর্ষকের মহিমা প্রচারের লজ্জাজনক অনুষ্ঠানে তারা যেন আমাকে আমন্ত্রণ না করে।’ যা আত্মসচেতন ভারতীয়দের বেশ স্তম্ভিত করেছে।
আসলে ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের কারণেই এমন অপরাজনীতি শুরু হয়েছে। ফলে ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে ভারতের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। আর এই নেতিবাচক রাজনীতির বলি হয়েছে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ। তাজমহলকে নিয়েও ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সে ধরাবাহিকতায় ভারতের পাঠ্যসূচী থেকে মোঘল শাসনের অধ্যায়ও বাদ দেয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। যেখানেই মুসলিমদের নাম আছে সেখানেই একটা মওকা খোঁজার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মহল বিশেষ। অথচ ভারত গড়েছিল হিন্দু-মুসলিম যুগপৎভাবেই। কিন্তু সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক দৃর্ষ্টিভঙ্গীর কারণেই তা তো স্বীকার করা হচ্ছেই না বরং ভিন্নমতের লোকদের চরিত্র হননের আয়োজন শুরু হচ্ছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, টিপু সুলতান শুধু একজন স¤্রাজবাদবিরোধী বীর যোদ্ধায় ছিলেন না বরং তিনি একজন সুশাসকও ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলেও আপাদমস্তক ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তার শাসনামলে ধর্মীয় কারণে কেউ নিগ্রহের শিকার হয়েছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী শাসক ছিলেন। একজন দক্ষ কুটনীতিক ও ছিলেন মহীশূরের টিপু সুলতান। তিনি উপমহাদেশ থেকে ইংরেজদের চিরতরে বিদায় করার জন্য ফরাসী স¤্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের সাথে সখ্যতা গড়েছিলেন। ইস্তাম্বুল সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে দূত পাঠিয়েছিলেন তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য। তিনি মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবক্তা ছিলেন। বিদেশীদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিও দিয়েছিলেন তিনি। প্রায় গোটা ভারতই যখন ইংরেজদের করতলগত হয়েছিল। তখন একমাত্র ব্যক্তিক্রম ছিলেন মহীশূরের টিপু সুলতান। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইংরেজদের অধীনতা মেনে নেন নি। জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন পরাধীনতার চেয়ে শাহাদাতই শ্রেয়।
তদানীন্তন বৃটিশ সাম্রাজ্যের পরিচালক রিচার্ড ওয়েলেসলি যখন টিপু সুলতানের মৃত্যু সংবাদ শুনে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন। ভগবান এস গিদোয়ানী ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’ গ্রন্থে এমনটাই উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, টিপুর মৃত্যুর পর ‘গোটা ভারতবর্ষই এখন আমাদের’ এমন একটি মন্তব্যও ওয়েলেসলি করেন বলে জানা যায়। টিপুর মৃত্যুসংবাদে ওয়েলেসলির এমন প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্য নিষ্কন্টক ও একছত্র করতে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন টিপু সুলতান। আর সে লক্ষ্যেই তারা পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন ১৭৯৯ সালে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে টিপুর নাম ছিলো এক বিভীষিকা। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ভয় ছিলো যে, টিপু সুলতান নেপোলিয়নের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করতে পারেন। এটি একেবারে অমূলকও ছিল না। এজন্য অটোমান এবং ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেনও টিপু সুলতান। তাই ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমে টিপুর মৃত্যু ছিলো তাদের বহুল প্রত্যাশিত সংবাদ। মূলত টিপু সুলতানের শাহাদাতের পর তাঁর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে লুটতরাজের এক মহোৎসব শুরু হয়। উইলিয়াম উইল্কি কলিন্সের লেখা বিখ্যাত ‘দ্য মুনস্টোন’ উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটি শুরু হয় এই লুটতরাজের বর্ণনা দিয়ে।
