যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অকল্পনীয় বিজয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড়ের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশিষ্ট মার্কিন রাজনৈতিক জুয়াড়ি গত দুই সপ্তাহেই যেন হোয়াইট হাউজকে একটি জুয়ার বোর্ডে পরিণত করেছেন। রাজনীতি বা আইন সম্পর্কে তার সামান্যতম অভিজ্ঞতাও নেই।

ধারণাটা যেন এই রকম যে, জুয়ার ঘুঁটি চেলে যাবেন, কখনো না কখনো তার সৌভাগ্যের নম্বরটি আসবেই। এই কায়দায়ই তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতা বাগিয়ে নেন। আর কৌশলী প্রচার প্রপাগান্ডার পর তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন থেকে ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েছিলেন।

জুয়া খেলায় ট্রাম্প ভাগ্যবানই বটে। আর সে ভাগ্যের জোরেই তিনি এত ধন সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। কিন্তু জুয়ার বড় দানে চার বছর মেয়াদের অনেক আগেই তাকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে হতে পারে। কারণ তার সর্বশেষ জুয়া বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।

গত ২৭ জানুয়ারি তিনি এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন। তাতে তিনি সিরীয় ও অন্যান্য উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ১২০ দিনের জন্য এবং মুসলমান-প্রধান সিরিয়া, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।

এই আদেশ জারি করার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক গোলযোগ সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী আমেরিকার বেসামরিক বিমানবন্দরগুলো ঘেরাও করে ফেলেছে। মার্কিন সিভিল লিবার্টি ইউনিয়ন (এসিএলইউ) এই নির্বাহী আদেশ রদের জন্য মামলার পর মামলা দায়ের করেছে।

তারা বলছেন, এই আদেশ ‘মুসলিম নিষিদ্ধকরণে’র সমতুল্য এবং মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে এই নিষিদ্ধকরণ কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, এর পরিণতি তাই হয়েছে। বৈধ ভিসা ও গ্রিন কার্ড এবং অন্যান্য কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেককে যুক্তরাষ্ট্রমুখী বিমানে চড়তে দেয়া হচ্ছে না। আর যারা মার্কিন বিমানবন্দরগুলোতে পৌঁছে গেছেন, তাদেরও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে হোয়াইট হাউজকে এখন একটি আপৎকালীন অবস্থা মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

কারণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই আদেশ সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত নয়। আবার এটাও বুঝতে পারছেন না যে, এই আদেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এত তড়িঘড়ি করে এবং গোপনে কেন এই আদেশ জারি করা হলো, সে সম্পর্কে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি শীন স্পাইসার বলেছেন, ‘যেসব ক্ষতিকর ব্যক্তি দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তাদের ঠেকানোর জন্য এমন আদেশ জারি করা হয়েছে।’

তবে চার দিনের দুঃসহ অবস্থার পর মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) ৩১ জানুয়ারি ঘোষণা করে যে, গ্রিন কার্ডধারীদের ক্ষেত্রে এই নির্বাহী আদেশ প্রযোজ্য হবে না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওই অবৈধ আদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে এখন তুলকালাম কাণ্ড ঘটছে। কিন্তু এই নির্বাহী আদেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট নিজেই সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন এবং নিজেকে অপসারণের পথ উন্মোচিত করেছেন। যতই দিন যাচ্ছে, ততই সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জগুলো সামনে চলে আসছে।

এ ধরনের সাংবিধানিক বিষয় সাধারণত মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট নিষ্পত্তি করে থাকে। সামনের দিনগুলোতে সুপ্রিম কোর্টে এই প্রশ্ন উঠবেই যে, এই নির্বাহী আদেশ জারি করে ট্রাম্প সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন কি না।

এটা যদি হয়, তাহলে যে সংবিধান রক্ষার শপথ তিনি নিয়েছেন, সে সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের জন্য বিতর্ক ছাড়া সিনেটের আর কোনো পথ থাকবে না।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব মামলা দায়ের করা হচ্ছে, সেগুলো শুধু তার নির্বাহী আদেশের সাংবিধানিকতা নিয়েই নয়, তার মধ্যে আরো অনেক বিষয়ই থাকবে। আর সেগুলো হলো, তার আদেশের প্রথম দিনই অবৈধভাবে ১২৭ ব্যক্তিকে বিমানবন্দরে আটক করে রাখা। তারা অধিকার হরণের মামলা যেমন করবেন, তেমনি ধর্ম ও গোষ্ঠীগত কারণে তাদের প্রতি বিভেদমূলক আচরণ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবেই নির্বাহী বিভাগের চেয়ে আদালতের ক্ষমতা অনেক বেশি। এখানে আদালত অ-নাগরিকদের প্রতিও সমান আচরণ করে থাকেন। অ-নাগরিকদেরও রয়েছে সাংবিধানিক অধিকার। এ ব্যাপারে আদালতের অনেক অনুকূল রায় রয়েছে। তা ছাড়া মুসলমানদের আমেরিকা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তা মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর সম-অধিকার ধারার পরিপন্থী।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্কিন ইমিগ্রেশন আইন ও বিধিবিধানে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওই আদেশে এক দিকে মুসলমান উদ্বাস্তুদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, অপর দিকে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে খ্রিষ্টান উদ্বাস্তুদের আসতে কোনো বাধা না দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এটাও চরম বিভেদাত্মক এবং মার্কিন সংবিধানের পরিপন্থী। সর্বোপরি ১৯৮২ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, সেটাও প্রণিধানযোগ্য। সে রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বলা হয়েছে যে, কোনো ধর্মমতকেই অন্য কোনো ধর্মমতের ওপরে স্থান দেয়া যাবে না।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশে আরো বলা আছে, যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে সব ধরনের যাচাই-বাছাইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ রদ করা যাবে। কিন্তু ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পঞ্চম ও চতুর্দশ সংশোধনীতে প্রদত্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের সন্ধানে ইতোমধ্যে ২০০ হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করা হয়েছে। এই আবেদন আসছেই। এ ছাড়া মার্কিন সংবিধান এটাও নিশ্চিত করেছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির তার পরিবারের সঙ্গে একত্র হওয়ার অধিকার রয়েছে।

