সামাজিক ভাবে বহু রোগ ব্যাধির প্রাদুর্ভাব সব সময় থাকলেও মানুষ এতো মানসিক অশান্তিতে ভোগেনা। অন্যায়-অনাচার আগেও ছিল বর্তমানেও আছে, আগামীতে ও থাকবে।
কিন্তু সম্প্রতি ধর্ষণ অপহরণের যে জঘন্য চিত্র প্রতিনিয়ত মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে, তা সত্যিই ইতিহাসের যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়াবহ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্ষণের মত ঘৃণিত অপকর্মের সেঞ্চুরিও হয়েছে। যা কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র অঙ্গনকে অপবিত্র করে ক্ষমতাসীন দলের ছত্র ছায়ায় বুক উচিয়ে ধর্ষণের স্বীকারোক্তি ও করেছে। সকল তখ্য প্রমাণিত হলেও বিচার নামের সে প্রশাসনিক প্রয়োগ ও বাস্তবতা দেশের মানুষ দেখতে পায়নি।
দিন বদলের পালাক্রমে ধর্ষণের মাত্রা বাড়তে বাড়তে কোন অঙ্গনই অপবিত্র হতে বাদ যায়নি। সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে“শিক্ষাঙ্গনে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্বামীর সামনেই বহিরাগত দূর্বৃত্তদের দ্বারা গণধর্ষণের শিকার শিক্ষিকা। আরো একটি সংবাদে বলা হয়েছে -পুলিশের মহিলা কনস্টেবল সহকর্মী দ্বারা ধর্ষণের শিকার।
এছাড়া প্রতিনিয়ত ধর্ষণের সংবাদ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মূলত যে কথাটি বলা দরকার তাহলো-ধর্ষণ এ যাবত বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন রকম হয়েছে।
কিন্তু স্বামীকে আটকে রেখে শ্রেনী কক্ষে শিক্ষিকাকে ধর্ষণ এমন সংবাদেরও ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। একজন সম্মানিত স্কুলের শিক্ষিকা নিজ প্রতিষ্ঠানে কতটুক সম্মানিত। তা আমরা সবাই অবগত আছি।
নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেনীকক্ষে সমাজের নীচু মানুষেরা যে গনধর্ষণের মত ঘটনা ঘটালো তা আবার স্বামীকে বেঁধে রেখে দেশে এমন ঘটনা এর আগে অর কখনও শোনা যায়নি।
এমনকি ছাত্রী ধর্ষণ বা এ জাতীয় শিক্ষক-ছাত্রীর মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা প্রত্রিকাঙ্গনে পাওয়া যায়। কিন্তু একজন শিক্ষিকা ধর্ষণের যটনা বিরল। তবে এটুকু বিষয় ভাবতে হবে মানুষের মেজাজ রুচি ও পশুত্ব কোন পর্যায়ে গেলে একজন শিক্ষিকাকে তারই স্কুলে শ্রেনীকক্ষে ধর্ষিতা হতে হয়।
এখানেই অনুধাবন করার বিষয় হলো যে আমরা কোন মগের মুল্লকে বাস করছি যে অন্যায় শুধু ক্রমানুসারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিরোধের কোন ব্যাবস্থা নেই। সমালোচনা আছে কিন্তু ভালো কোন নির্দেশনা বোদ্ধাদের কাছ থেকে আসছেনা। কোথাও যেন নারীর নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই।
একজন মেয়ে শিশু তার আপনজনদের কাছে নিরাপদ নয়। শিক্ষকের কাছে ছাত্রীর নিরাপত্তা নেই। সহকর্মীর কাছে সহকর্মী নিরাপদ নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মস্থল বাসা বাড়ীতে বাস রেল নৌ-যান ও পথে ঘাটে দোকান শোরুম কোথাও নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই।
এমনকি বর্তমান অবস্থা অনুসারে আপন জনদের কাছেও নিরাপত্তার আশা করাটা বোকামি। সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে ২ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছরের বাড়ত্বের রমণীও এ জঘন্য অপকর্মের শিকার হতে হয়েছে।
কয়েকদিন আগে বগুড়ায় মা ও মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে মায়ের সামনেই মেয়েকে গণধর্ষণ করল। পরে দুজনকেই মাথার চুল ন্যাড়া করে ছেড়ে দেয় জানা যায় সে দলনেতা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ক্যাাডার। তাকে কিছুই বলা যাবেনা নাম তার তুফান।
যাহোক জনগণের চাপে ও মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেদনের প্রেসারে প্রশাসন একপর্যায় তুফানকে আটক করে জেল হাজতে পাঠালেও সেখানে সে জামাই আদরে মাদক সেবন করে যাচ্ছে। তার সার্বিক সহযোগীতায় তথা পুলিশ প্রশাসন যখাযথ ভূমিকা রাখছে।
পত্রিকান্তরে জানা গেছে তুফান রীতিমত জেলে বসেও মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবন করে যাচ্ছে। যা হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায় কিন্তু প্রশাসন রাজনেতিক ভাবে তার এ অপকর্মের ব্যাপারে একটু ও বিচলিত নন।