উপমহাদেশীয় ইতিহাসে টিপু সুলতানকে বরাবরই জাতীয় বীরের মর্যাদাই দেয়া হয়েছে। কারণ, প্রায় গোটা ভারত বর্ষই যখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর করতলগত হয়েছিল; তখন টিপু সুলতানই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সম্রাজ্যবাদের ও বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন। তাই বর্ণ, বর্ণ ও গোস্ত্র নির্বিশেষে তিনি ‘মহীশূরের বাঘ’ হিসেবেই স্বীকৃত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মাথা চাড়া দেয়ায় বীর টিপু সুলতানকে নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশটির কর্ণাটক রাজ্য একটি প্যারেড বের করা হয়েছিল। যাতে একদম সম্মুখভাগে ছিলো তরবারি হাতে টিপুর একটি চলমান ভাষ্কর্য। প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতীয় জাতীয়তার প্রতীক হিসাবে টিপুকে গ্রহণ করা যেতে পারে কিনা, তাই নিয়েই উত্তপ্ত আলোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে। প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে মারা যাওয়া এই ব্যক্তিকে নিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার টুইট হয়েছে।
টুইটগুলোর বেশিরভাগেই টিপুকে ‘বীর’, ‘সুশাসক’ এবং ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দেয়া হলেও এমন টুইটও কম নয় যেখানে তাকে স্রেফ ‘বর্বর’ এবং ‘খুনী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘টিপু সুলতানঃ দ্য টায়রান্ট অব মহীশুর’ নামের ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা সন্দীপ বালাকৃষ্ণা টিপুভক্তিকে ‘ইতিহাসের একটি খোলাখুলি বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সন্দীপ এবং অন্যান্য টিপু-সমালোচকদের দাবি, টিপু গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছেন, হিন্দুদের মন্দির, খ্রিস্টানদের চার্চ ধ্বংস করেছেন, অন্তত দশ হাজার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছেন। বলা হয়ে থাকে, কর্ণাটকের কোদাভা স¤প্রদায়ের হিন্দুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে টিপু বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দীকে চাপের মুখে ইসলামে দীক্ষিত করেন। এছাড়া মালাবার ও কালিকূট আক্রমণেও এমন ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটে বলে টিপু-বিরোধীরা দাবি করে থাকে।
টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ইতিহাস সমর্থিত নয়। বরং ইতিহাস তাকে প্রজাহিতৈষী, সুশাসক ও বীর যোদ্ধা হিসেবেই উল্লেখ করেছে। অপপ্রচারকারীরা মহান এই বীরের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার অবিযোগ আনয়ন করলেও নিরপেক্ষ সূত্র থেকে সেসবের সমর্থন পাওয়া যায়নি বরং ইতিহাস তাকে বিপরীতভাবেই চিত্রিত করেছে। মূলত টিপুকে ভারতের স্বাধীনতার রক্ষাকারী বীর হিসেবে যেসব ইতিহাসবিদেরা দাবি করেন, তারা এই সমালোচনাগুলোকে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণা হিসেবেই আখ্যা দিয়ে থাকেন। ভারতের অনলাইন জার্নাল ‘কাউন্টার কারেন্টস’-এর লেখক সুভাষ গাতাদি টিপুর বিরুদ্ধে আনা ধর্মান্তরের অভিযোগকে ইতিহাসের বিকৃতি উল্লেখ করে জানান, ১৯২৮ সালে ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক বি এন পান্ডের কাছে তার ছাত্ররা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর একটি লেখা নিয়ে আসেন।
যেখানে বলা ছিলো টিপুর ধর্মান্তরণের চাপের মুখে ৩ হাজার ব্রাহ্মণ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। ছাত্রদের আগ্রহের কারণে তথ্যের সূত্র চেয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে চিঠি পাঠান বি এন পান্ডে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উত্তরে জানান, তিনি মহীশুর গ্যাজেটিয়ার পত্রিকাতে এই তথ্য পেয়েছেন। পরবর্তীতে মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক শ্রীকান্তিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্যগুলোকে মিথ্যা বলে বি এন পান্ডেকে জানান। আর পুরো ঘটনাটা ‘সাম্রাজ্যবাদের সেবায় ইতিহাস’ নামে ১৯৭৭ সালে রাজ্যসভায় দেয়া একটি ভাষণে উল্লেখ করেন বি এন পান্ডে।