এর সব কিছু অস্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাহী আদেশ জারি করে দিয়েছেন। কিন্তু এখন বহুমুখী সমালোচনা আর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলছেন, ‘ধর্মের কারণে এটা করা হয়নি। এটা করা হয়েছে সন্ত্রাসের কারণে এবং আমাদের রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখার জন্য।’

ট্রাম্পের আইনজীবীরা বলতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা যায়।’ কিন্তু আদালতে এই যুক্তি টিকবে বলে মনে হয় না। কারণ আদালত বলতে পারে যে, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সাংবিধানিকভাবেই সমাধান করা সম্ভব।

সংবিধান, সংসদ ও আইন বিষয়ে অনভিজ্ঞ মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট তার নির্বাহী আদেশ জারির সময় ভাবেননি, যেসব অভিবাসী ইতোমধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেছেন, তারা যে দেশ থেকেই আসুন না কেন, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেয়া যাবে না। কিন্তু এই আদেশের ফলে এমন নাগরিকেরাও বিমানবন্দরে আটকে গেছেন।

এটা সামাল দেয়া ট্রাম্পের জন্য খুব সহজ হবে না। এ দিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ট্রাম্পের ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞার’ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে অনেক টুইটার বার্তায় বলা হয়েছে যে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেবেন। ট্রাম্পের উন্মাদনা এবং নৈতিক অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তুলেছে।

ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শ্যালি ইয়েটসকে ট্রাম্প গত সোমবার বরখাস্ত করে দিয়েছেন। কারণ তিনি ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সরকারি কৌঁসুলিদের এই মর্মে নির্দেশ দেন, তারা যেন ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশের পক্ষে না লড়েন। এটা নতুন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিবেকের দংশনের একটি প্রতিফলন।

শ্যালির এই আকস্মিক অপসারণ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কী মাত্রায় স্বৈরাচারী। ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে শ্যালির দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্ট, তার টিম ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে তার মতামত দেয়া। ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক ও বোস্টনে চারজন বিচারক ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তারপর শ্যালি ভিন্নমত প্রকাশ করলেন।

তদুপরি আলেকজান্দ্রিয়া, ভার্জিনিয়া ও সিয়াটল রাজ্য মুসলিম নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অস্থায়ী রুলিং জারি করেছে। কার্যত এই মুসলিম নিষিদ্ধকরণ নীতির ঘোষণা মার্কিন গণতন্ত্র ও সংবিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। ফলে সিনেট থেকে বিচার বিভাগ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। এই বিভেদের নীতি দূর করার জন্য মার্কিন সংবিধান একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে।

তবে এই গোলযোগের মধ্যেও সামান্য সুসংবাদ হলো, ইতোমধ্যেই কিছু অভিবাসী বিমানবন্দরে আটকাবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। অন্যরা স্বেচ্ছাসেবী আইনজীবীদের মাধ্যমে মুক্তির অপেক্ষায় আছেন।

এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক দলের কংগ্রেসম্যান ডন ব্লেয়ার গত রোববার এক টুইট বার্তায় বলছেন, ‘আমাদের এখন একটি সাংবিধানিক সঙ্কট রয়েছে। চারজন কংগ্রেস সদস্য সিবিপি কর্মকর্তাদের ফেডারেল আদেশ মান্য করতে বলেছিলেন। কিন্তু তারা তা মানেননি।’

এমএসএনবিসি টেলিভিশনের ভাষ্যকার ক্রিস হায়েস লিখেছেন, ‘৬৪ হাজার ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের (ডিএইচএস) কি হোয়াইট হাউস আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করতে বলেছে? বস্তুতপক্ষে হোয়াইট হাউজ ডিএইচএস এবং সিবিপিকে আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ লঙ্ঘন করার আদেশ যদি দিয়ে থাকে, তা হলে আইনের শাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে আর আমরা আছি এক নজিরবিহীর পরিস্থিতিতে। বিধাতা যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করুন। আমিন।’

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

[email protected]

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)