পৃথিবীর দেশে দেশে সংবিধান কেন রচনা করা হলো ? কি প্রয়োজন ছিল এই বাঁধাধরা নিয়ম-কানুনের ? কেনই বা এতো বাধ্যবাধকতা এই সংবিধানের প্রতি ?

মানুষ জন্মগতভাবে আমিত্বের পূজারী। পৃথিবীর সব কিছুকে নিজের মতো করে নিতে চায়। নিজের বিরুদ্ধে, কিন্তু অন্য সবার স্বার্থে কোন কাজ করতে প্রায় সকল মানুষ নারাজ। ব্যতিক্রম দুই চারজন যা জন্মেছে তারা কেউই সাধারণ মানুষ নন। দেখতে পানি-মাটির গড়া মানুষের মতো হলেও তাদের কাছে সৃষ্টিকর্তার অমীয় বাণী এসেছে। যার শক্তিতেই তারা পুরো জীবনটা মানব সেবায় ব্যয় করেছেন। প্রচার করেছেন সৃষ্টিকর্তা প্রদর্শিত চলার সঠিক পথ।

বর্তমান পৃথিবীতে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি দেশের পরিচালক হিসেবে যখন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তাকে দেওয়া হয় কিছু নিয়ম-কানুন সম্বলিত একটি বই। যা আমাদের আজকের সমাজে সংবিধান হিসেবে পরিচিত। ইংরেজি ভাষায় যেটিকে কনস্টিটিউশন এবং আরবী ভাষায় দুস্তূরুন বলা হয়। প্রশ্ন ছিল, কেন এই সংবিধান ? যতটুক মনে হয়, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তির উপর অনাস্থা থেকেই এই সংবিধানের সৃষ্টি। যে পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহন করে সে নিজেও ঔ সংবিধানের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে। আর এতেই প্রমাণিত হয় যে, দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিও নিজেকে বিশ্বাস করে না। নিজের মন প্রসূত সকল কর্মকান্ড দেশ বা মানব ক্যালাণে হবে না বুঝেই সে সংবিধানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।

তাহলে আমরা কেন এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে দেশ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করব বা মেনে নেব? কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, আমাদের মাঝে এমন কেউই নেই যে আত্ম পূজার উর্ধে। তাই তো সংবিধান রচনার দরকার হয়েছে। যেন সে এই সংবিধানের পরিপন্থী কিছু করলে তা বেআইনী হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রশ্ন আসে, সংবিধানের রচয়িতাও তো সেই মানুষ যে, সামান্য আগে নিজেকে আত্ম-পূজারী বলে স্বীকার করেছে। তাহলে আপনি কি করে নিশ্চিত হলেন যে, এই সংবিধান পুরোপুরি সঠিক। আত্ম-পূজারী মানবকুল দ্বারা রচিত এই সংবিধান মানবতার মুক্তিতে কতটা টেকসই ভূমিকা পালন করতে সক্ষম ? উত্তর একটাই, সক্ষম নয়।

এতো গেল আমাদের চিন্তা। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিও তার সৃষ্ট মানবের উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন নি। আর এই অনাস্থার কারণেই তিনি কালের বিবর্তনের বাঁকে বাঁকে বিশেষ কিছু মানুষ পাঠিয়েছেন আমাদের কাছে। আর সাথে দিয়েছেন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিচালনার নিয়ম-কানুন সম্বলিত মহাগ্রন্থ। প্রেরিত সেই মহা পুরুষ উক্ত নিয়মানুসারে কাজ করবে। কাজ করবে মানবতার মুক্তির জন্য, পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, অধিকার বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। সত্যকে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে কাজ করবেন সেই মহামানব।

সুতরাং সংবিধান রচনার প্রয়োজন যেহেতু মানুষের আমিত্ব বোধ থেকে বেরিয়ে না আসতে পারার কারণে। আর পৃথীবিতে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বাণীগুলোই নিরপেক্ষ এবং মানবতা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা রাখার সক্ষম। তাই এ কথা প্রমাণিত যে, সংবিধানে সৃষ্টিকর্তার বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক কোন কিছু থাকলে সেটি ভুল।

এবার আসা যাক প্রচলিত একটি কথার দিকে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ কথাটা কোন মুর্খো, অবোধ, জ্ঞান পাপি প্রথম বলেছিল আমার জানা নেই। তবে কথাটা আজ সমাজের জন্য কত বড় বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে তা সর্বজন অনুমেয়।

সকল মানুষ দেখতে একই। বাহির থেকে দেখে সাধারণত মানুষের মধ্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণের পার্থক্য বোঝা যায় না, যদি না বিশেষ কোন জাতি-ধর্ম-বর্ণের চিহ্ন বহন না করে। বিশেষ কোন বেশ, পোষাক বা ভাষা ব্যবহারেও বোঝা যায় তার জাতি-ধর্ম-বর্ণগত পরিচয়। যেমন: কেউ পানিকে জল বললে প্রথমিকভাবে আমরা ধারণা করি লোকটি সনাতন ধর্মাবলম্বী।

এরকম প্রতিটি জাতি-ধর্ম-বর্ণের আলাদা আলাদা কিছু সাংস্কৃতি রয়েছে। বাঙ্গালী হয়ে ভিনদেশী সাংস্কৃতি অনুসরণ করলে আপনি যেমন জাতিগত দৃষ্টিকোন থেকে নিন্দিত হবেন; ঠিক তেমনই অন্য ধর্মের সাংস্কৃতি গ্রহন করলেও আপনি ধর্মীও দৃষ্টিকোন থেকে নিন্দিত হবেন।

এবার আসা যাক হোলি নামক উৎসবের দিকে। এটি সনাতন ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত। দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বহির্বঙ্গে পালিত হোলি উৎসবটির সঙ্গে দোলযাত্রা উৎসবটি সম্পর্কযুক্ত। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সহিত রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়। (সুত্র: ইউকিপিডিয়া)

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজধানীসহ দেশের বেশ কিছু এলাকায় হোলি উৎসব পালন করছে অমুসলি-মুসলিম, ছোট-বড় এক সাথে। যমুনা টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর একটি এলাকায় রাস্তায় নেমেছে কিছু যুবক-যুবতি। এদের মধ্যে কিছু ৪০ উর্ধ্ব বয়সের নারী-পুরুষও আছে। ছেলেরা মেয়েদের মুখে, হাতে, গলায় জোর পূর্বক রং মেখে দিচ্ছে। মেয়েরাও ছেলেদের মুখে, হাতে রং মেখে দিচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে ছেলেরা এগিয়ে। শারীরিক শক্তি বেশি থাকায় তারা মেয়েদের মুখে খুব সহজেই হাত দিতে পারছে। রং দিতে গেলে মুখ লোকানোর চেষ্টাও করছে অনেকে। ক্ষেত্র বিশেষে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে। তবে রক্ষা হয়নি। জোরপূর্বক মুখে রং মেখে দিয়েছে। মূলত উৎসবের নামে মেয়েটির নরম মুখে হাত বোলানোর লালসার বাস্তবায়ন করে যুবক সমাজ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি বলা হয় ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা হোলি উৎসব পালন করবে; তাহলে নিজের পোশাক নষ্ট করে রং মাখামাখিতে যারা আগ্রহ প্রকাশ করবে তাদের সংখ্যা নিতান্তই গুটি কয়েক হবে। তবে সে উৎসব বেশি সময় স্থায়ী হবে না।

একটি ছেলে যখন একটি মেয়েকে রং দিতে যাচ্ছে তখন এই দৌঁড়া-দৌঁড়ির ঘটনা বেশি ঘটছে। জোরপূর্বক রং মাখাতে গিয়ে অনেক সময় মেয়েদেরকে জড়িয়ে ধরছে যুবক ছেলেগুলো। জনসম্মুখে এমন জড়াজড়ি এ যেন টিকেট ছাড়াই যাত্রা পালা। তবে কি হোলি উৎসবে অংশ গ্রহনকারী মেয়েগুলো নিজেকে যাত্রাপালার নষ্ট নায়িকার (গ্রাম্য যাত্রা পালার বাস্তব চিত্র) চাইতেও নিন্ম মানের হিসেবে সমাজের কাছে উপস্থাপন করতে চায়? কারণ যাত্রা হয় একটি আবদ্ধ মজলিসে। আর হোলি উৎসবের নামে নষ্টামি হয় প্রকাশ্যে দিবালোকে। পাঁচ রাস্তার মাথায়। ভিডিওতে দেখা যায়, রং মাখামাখি ব্যাপক আকার ধারণ করলে পথচারীদেরও রং দিচ্ছে উন্মাদের দল। এ নিয়ে ক্যামেরার সামনে আপত্তিও করছে ভূক্তভোগীরা।

বর্তমান সমাজের আরেক নষ্টামি জন্মদিনের উৎসব। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্মদিন পালনের একমাত্র উদ্দেশ্য বান্ধবীর মসৃন ত্বকে নিজের হাত বুলিয়ে দেওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টিকরা। আমি অনেক দিন দেখেছি ক্যাফেটিরিয়ার বারান্দায় বা ভেতরে জন্মদিনের উৎসব পালনের নামে নষ্টামির চিত্র। শান্ত মেয়েটির আপত্তি থাকার পরও তার মুখে রং দেওয়ার নামে আপত্তিকর অঙ্গে হাত দিতে। কিছুই বলার থাকে না শান্ত মেয়েটির। বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে খানিকটা সময় তালমিলিয়ে অশান্ত একটি মন নিয়ে মাথা নিচু করে ছাত্রী আবাসিক হলের দিকে ছোট ছোট পায়ে যেতে হয় তাকে। এভাবে অনেকের বন্ধুত্বও ভেঙ্গেছে আমার জানা। আমাদের মেয়েদের নতুন করে ভেবে দেখবার সময় এসেছে বন্ধু বাছাই ও নিজের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিয়ে।

সাবধান ! যারা আজ নারীর অধিকার নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ায় তাদের অধিকাংশই নতুন কোলবালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারে না। তারা মেয়েদেরকে বিশেষ করে যুবতি সমাজকে বাজারের পণ্যের মতো ব্যবহার করে। আজ মাদক বিরোধী বক্তব্য দিয়ে যারা মঞ্চ গরম করে, তারা অবসরে এক সাথে বসে মাদক সেবন করে।

ধর্ম যার যার উৎসব সবার কথাটি আসলে মুসলমান যুবকদের কে বোকা বানানোর জন্য বলা হয়। আপনি কি একবারো ভেবেছেন তাদের কথা ! তাদের অনেকেই মুখে বলে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। কিন্তু মুসলমানদের কোন উৎসব তারা পালন করে কি? নাকি মুসলমানদের উৎসব (সংখ্যালঘু) স্বাচ্ছন্দে পালন করতে দেয় ? যদি উৎসব সবারই হয়ে থাকে তাহলে কেন মুসলমানদের কোরবানির সময় তাদের আপত্তি। গরু জবাই করলে কেন তাদের বিরোধীতা ? আমরা ঠিকই দেবীকে উৎসর্গ করা প্রসাদ খাচ্ছি। তারা কিন্তু কোন দিনও আপনার কোরবানি করা গরুর গোস্ত খায় না/খাবে না। মূলত মুসলমানের ঈমান ধ্বংস করার জন্যই যত সব ফাঁদ পেতে বসে আছে তারা।

আপনাকে কেউ বেঈমান বলে গালি দিলে আপনি শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে আপনি ঈমানদ্বার। কিন্তু পরক্ষণেই আপনি যা করছেন তা আপনার ঈমানের সাথে সাংঘার্ষিক। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হন অবশ্যই আপনাকে নিজ ধর্মের সঠিক শিক্ষা অর্জন করতেই হবে। এ কারণেই সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষের উপর ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করা বাধ্যতামূলক করেছেন। পাশাপাশি সমসাময়িক বিষয়গুলোতে পারদর্শিতা অর্জন করাও জরুরী।


লেখক-
সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)