হায়দারী আলী খান মহীশূরের নবাব থাকাবস্থায় ১৭৫০ সালের ১০ নভেম্বর বাঙ্গালোরের বিশ মাইল দূরবর্তী দেওয়ান আলী নামক স্থানে টিপু সুলতানের জন্ম হয়। জন্মের চার বছর চার মাস চারদিন বয়সে ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁর পড়ালেখার যাত্রা শুরু হয়। নামজাদা উস্তাদগণকে বাড়ীতে রেখে রাজকীয় কায়দায় তাঁর পড়ালেখার আয়োজন হয়। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী টিপু তাঁর মাতৃভাষা কানাড়ী ছাড়াও আরবী, ফার্সী, উর্দু ও ইংরেজী ভাষায় শিখেছিলের। বাল্যকাল থেকেই সামরিক উস্তাদ গাজী খানের তত্তাবধানে তারবারী, তীর, বর্শা, মুগুরভাজা, কুস্তিবিদ্যা, অশ্বারোহণ, সাঁতার ইত্যাদি ছাড়াও আধুনিক সমরাস্ত্র বন্দুক, পিস্তল চালানো থেকে তোপ দাগানো পর্যন্ত সকল বিষয়ে তিনি বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। গাজী খান ছিলেন হায়দারী আলীর বাল্য ও দুঃসময়ের বন্ধু।
১৭৮২ সালে পিতার মৃত্যুর পর টিপু সুলতান সিংহাসনে আরোহন করেন। পরে তিনি লুৎফে আলী নামক সেনা প্রধানকে বিজনৌরে পাঠান এবং নিজে ১৭৮৩ সালে মালাবার যান। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ সময় ফরাসীগণ টিপুকে ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় তাঁর বাহিনীতে সাময়িক দুর্বলতা দেখা দেয়। তিনি ১৭৮৪ সালের ১১ মার্চ ইংরেজদের সাথে সন্ধি করেন। এ সময় ইংরেজ, মারাঠা ও নিজাম অক্ষজোট গঠন করে টিপুর রাজ্য মহীশূর আক্রমণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৭৮৬-১৯৮৭ তে এদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং ১৭৮৭ তে এক সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সন্ধিতে টিপুকে বাদশাহ এবং নওয়াব টিপু সুলতান ফতেহ আলী খান বাহাদুর উপাধিতে ডাকা স্থির হয়। ১৭৮৪ সালে টিপু উসমান খানকে ইস্তাম্বুল রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেন। এ সময় তিনি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে দূত পাঠান।
টিপু সুলতান ১৭৮৪ সাল থেকেই শ্রীরঙ্গপট্টমে মসজিদ ইআলা নামে একট মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ১৭৯০ সালে এ মসজিদেরই ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন। তিনি খলিফায় সনদ পাওয়ার পর নিজ নামে ইমামী নামক মুদ্রা জারি করেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নবুওয়াত লাভের বছর থেকে মুহাম্মদী সন নামে একটি নতুন সাল চালু করেন। তিনি শ্রীরঙ্গপট্টম, বাঙ্গালোর, চীতল, দারাক ও নাগর নামক স্থানে ‘তারামন্ডল’ নামে সমরাস্ত্র কারখানা স্থাপন করেন। এসব কারখানায় তোপ, বন্দুক, চাকু ইত্যাদি তৈরী হত। ইরান, আফগানিস্তান এবং ফরাসী সম্রাটের কাছে তিনি দূত প্রেরণ করেন। তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ কলেজ স্থাপন করেছিলেন।
তাঁর এ সুশৃংখল প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থাপনায় ভীত ইংরেজ, মারাঠা ও নিজাম সরকার যৌথভাবে টিপুকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৭৯১ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস নিজেই সেনাপতি হিসেবে বাঙ্গালোর দখল করেন। এরপর নিজামের সাথে মে মাসে টিপুর রাজধানী শ্রীরঙ্গপট্টম অবরোধ করেন। টিপুর কৌশলের কাছে তাদের এ অবরোধ পর্যুদস্ত হয়। ফলে তারা অবরোধ ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়। ১৭৯২ সালে মারাঠাসহ অক্ষশক্তি পুনরায় শ্রীরঙ্গপট্টম অবরোধ করে। ফলে টিপু তাঁর রাজ্যের অর্ধেকাংশ অক্ষশক্তির হাতে সমর্পণসহ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণস্বরূপ তিন কোটি ত্রিশ লাখ টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারে ও তার দুই পুত্রকে ইংরেজদের হাতে জিম্মি রাখার শর্তে এক সন্ধি করতে বাধ্য হন।
১৭৯৯ সালের জানুয়ারী মাসে নেপোলিয়ান চিঠি দিয়ে টিপুকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। টিপু মারাটা ও নিজামকে দেশরক্ষায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানালেও তারা অদূরদর্শিতার জন্য এ আহবানে সাড়া না দিয়ে ইংরেজদের দালালীতে ব্যস্ত থাকে। ১৭৯৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ওয়েলেসলী টিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বোম্বাই থেকে প্রেরিত একদল ইংরেজ সৈন্য ৬ মার্চ কুর্গ সীমান্তে টিপুর সেনাদলকে পরাজিত করে। ইংরেজ সেনাপতি জর্জ হেরিস মালভেলী নামক স্থানে ২৭ মার্চ টিপুর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে। ২২ এপ্রিল টিপুর চার পুত্র ও চার সেনাপতিকে জিম্মি রাখা রাজ্যের অর্ধেক অক্ষশক্তিকে দান, আরও দুই কোটি টাকা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চেয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে উত্তরদানে সেনাপতি হেরিসের মাধ্যমে ইংরেজরা প্রস্তাব পাঠায়।