এভাবে সমাজের তুফান তাদের অপকর্ম ঢাকতে বিভিন্ন রকম পন্থা ও বিকল্প পথ খুজে নিচ্ছে। অথচ প্রশাসন এসব ব্যাপারে একদম নিরব। তুফানদের অপকর্মের তুফানে সমাজে পংকিলতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।
যার ফলে শুধুই হাহাকার আর্তনাদ আর বিস্ময় প্রকাশ ছাড়া ফলাফল কিছু হবে বলে আশা করা যায়না। এর আগে গত বছর কুমিল্লার ভিকটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মেধাবি ছাত্রী কুমিল্লা সেনানীবাসের এমন এক জায়গায় ধর্ষিতা হয়ে লাশ হতে হলো যেখানে সাধারন মানুষের আনাগোনা সম্বব নয়।
অথচ আজও তার সঠিক তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করা হয়নি। প্রশাসন এ ব্যাপারে একদম নিরব। এ রকম অগনিত ঘটনা শুধুই ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। যার সঠিক রিপোর্ট কোনদিন প্রকাশ পাবেনা। বিচার ও হবার নয়।
এভাবে রীতু-মীতু খাদিজাদের ভাগ্যে যা হবার তাই হয়েছে। বিচার নামের সোনার হরিণ শুধুই প্রহসন হয়ে আছে। বিচার কি এ শিক্ষিকার হবে।
পত্রিকান্তরে জানা গেছে স্কুলের কক্ষে আটকে রাখা তার স্বামী রাগে ঘৃণায় সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেছে। এছাড়া সব চেয়ে মজার বিষয় হলো ডাক্তারি রিপোর্ট বলা হয়েছে ধর্ষিতা শিক্ষিকা ধর্ষণের শিকার হয়নি।
অথচ ৬ জন ধর্ষক তাকে গণধর্ষণ করে মরাত্বক অসুস্থ করেছে এবং ব্যাপারটি উক্ত শিক্ষিকা স্পষ্ট ভাবে থানায় জাবনবন্দীতে সব বলেছে।
কিন্তু হাসপাতালের বা ক্ষমতাসীন লোকেরা ডাক্তারি রিপোর্টটা ও মিথ্যা করে উপস্থাপন করল। এ ব্যাপারে শিক্ষিকা নিজেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এমন জঘন্য মিথ্যাচার করে হাসপাতালে কর্তৃপক্ষও শেষ পর্যন্ত সত্যটাকে কিভাবে মিথ্যায় রুপান্তর করলো তা ভাবতেও অবাক লাগছে। এ কোন সামজে আমরা বসবাস করছি। যেখানে মিডিয়ার বিভিন্ন শাখায় সমানভাবে প্রচারিত হয়েছে তারই স্বামী জলজ্যান্ত স্বাক্ষী।
স্বাক্ষী এ সমাজের মানুষ, স্বাক্ষী স্কুলের অনেকে। কিন্তু একজন অসহায় শিক্ষিকার পাশে দেশের প্রশাসন হাসপাতাল কেউ সত্য তথ্যকে ও অস্বীকার করে মিথ্যা জঘন্যতা চাপিয়ে দিচ্ছে।
মনে হচ্ছে প্রশাসন ঠুটো জগন্নাথ। তাদের কিছুই করার নেই একদম নির্বিকার। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। ধর্ষণ মামলায় ৬ জন ধর্ষকের মধ্যে প্রধান ধর্ষককে পুলিশ গ্রেফতার করলেও বাকীদের ধরার জন্য পুলিশের কোন তাড়া নেই।
বগুড়ায় মা ও মেয়েকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ শেষে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনা শেষ হতে না হতে তারপর বরগুনার শিক্ষিকা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ যে ধর্ষকরা সাংঘাতিক ভাবে বেপোরোয়া হয়ে একের পর এক ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। শিশু- কিশোরী, গার্মেন্ট শ্রমিক, কর্মজীবী নারী ও গৃহবধু নারী পুলিশ সদস্য কেউ বাদ যাচ্ছেনা ধর্ষকদের থাবা থেকে।
যাকে যেখানে পাচ্ছে হামলা চালাচ্ছে ধর্ষকেরা। ছোট মেয়েদের খাবারের লোভ দেখিয়ে, নারীদের চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে এবং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দূর্বৃত্তরা পাশবিক নির্যাতন করছে।
কোথাও একা আবার কোথাও দলবেধে গণর্ধষণ করা হচ্ছে। আর নির্জন স্থানের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ধর্ষণকারীরা গণপরিবহন ও বেছে নিচ্ছে।
তারা চলন্ত বাস ট্রাক মাইক্রোবাস ও নৌকাতে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। অবস্থা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে যে পরিবারের সদস্যদের হাতে ও মেয়ে ভাবী ভাগ্নি ও বোনরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে।
শিক্ষা অঙ্গনে শিক্ষক ও তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারীগণ নিজেদের বিকৃত যৌন লালসা মেটাতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছে। অভিজ্ঞজনেরা বলছেন প্রতিদিনই দেশের কোথা ও না কোথাও ধর্ষণ গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।
ঘরে বাইরে নারী ও শিশুরা কোথাও নিরাপদ নয়। নারী শিশু ও কিশোরির ওপর পাশাবিকতার ঘটনা গুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়। রাতে কাজ শেষে বাড়ী ফেরার পথে কর্মজীবী নারী, স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে মেয়ে শিক্ষার্থী, রাতে ঘরের বাইরে প্রাকৃতিক কাজ করতে যাওয়া গৃহিণী এ ধরনের ঘটনার শিকার হচ্ছে।
আর এ নারীদের অত্যাচার করে কখনোও তাদের হত্যা করা হচ্ছে আবার কখনো আহত করা হচ্ছে বা আহত অবস্থায় গাড়ী থেকে নির্দয়ভাবে সড়কে ফেলে দেয়া হচ্ছে। ঘরে বাইরে তো বটেই এমনকি ঘরের ভিতরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে গৃহিণীদের ধর্ষণ করছে।
নারী নির্যাতন তথা ধর্ষণের এ ধারা সারাদেশে মারাত্বক মহামারি হিসেবে রুপ নিয়েছে। দেশের সচেতন জনতা ধর্ষণ বিষয়ক প্রতিবাদও প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন ব্যানারে কথা বলে বা প্রতিবাদ জানালেও কোন রকম থেমে থাকছেনা।
পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই মনে হচ্ছে যে গত কালের চেয়ে আজকে ধর্ষণের খবর চিত্র বেশী দেখা যাচ্ছে। এ ভাবে বিষয়টি যেন প্রতিদিনের একটি সদরণ ধারাবহিক হয়ে দাড়িয়েছে টেলিভিশনের সুইচ অন করলেও একই বার্তা বার বার পরিবেশিত হয়।
এখন সবার প্রশ্ন আমরা কোন সভ্য সামজে বাস করছি? যেখানে জন্ম দিনের দাওয়াত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে বন্ধুর সাথে হোটেলে নাস্তার জন্যে গেলেও জঘন্য এ ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে এ কোন বাংলাদেশ যেখানে পারিবারিক ভাবে মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া হয়।
অভিজ্ঞ জনদের দৃষ্টিতে ধর্ষণ ক্রমভাবে মহামারি আকারে বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো:-
১. সামাজিক ভাবে এর প্রতিরোধ যথার্থভাবে করা হয় না।
২. প্রশাসনিক ভাবে যথাযথ বিচার করা হয়না।
৩. ধর্মীয় মূল্যবোধ না থাকা।
৪. পারিবারিক ভাবে তাদের মৌলিক শিক্ষা না দেয়া।
৫. দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকা।
৬. ন্যায় বিচার পাওয়ার আর্থিক ও সামাজিক বাধা
৭. সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে শিক্ষার যথেষ্ট অভাব।
উপরোল্লেখিত বিষয়গুলি বিবেচনা করে কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে হয়তো বা সামাজিক ভাবে প্রতিকার করা সম্বব হবে।
১. ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত করা।
২. সামাজিক সচেতনতা বোধ।
৩. বিদ্যমান আইন সংস্কার বা নতুন আইন প্রণয়ন করা।
৪. ঘটনার শিকার নরীকে যথাযথ সহায়তা প্রদান
৫. দায়ী ব্যাক্তিকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা
৬. প্রশাসনকে আরো তড়িৎ গতিতে বিচার ব্যবস্থা করা।
৭. সমাজে সর্বস্তরে জনগনকে সচেতন করার জন্য যথাযথ কাউন্সিলিং করা।
সর্বশেষ যে কথাটি বলা দরকার সেটা হলো সমাজে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে একটা প্রশ্নবিদ্ধ হতাশার দেয়াল সৃষ্টি করে রাখছে। মহামারির ন্যায় সমাজে ধর্ষণ নামক ছোয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এর প্রতিকার না হলে আমাদের সমাজে সকল পর্যায়ে আরো পাপাচার অশান্তি ভয়াবহ রুপ দেখা যাবে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা কর্মস্থলে যে হারে ধর্ষণের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আগামীতেও যদি এমন থাকে তাহলে আমরা কোথায় বাস করবো ? তাহলে সভ্য সমাজ ব্যবস্থার কি এটাই বাস্তব রুপ?
এসব ব্যাপারে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যারা পরিচালনা করে থাকে তাদের এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবী। প্রশাসনিক ভাবে যারা দায়িত্ব পালন করছে তাদেরকে আরো বেশী সচেতন হতে হবে।
এছাড়া নিরাপাত্তা কর্মী হিসেবে যারা দেশের গুরু দায়িত্ব পালন করছেন তাদেরকে ও বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। তাহলে দেখা যাবে যে স্কুল কলেজের শিক্ষক মসজিদের ইমাম সমাজের প্রভাবশালী মহল বিষয়গুলি নিয়ে কথা বললে আরো যথাযথ কাউন্সিলিং করলে হয়ত ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। এজন্য সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আশা দরকার।
লেখক: কলেজ অধ্যক্ষ, লেখক ও গবেষক





