সাধারণত স্নাতক পর্যায়ে ক্লাস শেষের দিনে হয়ে থাকে র‌্যাগ ডে। র‌্যাগ ডে পালনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য দেন না। তাই সকল শিক্ষার্থীদের চাঁদা দিয়েই পালন করা হয় এ উৎসব। মূলত শিক্ষার্থীরা তাদের বিগত দিনগুলোকে স্বরণীয় করে রাখতে এ উৎসব পালন করে। কিন্তু উৎসব পালনের প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে দেয় এ দিনটি তারা ক্যাম্পাসের আকাশ-বাতাশে কতটুকু স্বরণীয় রাখতে পারে।

সাদা টি-শার্ট। টি শার্টের ওপর নানা রঙের ছোড়াছুড়িতে ভিন্ন রঙ ধারণ করা। শার্টের ওপর প্রিয় বন্ধু-বান্ধবদের স্মরণে ইচ্ছামতো লেখালেখি। ক্যাম্পাসজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো। গানের তালে একসঙ্গে নাচা। খাওয়া-দাওয়া আর নিজেদের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এসব মূলত বর্তমান সময়ে র‌্যাগ ডের উপজীব্য বিষয়।

শার্টের ওপর বন্ধু-বান্ধবরা সবাই একে অপরে ইচ্ছে মতো যাচ্ছেতাই লিখেছে। এসব লেখায় বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর ক্যাম্পাসে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি, ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে দৌড়াদৌড়ি এভাবে পার হয় জীবনের সব থেকে সেরা দিনগুলো। কখন যে সময় চলে যায় কেউ টেরই পায় না। জীবনের নির্দিষ্ট একটি সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টুং করে বেজে ওঠে বিদায়ের ঘণ্টা। শিক্ষাজীবনের সেই মধুময় দিনগুলো বিদায়ী শিক্ষার্থীর পিছু ডাকে।

স্নাতক ডিগ্রি লাভের শেষ সময়ে শিক্ষা সমাপনী বা র‌্যাগ ডে পালিত হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীরা এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চান নানা রকম বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে।

বিভাগকে বর্ণিলভাবে সাজানো, ঘোড়ার গাড়িতে করে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ, সাউন্ডস্পিকারে গান বাজানো, স্ট্রিট ড্যান্স, রঙ মেখে আনন্দ আর ক্যাম্পাসে ফ্লাশ মব এখন র‌্যাগ ডের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। শুধু আনন্দই নয়, সেদিন সবাই টিএসসি অডিটরিয়ামে সম্মানিত শিক্ষকদের পরামর্শও মনোযোগ দিয়ে শোনেন। যে লাজুক ক্লাসমেটটি কোনো দিন কারও সামনে পারফর্ম করেননি, তাকেও বন্ধুদের জোরাজুরিতে সেদিন মাইক্রোফোন হাতে কিছু একটা পারফর্ম করতে দেখা যায়।

সে সঙ্গে চলতে থাকে সেলফি স্টিক দিয়ে দফায় দফায় ছবি তোলা আর পারফরম্যান্সগুলো ভিডিও করে রাখা। সবার জন্য দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সাদা টি-শার্টের ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা রঙিন কলমে একে অন্যের প্রতি বিগত ক্যাম্পাস জীবনের অনুভূতিগুলো সংক্ষেপে লিখে দেন। কিন্তু এসব উল্লাসের মধ্যে আছে এক বেদনা বিধুর অনুভূতি। ছেড়ে যাবার আর্তনাদ। কিছুই করবার নেই, ছেড়ে তো যেতেই হয়- তবুও যাওয়া হয় না-বিদায় সেতো তুচ্ছ অনুভব ছিঁড়ে যাবেনা বাঁধন। ছুটে যাবো বিভিন্ন প্রান্তরে তবুও আমরা স্বজন।

হ্যাঁ, ছেড়ে গিয়েও বন্ধুত্বের বাঁধন, ক্যাম্পাসের টান ও স্মৃতিচারন কোন অংশেই কমে যায় না। তবে পৃথিবীর সকল মানুষ জানে এ দিনটিতে শিক্ষার্থীরা শুধু বিদায়ের হাহাকার নয়, ক্যাম্পাস থেকে আরো কিছু নিয়ে যায় রাষ্ট্র, মানবতা ও স্বজাতির জন্য। এরপর হয়ত তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নতুন আলো ছড়ায়। নতুন কোন শান্তির পথ খুঁজে আনে মানব গোষ্ঠির জন্য।

কিন্তু ক্যাম্পাস, শিক্ষক ও পরবর্তী অনুজদের জন্য আমরা কী রেখে যাই! ক্যাম্পাস, আমাদের শিক্ষকরা ও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কতটুকু তৈরি করতে পারি আমাদের চাহিদা? তাদের হৃদয়ে গহব্বরে আমাদের জন্য কতটুকু মূল্যায়ন জমা হয় সেটিও গভীরভাবে বিবেচনার বিষয়।

মাগিবাজ, বোকা চোদা, কনডম ব্যাবসায়ী, সুন্দরী বৌদী দপ্তর মালিক, ডলির আব্বু, মাগিখোর, চুদির ভাই, সুন্দরী নলনা, ময়দা সুন্দরী, এসব বাক্যগুলো? ক্যাম্পাসের আকাশ-বাতাস, শিক্ষক ও পরবর্তী অনুজরা কী আমাদের কাছে এসব আশা করে? এ ধরণের বাক্য থেকে হয়ত আমাদের কেউ কেউ সাময়িক প্রফুল্লতা পেলেও আমাদের অনুজরা অসামান্য ক্ষতির মুখে পড়ে। কারণ ১৮-২৫ বছর তরুণ-তরুণীদের চরমভাবে যৌন সুড়সুড়ি দেয় এমন উত্তেজক শব্দগুলো। শব্দগুলো শুধু যে অশ্লীল শুনায় তা নয়। বাস্তব জীবনের কোন অংশের সঙ্গে এসব শব্দের কোন সম্পৃক্ততা নেই। সুতরাং এগুলো একেবারেই অনর্থক।

আর আনন্দ? তা তো আমরা আরো বহু শালিনতার সঙ্গে করতে পারি। যা অন্যরা অনুসরন করে যেমন শিক্ষা লাভ করবে তেমন আমাদের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখতেও সহায়ক হবে। সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করা নাগরিকদের অধিকাংশ জীবনাচরন হওয়া উচিত অন্য সকল মানুষের জন্য অনুসরন ভিত্তিক। মা-বাবা ও এ দেশের খেটেখাওয়া মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে তাদের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে আমাদের পড়াশুনার খরচ যোগায়। আমাদের ওপর যেমন তাদের অক্ষিবিভোর স্বপ্ন আছে আবার তাদের প্রতিও আমাদের অসামান্য দায়বদ্ধতা রয়েছে।

নিঃসন্দেহে কেউই আমাদের নিকট এসব যৌন সুড়সুড়ি আশা করে না। তারা চায় শিক্ষা, সংষ্কৃতি, রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি ও কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন কোন ফর্মূলা, নতুন কোন নির্দেশনা। আমাদের বিগত জীবনের সর্বোত্তম রিভিউগুলো। এমন শব্দগুলো যদি আমাদের জীবনের বিশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের রিভিউ হয় তাহলে শিক্ষাঙ্গন গুলোর পাঠদান ও শিক্ষাগ্রহনের ব্যপারেও প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

মনে রাখতে হবে, আমাদের শিক্ষা জীবনের রিভিউগুলো শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নয়। তার মাধ্যমে আগামী দিনের সুন্দর একটি মানবগোষ্ঠি ও বসবাসের উগযোগী একটি পৃথিবী তৈরি করতে।

আজকের এ অশান্ত পৃথিবী আমাদের কাছে অনেক কিছু আশা করে। আর কাঁটাতার বিহীন একটি পৃথিবী গড়তে আমাদের দায়বদ্ধতাও আকাশচুম্বী।

লেখক: শিক্ষার্থী, টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)