টিপু এ প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় ইংরেজরা পুনরায় অবরোধ সৃষ্টি করে এবং গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শ্রীরঙ্গপট্টমের টিপুর দুর্গে ছিদ্র সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এদিকে মীর সাদিক নামক টিপুর সেনাদলের এক বিশ্বাসঘাতক বেতন দেয়ার নাম করে ছিদ্রপথের পাহাড়ারত সৈন্যদের সরিয়ে এদিক দিয়ে ইংরেজদের দূর্গে প্রবেশের পথ করে দেয়। মীর সাদিক ছিলেন টিপু সুলতানের চাচা শশুড়। ফলে সৈন্যদের মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক অংশ যুদ্ধ থাকলেও অন্য অংশ তখন চক্রান্তের শিকার। এমতাবস্থায় ৪ মে যুদ্ধরত অবস্থায় টিপু সুলতান বন্ধুকের গুলীতে আহত হয়ে শহীদ হন। আহত অবস্থায়ও তিনি বেশ কজন শত্রু সৈন্যকে হত্যা করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
দেশের মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুল-মাদ্রাসা স্থাপনের পাশাপাশি টিপু সুলতান চেষ্টা করেন কতিপয় মারাত্মক সামাজিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার করার জন্য। তিনি ধর্মবিশ^াসে মুসলমান এবং শাসনকাজে পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। টিপুর মৃত্যুর পর তার বংশধরদের মাদ্রাজ প্রদেশের ভেলর দুর্গে স্থানান্তর করা হয়। চৌদ্দ শতকের দিকে ইউরোপীয় নকশায় তৈরি করা ভেলর দুর্গটি ১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে আসে। এখানে ভারতীয় সিপাহীর সংখ্যা ছিল ১৫০০ ও ব্রিটিশ সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৩৭০। টিপুর অনুসারী কয়েকশ’ পরিষদবর্গ এ দুর্গে নজরবন্দি ছিল।
উপমহাদেশের সাবেক মহীশূর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হায়দার আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং ইতিহাস খ্যাত অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ও বীর যোদ্ধা টিপু সুলতানের ১৭৯৯ সালে কাবেরী নদীতীরে ঔপনিবেশিক ইংরেজ বাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ করেন। তিনি ছিলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ও স্বাধীনচেতা অসাধারণ একজন সুলতান। জনহিতকর কার্যাবলির জন্যও ইতিহাসে তিনি চির অম্লান হয়ে আছেন। টিপু সুলতান অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম ধর্ম, আরবি-ফারসি, বিজ্ঞান এবং শিল্প-সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিরল পান্ডিত্য অর্জন করেন।
যুদ্ধ ও আত্মরক্ষাসংক্রান্ত সামরিক কলাকৌশল ও আইনকানুন শিখেছিলেন। ১৭৮২ সালে হায়দার আলী মারা গেলে তিনি সিংহাসনে বসেন। তিনি যে সাম্রাজ্যের অধিপতি হন, সেটা উত্তরে কৃষ্ণা নদী থেকে দক্ষিণে ত্রিবাংকুর রাজ্য এবং পূর্ব দিকে তা পূর্ব উপকূল ও পশ্চিম দিকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, নিঃসন্দেহে এটি সমৃদ্ধ ও সুশাসিত সাম্রাজ্য ছিল। সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের দিক দিয়ে তার মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে ছিল।
সম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে দেশটির গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের বৈশিষ্টগুলো বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। মহল বিশেষ মুসলিম মনন-মনিষাকে বিশেষভাবে টার্গেট করে তাদের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্খিতভাবে বিষোদগার ও চরিত্র হনন করা হচ্ছে। আর সে ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী অনন্তকুমার মহীশূরের নবাব টিপু সুলতানকে একজন বর্বর, হত্যাকারী, উন্মাদ এবং ধর্ষক হিসেবে উল্লেখ করে নিজেদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে টিপু সুলতানের বংশধররা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু ইতিহাসের চুলচেরা পর্যালোচনায় এসব অভিযোগের কোন সতত্যা পাওয়া যায় না বরং ইতিহাস ভারতের জাতীয় বীর, প্রজাবৎসল, দৃঢ়চেতা, উন্নত নৈতিক চারিত্রের অধিকারী, সুশাসক ও অসাম্প্রদায়িক হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতির কারণেই ইতিহাসের এই বীরকে নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যা মহল বিশেষের হীনমন্যতারই পরিচয় বহন করে।
সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





