মিয়ানমারের আরাকানে দুই বছর আগে সৃষ্ট জাতিগত দাঙ্গার নামে মুসলিম নির্যাতনের জের ধরে সম্প্রতি সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় কথিত রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দায়ী করে আসছে মিয়ানমার। ওই বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে দাবি করে সীমান্তের এপারে এসে তাদের ধরার আবদার বাংলাদেশ না মানায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৮ মে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বিজিবির ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। হামলায় বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান নিহত এবং চারজন আহত হন। ১৯৯১ সালেও নাইক্ষ্যংছড়ির রেজু আমতলী ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশের একজন সীমান্তরক্ষীকে হত্যা করেছিল মিয়ানমার। পরে তারা ওই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। এরপর গত প্রায় দুই যুগে দুই দেশের সীমান্ত মাঝে মধ্যে কিছুটা অশান্ত হয়ে উঠলেও কোনো বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীকে প্রাণ দিতে হয়নি। কিন্তু গত কয়েক দিনে মিয়ানমারের আক্রমণাত্মক আচরণ বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
কয়েকটি সূত্র জানায়, গত ৮ মে কক্সবাজারে বিজিবি-বিজিপির সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের পালিয়ে থাকার মিয়ানমারের অভিযোগ নাকচ করে দেয় বিজিবি। এ ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অভিযান চালালে বিজিপিকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতেও অস্বীকার করে বিজিবি। এই পতাকা বৈঠকের পর পরই বাংলাদেশ সীমান্তে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশের পাশাপাশি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখাইন যুবকদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘নাইন সিক্স নাইন’ নামে একটি সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন তৈরি করা হয়। এ সংগঠনটিকে রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নিপীড়নসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সীমান্তের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমার প্রায় ১৫ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে সীমান্তের ২৭ নং পিলার থেকে ৫২ নং পিলারের মধ্যবর্তী এলাকার বিভিন্ন ক্যাম্পে অন্তত আট হাজার ৫০০ সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানায়। কয়েকজন প্রত্যদর্শী জানান, ১২ চাকার বড় বড় গাড়িতে করে কালো পলিথিন মোড়ানো ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রতিটি গাড়িতে প্রায় দেড় শ’ সৈন্য সীমান্তে টহল দিচ্ছে। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াসংলগ্ন রাস্তা দিয়ে সৈন্য সমাবেশের এসব দৃশ্য বাংলাদেশ থেকেও বিজিবিসহ সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশী নাগরিকরা দেখছেন।
সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের জনপ্রতিনিদের ইতোমধ্যে মিয়ানমারের প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন সীমান্তে মোতায়েন সেনাদের হুকুম তামিল করে। সেনাবাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী এসব জনপ্রতিনিধিকে প্রতি গ্রাম থেকে ৫০০ করে রোহিঙ্গা যুবককে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এ নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ খবর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত সাইরাপাড়া, সালিডং, রাইম্যাবিল, রইঙ্গাদং, সালিপ্রাংসহ বিভিন্ন গ্রামে পৌঁছলে রোহিঙ্গারা এতে অসম্মতি জানান। সৈন্যদের ডাকে যারা সাড়া দিচ্ছে না তাদের বাড়িঘরে নতুন করে আগুন দিচ্ছে উগ্র বৌদ্ধরা। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে টেকনাফের নেটং পাহাড়ের নাফ নদীর পূর্বে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পাড়ায় কমপক্ষে ২০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়, যা টেকনাফ সীমান্ত থেকে অনেকেই প্রত্যক্ষ করেন। অপর দিকে বিভিন্ন গ্রাম থেকে শতাধিক রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক আর্মি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক এই আক্রমণাত্মক আচরণ বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। এ বিষয়ে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান জানান, সীমান্তে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক আচরণ অন্যায় ও অযৌক্তিক। মিয়ানমারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কোনো বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৎপরতা চালানোর সুযোগ আমরা কাউকে দেই না। এ বিষয়ে বিজিপির কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা আমাদের কাছে তারা দিতে পারে। কিন্তু বিদেশী কোনো বাহিনীকে আমরা বেআইনিভাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারি না।’ সীমান্তে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে গণমাধ্যম থেকে আমরা কিছু কিছু খবর জেনেছি। তবে সেসব খবরের বস্তুনিষ্ঠতার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৮ জুন থেকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে (সাম্প্রতিক নাম রাখাইন স্টেট) মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে সৃষ্ট জাতিগত দাঙ্গায় ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কয়েক শ’ মানুষ হতাহত হয়, যার বেশির ভাগই সংখ্যালঘু মুসলমান বলে বিভিন্ন মহল থেকে জানা গেছে। এ সময় আরাকান অঞ্চলের ৮৬০টি মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়। জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী জাতিগোষ্ঠী ও রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
এরপর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও মাঝে মধ্যে অশান্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ওই অঞ্চল। এরই জের ধরে গত মাসের শুরুর দিকে নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে সে দেশের ‘সন্ত্রাসীদের’ কয়েক দফা সংঘর্ষ হয় এবং এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। সূত্র: নয়াদিগন্ত।
[b]ঢাকা, ০৬ জুন(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস[/b]
মতামত
বিজিবি-বিজিপির উত্তেজনার নেপথ্যে
মিয়ানমারের আরাকানে দুই বছর আগে সৃষ্ট জাতিগত দাঙ্গার নামে মুসলিম নির্যাতনের জের ধরে সম্প্রতি সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় কথিত রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দায়ী করে আসছে মিয়ানমার। ওই বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে দাবি করে সীমান্তের এপারে এসে তাদের ধরার আবদার বাংলাদেশ না মানায় মিয়ানমারের





