কোন কিছুর প্রচার করার সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যম হলো বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের তোয়াক্কা না করে তামাক কোম্পানিগুলো তাদের প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে তামাকজাত দ্রব্যের যে কোন প্রকার বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সারাদেশে তাদের বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পয়েন্ট অব সেল (বিক্রয় স্থলে) সিগারেটের  বিজ্ঞাপন বন্ধ করা যাচ্ছে না।

তামাক কোম্পানিগুলো তাদের পন্যের বিজ্ঞাপন দিতে অবলম্বন করছে নানা কৌশল। তার মধ্যে অন্যতম হলো সিগারেটের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে অনেকগুলো সিগারেট এর প্যাকেট একত্র করে বক্স তৈরি করা এবং এই বক্স বিক্রয়স্থানে সাজিয়ে রাখা যাতে দূর থেকে সিগারেটের প্যাক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করে। এই কৌশলে সিগারেট কোম্পানি সারাদেশে তাদের পন্যের বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাচ্ছে।

তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থলে কোম্পানি তাদের ব্রান্ডের লোগো অথবা কালার দিয়ে বিভিন্ন দোকানের সাইনবোর্ড বানিয়ে দিচ্ছে যা এক ধরনের বিজ্ঞাপন। এছাড়া কোম্পানি তাদের পন্যের প্যাকেট একসাথে করে তাদের লোগো আকৃর্তির বোর্ড বানাচ্ছে খুচরা সিগারেট বিক্রেতারদের জন্য এবং কোম্পানি এটা খুচরা বিক্রেতাদের ফ্রি দিচ্ছে। ফ্রি পেয়ে এসব বোর্ডের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতারা রাস্তার আসেপাশে সহজেই সিগারেটের ভাসমান দোকান দিতে পারছে। যার ফলে সারাদেশে বিশেষ করে জনবহুল জায়গাগুলোতে এসব বোর্ড নির্মিত ভাসমান সিগারেটের দোকান বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিগারেটের দোকান যেখানে সেখানে সহজলভ্য হওয়ায় ধূমপায়ীর সংখ্যাও বাড়ছে। আর দোকানে এরকম সাজানো সিগারেটের প্যাকেট দেখে তরুণরা সিগারেটের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এভাবে কোম্পানি তাদের পন্যের চাহিদা বাড়াচ্ছে।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন সম্পর্কে বলা আছে যে, সকল প্রকার তামাকজাত পন্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিধানে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বাংলাদেশে প্রকাশিত কোন বই, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড বা অন্য কোনভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন না বা করাইবেন না। এ আইন লঙ্ঘন করলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ৩ মাস বিনাশ্রম করাদণ্ড বা অনধিক ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হবে। ওই ব্যক্তি যদি দ্বিতীবার একই ধরনের অপরাধ করে তবে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত টাকার দিগুণহারে দণ্ডনীয় হইবেন।

বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের প্রত্যক্ষ বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও তামাক কোম্পানিগুলো পরোক্ষভাবে নানা কৌশলে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সিগারেটের বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। যা এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বরং দিন দিন এ ধরনের বিজ্ঞাপনের হার বাড়ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুয়ায়ী ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদান করা হলেও এ হার কমছে না। কারণ হিসেবে বলা যায়, ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের বিজ্ঞাপনের জরিমানার টাকা তামাক কোম্পানি পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানীদের দিয়ে দিচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে দোকানীরা ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়ায় তামাক কোম্পানির দেয়া বিজ্ঞাপন অপসারন করেছে না।

গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকে সার্ভে (গ্যাটস) ২০০৯ সালের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তামাক কোম্পানির অবৈধ বিজ্ঞাপনের কারণে প্রায় শতকরা ৩৮ দশমিক ৪ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তামাক পন্যের বিক্রয়স্থলে বিজ্ঞাপন দেখছে এবং তাদের তামাক পন্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।

এছাড়া বর্তমানে কিছু বিদেশী তামাক কোম্পানি যেমন ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল তাদের মার্লবোরো ব্রান্ডের প্রচারণা বৃদ্ধির জন্য ‘বি মার্লবোরো’ স্লোগান নিযে বিশ্বব্যাপি প্রচারণা চালাচ্ছে। আর বাংলাদেশে মার্লবোরো ব্রান্ডের সরাসরি নাম ব্যবহার না করে “বি দ্য ওয়ান” শীর্ষক ক্যাম্পেইনের  মাধ্যমে তামাকের প্রচারণা চালাচ্ছে। এভাবে অভিনব কৌশলে কোম্পানিটি সদ্য পাশ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, কর্মঠ ও স্মার্ট তরুণদের চাকরি দেয়া, ক্যারিয়ার বিষয়ক পরামর্শ ইত্যাদির নামে এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নানা ধরনের লোভনীয় চাকরির অফার করছে।

এই ক্যাম্পেইনে কোম্পানি চাকরি দেয়ার কথা বললেও কোম্পানির মুল উদ্দেশ্য হল তাদের পন্যের পরোক্ষ বিজ্ঞাপন প্রচার করা। কারণ, প্রচারণার সময় তাদের ব্রান্ডের লোগো, সাইন এবং কোম্পানির নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। যা একধরনের পরোক্ষ বিজ্ঞাপন। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে এ ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এসবের তোয়াক্কা না করে রাজধানীর বেশকিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল এ ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের অন্যতম সেরা তামাক কোম্পানি। বাংলাদেশে ঢাকা টোব্যাকো হচ্ছে এই কোম্পানির ব্যবসায়ী পার্টনার।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের পর আমাদের দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে তামাকের প্রত্যক্ষ বিজ্ঞাপন বন্ধ হলেও পরোক্ষ বিজ্ঞাপন বন্ধ করা যাচ্ছে না। যেমন, নাটক সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহার যা পরোক্ষ বিজ্ঞাপনের আওতায় পড়ে। তামাক কোম্পানিগুলো নাটক ও সিনেমার পরিচালকদের প্রভাবিত করছে নাটক সিনেমায় বেশী বেশী ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহারের জন্য। যার ফলশ্রুতিতে পরিচালকরা কাহিনীর প্রয়োজন ছাড়াও শুধু শুধু ফ্যাশনের দোহাই দিয়ে নাটক সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহার করছে।

পার্শ্ববর্তীদেশ ভারতের সিনেমা নাটকগুলোতে কাহিনীর প্রয়োজনে ধূমপানেরর দৃশ্য ব্যবহার করা হলেও বড় আকারের সতর্ক বাণী প্রচার করছে। অথচ আমাদের দেশের নাটক সিনেমাগুলোতে কোন প্রকার সতর্ক বাণী প্রচার করা হচ্ছে না। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে এ ধরনের ধূমপানের দৃশ্য প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও আমাদের দেশের নাটক, সিনেমায় কাহিনীর প্রয়োজন ছাড়াও ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইদানিংকালের নাটকগুলোতে বিশেষ করে পিক আওয়ার (সন্ধা ৬-রাত ১০টা) পর্যন্ত সময়ে প্রচারিত নাটকগুলোকে টার্গেট করছে তামাক কোম্পানিগুলো। এ নাটকগুলোতে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপে বেশী বেশী করে ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিককালের সিনেমাগুলোতেও কাহিনীর প্রয়োজন ছাড়াই ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

লেখক

ইমান উদ্দিন ইমন

এডভোকেসি কর্মকর্তা

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট