চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২২ ঘণ্টার এক ঐতিহাসিক সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন গত শুক্রবার দুপুরে। বাংলাদেশের সাথে তিনি ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন। গত ৩০ বছরের মধ্যে কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের এটিই বাংলাদেশ সফর।
জনাব শি চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। বর্তমানে শি জিনপিং একাধারে চীনের প্রেসিডেন্ট, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল। ফলে চীনে তিনি এখন প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী।
চীনে অর্থনৈতিক আকার ও প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে বেড়েছে। ফলে চীনে দুর্নীতিও পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছিল। জনাব শি এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর তার ফলে চীনে দুর্নীতি এখন বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।
চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একসময় বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় ব্যবসায়িক পার্টনার ছিল ভারত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সে চিত্র বদলে গেছে। এখন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। বাংলাদেশ চীন থেকে প্রতি বছর ১০০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে।
বিপরীতে বাংলাদেশ চীনে রফতানি করে ৮০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। আরো পণ্য রফতানির যে সুযোগ চীন দিয়ে রেখেছে, আমরা তার সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে চীনের বাণিজ্য নীতিতে ভারতের মতো কোনো ফেরেববাজি নেই। অশুল্ক বাধা নেই। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য কেবল বেড়েই চলেছে। উপরন্তু বাংলাদেশের অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও চীন রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
কেবল বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে চীন করে দিয়েছে বুড়িগঙ্গা সেতু, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রসহ আরো অনেক কিছু। অথচ ভারত সিডর-দুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশকে কদলি প্রদর্শন করেছে। আবার বাংলাদেশের খাদ্য সঙ্কটের সময় চালের মূল্য টনপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেছে। এখনো প্রতিনিয়ত ফেলছে। সীমান্তে পাখি হত্যার মতো প্রতিদিন বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করছে। সরকারও ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ভারতের এসব বর্বরতা নীরবে মেনে নিচ্ছে।
সরকারের ভারত তোষণ নীতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, বাংলাদেশকে এখন অনেকেই আর সার্বভৌম দেশ মনে করছেন না। বরং তারা বাংলাদেশকে ভুটানের মতো ভারতের একটি ‘প্রজারাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করছেন। খোঁড়া যুক্তিতে বাংলাদেশের সার্ক সম্মেলনে যোগদান না করার সিদ্ধান্তও তার প্রমাণ।
পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে ভারত পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানে অস্বীকৃতি জানায়। তাকে অনুসরণ করে ভুটান ও বাংলাদেশ। সার্কের বিধান অনুযায়ী কোনো সদস্যরাষ্ট্র শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দিলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না।
সেভাবে ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১, ২০০৩, ২০০৯, ২০১৫ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। এ সময়েই হয়েছিল ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কারগিল যুদ্ধ। তার পরও সার্ক সম্মেলনে সব দেশ যোগ দিয়েছিল। সার্কের বর্তমান চেয়ারম্যান নেপাল।
ভারত চেয়েছিল, নেপাল যেন সার্ক সম্মেলন বাতিল করে দেয়। কিন্তু নেপাল এই সম্মেলন বাতিল না করে স্থগিত করে দিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার গলা ফুলিয়ে বলেছে যে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। অতএব তারা বাংলাদেশের শত্রু। কিন্তু চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ১৯৭১ সালে সমর্থন করেনি। অতএব চীনকে চাই না, এমন কথা বলার মুরোদ সরকারের নেই।
শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের আমলে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। কারণ চীন বাংলাদেশকে মনে করেছে ভারতের একটি স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে চীনের স্বীকৃতি আদায় করেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বীকৃতিও পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের পতনের পর।
ফলে যত দূর বোঝা যায়, জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে চীনের প্রেসিডেন্টের কাছে কুৎসিত কোনো অভিযোগ করেনি শেখ হাসিনার সরকার। তবে শি জিনপিংয়ের এই সফরকালে চীনা ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা বাংলাদেশে ১৩০৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। তা ছাড়া চীন তার বিনিয়োগ নীতিতে কোনো জবরদস্তি করে না, যা ভারত করে।
ভারত বাংলাদেশে যে ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয় তার শর্তগুলো বড় অদ্ভুত। এই ঋণে যে কাজ হবে তার জন্য কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা যাবে না। সে টেন্ডারে শুধু অংশ নিতে পারবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। পরামর্শক নিতে হবে কেবল ভারত থেকে। ভারতীয় ঋণের প্রকল্পে ইট, কাঠ, সিমেন্ট, যন্ত্রপাতি, যানবাহন সব কিছু আনতে হবে ভারত থেকে। আর তার দাম নির্ধারণ করে দেবে ভারত। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হবে না।
