কোর্স ওয়ার্কের করণে এবারের আমেরিকার নির্বাচনটা অনেকটা ভালো মতো দেখার সুযোগ হলো। নির্বাচন নিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র নেতার ইন্টারভিও নিয়েছি, দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলেজ ডেমোক্রাট ও কলেজ রিপাবলিকানদের কার্যক্রম। তবে সবই চার দেয়ালের মধ্যে, বাইরে বুঝার উপায় নাই নির্বাচন। সর্বশেষ ইন্টারভিউ নিয়েছি নির্বাচনের ২ দিন আগে ডেমোক্রাট নেতা সেক্রিটারি অফ মিসিসিপি স্টেট Delbert Hosemann এর। তার ভাষায় "মানুষ কি দেখে ভোট দিবে এবার, ইস্যু নিয়ে আলোচনা নাই, কারো কোনো প্রোগ্রাম নাই, আমি হতাশ মানুষ কেন যাবে ভোট কেন্দ্রে?"
নির্বাচনের দিন ভোট সেন্টারে ঘুর আসার পর ক্লাসে দেখলাম আমাদের কোর্স টিচার, আমেরিকাতে Mr Magazine হিসাবে পরিচত Samir Husni কে হাতি আর গাধার ছাপ ওয়ালা দুইটা টাই একসাথে পরে এসে আমেরিকার দলবাজ মিডিয়ার গুষ্টি উদ্ধার করতে। তার ভাষায় মিডিয়া গণমাধ্যম না হয়ে শ্রেণী বিশেষের মাধ্যম হলে মানুষ আস্থা হারাবে, ফলাফল মিডিয়া জরিপ এর উল্টা হবে। হলোও তাই। স্কুলের ডিনকে বলতে শুনলাম তিনি ভোট দিতেই যাবেন না, কারণ প্রধান দুই দলের প্রার্থীর কেউ তার মতে যোগ্য না। ফলাফল বিশ্লষেন করে দেখাগেলো গত দুই দশকের মধ্যে এইবার সব চাইতে কম ভোট পড়েছে। ভোটারদের মাত্র ৫৫ ভাগ ভোট দিয়েছেন।
সব কিছু ছাপিয়ে আমেরিকান প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক মাইকেল মুরের কথাগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। মুর গত চার মাস ধরে বলে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কি কারণে, কিভাবে, কোন কোন স্টেট এ জয়ী হবে তার বর্ণনা দিয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন " ট্রাম্প জানেন কিভাবে স্থূলবুদ্ধির ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষকে বসে আনা যাই, পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয় এবং প্রোপাগান্ডা চালাতে হয়, যেখানে নির্বোধ মিডিয়া মানুষকে সঠিক খবর দেয় না।”
মুর বার বার বলেছিলেন এক দিনের জন্য কোটিপতি, উদ্যোক্তা, শিক্ষিত আর ঘরহারা, স্বল্প শিক্ষিত, বেকার সবাই সমান, সবার একটাই ভোট। ডেমোক্রাটদের কেউ কেউ তার কথায় বিরক্তি ও অবজ্ঞা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু মুর থেমে থাকেননি, ট্রাম্পকে ‘মানুষরূপী বোমা’ আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, তাকে ভোট দেওয়া সন্ত্রাসবাদকে পুষ্ট করার সামিল, তৈরী করেছেন তথ্যচিত্র 'মাইকেল মুর ইন ট্রাম্পল্যান্ড'। নির্বাচনের কয়েকদিন দিন আগেও বলেছিলেন ভোটাররা মিশিগান, ওহাইয়ো, পেনসিলভানিয়া এবং উইসকনসিনকে ‘ব্রেক্সিট রাজ্যে’ পরিণত করবে। হলোও তাই, পুরো আমেরিকা এখন লাল।