কার্যত বাংলাদেশ ভারতীয় ঋণ প্রকল্পে শুধু কিছু মজুর নিয়োগ করতে পারে। আবার ভারতীয় এই ঋণ প্রকল্পে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার লক্ষ করা গেছে রেলওয়ে ওয়াগন আমদানির ক্ষেত্রে। ভারত বাংলাদেশে যে যাত্রীবাহী ওয়াগন রফতানি করেছে, তার সবই প্রায় ভারতীয় রেলওয়ের পুরনো ওয়াগন। এগুলোতে রঙ করে একটা ল্যাপ-ছ্যাপ দিয়ে বাংলাদেশে রফতানি করা হয়েছে। সরকার চুপ।
তাতে রেল ওয়াগনের গেটে হিন্দি ভাষায় লেখা আছে বিভিন্ন নির্দেশিকা। ওয়াগনের ভেতরে যে ফ্যান রয়েছে, তাতেও হিন্দি ভাষায় লেখা আছে বিভিন্ন কথা। তবে কি বাংলাদেশ ভারত হয়ে গেছে? অর্থাৎ প্রতারণাই এখানে ভারতীয় ঋণের মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুটে নাও বাংলাদেশÑ এই হলো ভারতীয় নীতি।
চীন থেকে যে বিপুল অঙ্কের ঋণ পাওয়া যাবে আগামী পাঁচ বছর ধরে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সুসংবাদ। তার ওপর ‘লুটে নাও’ চীনের নীতি নয়। তারা প্রদত্ত ঋণে সত্যি সত্যি সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়ন চায়। দক্ষিণ এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত প্রায় সব দেশের সব চেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন।
শুধু এশিয়া নয়, চীন তার উদ্বৃত্ত অর্থ আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায়ও বিনিয়োগ করছে। এসব দেশের কেউই চীনা ঋণে ফতুর হয়নি, বরং তাদের জীবন মানে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অরুণাচল ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে ভারতের সাথে চীনের বিরোধ থাকলেও বাণিজ্য সম্প্রসারিতই হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনাকালে বলেছেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেল। তিনি বলেছেন, চীন বাংলাদেশের ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু ও ভালো অংশীদার। তিনি মনে করেন, তার এই সফর দুই দেশের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠক শেষে শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট শির সাথে তার দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে বিভিন্ন চুক্তি সই হয়েছে। আমরা খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।
এখানে আরো একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আর তা হলো রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টিকে চীন বিরোধী দল হিসেবে কোনোরূপ স্বীকৃতিও দেয়নি বা রাজনৈতিক দল হিসেবে গোনায় ধরেনি। সরকার যত হল্লাচিল্লাই করুক না কেন, চীন নিশ্চিত যে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিই।
আর তাই তার সফরসূচিতে আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল যে, তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করবেন। শেখ হাসিনার সাথে ৪৫ মিনিটের বৈঠকের পর জনাব শি বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও ৪০ মিনিটের একঠি বৈঠক করেন। শুধু বিরোধী দল বলেই নয়, চীন জানে, ভবিষ্যতে যদি ক্ষমতার পালাবদল হয়, তাহলে বিএনপিই আবার ক্ষমতায় বসবে। সেখানে তার এই বিপুল বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
এ আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে ভূ-রাজনীতি প্রসঙ্গ।। এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাতে চীন আশা করেছে, ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে। এই ভূ-রাজনীতির বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ভূ-রাজনীতির সাথে জড়িত আছে, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, চীন-ভারত সম্পর্ক, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, টেকনাফ থেকে মিয়ানমার হয়ে এশিয়ান হাইওয়ে প্রভৃতি।
নেপালও এর বাইরে নয়। এখন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ অবস্থা। এমনকি সীমিত পরিসরে এ যুদ্ধ বাধলেও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে স্বাভাবিকভাবেই সিল্ক রুট দিয়ে পাকিস্তানি বন্দর থেকে চীনে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে।
চীন সে পরিস্থিতি কিছুতেই মেনে নেবে না। সে ক্ষেত্রে এ যুদ্ধে চীনের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। চীন যদি সে যুদ্ধে জড়িয়েই পড়ে, তবে তা কেবল কাশ্মির সীমান্তে সীমিত থাকবে না। যুদ্ধ শুরু হবে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও। আবার তা এগিয়ে আসবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যেও।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারত কোনো দেশের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নেবে। তা হলে চীনের আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হবে বাংলাদেশও। আমরা কি তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা রাখি?
আরো একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়। আর তা হলো, চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর ও এই বিপুল ঋণ সহায়তার ঘটনা ঘটল মাত্র এক মাসের মধ্যে। যখন ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।
যুদ্ধ যদি বাধেই তাহলে বাংলাদেশকে নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে হবে বা চীনকে সহযোগিতা করতে হবে অথবা ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। এই সফর ও সহযোগিতা সেটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার উপলক্ষও বটে।
লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
এমবি