হিলারির হাতে সবই ছিল, ছিল মিডিয়া, ছিল সব পুঁজিপতি, ছিল টাকার পাহাড়, ছিল সিভিল সোসাইটি, পক্ষের নির্বাচনী পূর্বাভাস, ছিল শিক্ষিত যুবকদের আশ্বাস (যদিও বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা বার্নি স্যান্ডার্সএর সমর্থক)। ছিলো না চাকুরীহারা, কর্মজীবী, স্বল্প শিক্ষিত, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মনের কথা। এ ছাড়াও ভোটাররা হিলারিকে ওবামা সরকারের সম্প্রসারণ মনে করেছেন যার মধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়েছেন।
আমার ক্লাসের এক সাদা চামড়ার শিক্ষক নির্বাচনের দিন ৫০ জন সাদা, দুই জন কালো ও ২ জন বাদামি ছাত্র ছাত্রীদের সামনে বললো: “আজ ট্রাম জিতবে কারণ এখনো সাদা কালোর একাঙ্গীভবন হয়নি, জাতি (বিদ্বেষ) এবার একটা ইস্যু, বিশ্ববাসীর কাছে কতদিন লুকিয়ে রাখবো আমরা এখনো সভ্য হয়নি"।
নির্বাচনের পরেরদিন দেখলাম বেশির ভাগ শিক্ষক হতাশ হয়েছেন, কিন্তু অবাক হয়নি। আমার ক্লাসের সাদা চামড়ার ৬ ছাত্র ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কাকে ও কেন ভোট দিযেছেন। উত্তর গুলো সংক্ষেপে তাদের মুখেই বলি:
১. (মেয়ে ভোটার) ভোট দিয়েছি ট্রামকে কারণ "আমি জামাই নির্বাচন করতে ভোট দেইনি, কিন্তু এমন একজনকে ভোট দিয়েছি যে স্মার্ট, সত্য হোক মিথ্যা হোক নিজের কথায় অটল থাকেন, কিছু করার ক্ষমতা আছে।
২. (ছেলে ভোটার) ভোট দিয়েছি ট্রামকে কারণ "হিলারি হলো শিশু হত্যাকারী" (হিলারি গর্ভপাত সমর্থন করেছেন)।
৩. (মেয়ে ভোটার) ভোট দিয়েছি ট্রামকে কারণ, “বিদেশে আমার ইনফ্লুয়েন্স বেড়ে লাভ কি যদি চাকরির বাজার তৈরী না হয়। হিলারিকে দেখলাম ৪ বছর আর কত, এবার একটু চেঞ্জ করে দেখি।"
৪. (মেয়ে ভোটার) ভোট দিয়েছি হিলারিকে কারণ আমেরিকার একজন মহিলা প্রেসিডেন্ট হওয়া দরকার।
৫. (মেয়ে ভোটার) ভোট দিয়েছি হিলারিকে কারণ তার পরিবারের সবাই ডেমোক্রাট।
৬. (মেয়ে ভোটার) ভোট দিয়েছি ট্রামকে কারণ "হিলারি হলো মিনমিনে শয়তান, দেখোনা ইমেইল কেলেঙ্কারি, আইএসআইএস তৈরি করছে, যদিও ট্রামের পক্ষে কোনো যুক্তি নাই।"
এই পোস্টটি যখন লিখছিলাম তখন বাংলাদেশ থেকে আসা এক স্টুডেন্ট বললো ভাই একটু লিখে দেন হিলারির ভুলের করণে ট্রাম জিতেছে।
সবশেষে ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এর মূল্যায়ন দিয়ে এই পোস্টটি শেষ করছি। তার মতে ‘প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন মার্কিন মধ্যশ্রেণি।’ জনগণ অধিক সময় ধরে শ্রম দিয়ে খুবই অল্প মজুরি পান। সেই সঙ্গে স্বল্প মজুরির জন্য বিনিয়োগ যাচ্ছে চীনের মতো দেশগুলোতে। আর এতে জাতীয় অর্থনীতি ব্যাহত হচ্ছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন। আর সাধারণ মানুষ সন্তানদের কলেজেও পড়াতে পারছেন না।’ আর এসব কারণেই বিক্ষুব্ধ মার্কিনিরা পরিবর্তনের আশায় ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন।'
(এখনো রিপোর্টার থেকে যাওয়ার কারণে নিজের অবজারভেশন গুলো না দিয়ে শুধু বিভিন্ন জনের কথা গুলো তুলে ধরলাম।) (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





