তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হলো বিএনপির লংমার্চ কর্মসূচি। কিছু দিন আগেও বোরো মৌসুমের পানি না পেয়ে দিশাহারা হয়ে উঠেছিল তিস্তা ব্যারাজ এলাকার চাষিরা। কিন্তু হঠাৎই কয়েক সপ্তাহ ধরে করে পানির প্রবাহ বাড়ছে তিস্তায়। এক মাস আগেও যেখানে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টের তিস্তা ব্যারাজের সেচখাল পুরোপুরি শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গতকাল সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তা পানিতে ভরা।
এলাকাবাসী জানায়, গত ১৩ এপ্রিল থেকে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের গেট দিয়ে কিছু পানি আসছে। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত পানি বাড়লেও পরে আবার তিস্তা ব্যারাজের সেচখালে পানি কমতে থাকে। গতকাল ব্যারাজ পয়েন্টে পানি ছিল ৮৩০ কিউসেক। তিস্তা ব্যারাজের সব গেট বন্ধ থাকায় আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া ওই পানি সেচখালে সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398148521.jpg[/img]
স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে সোচ্চার বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনের মুখেই হয়তো ভারত সরকার কিছুটা পানি ছেড়েছে। তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পানি উন্নয়ন বোর্ডের।
সাম্প্রতিককালে বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী তিস্তার পানিপ্রবাহ এবার ১৯৫৮ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ফলে তিস্তা নদীর সেচ প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর- উত্তরের এই তিন জেলার হাজার হাজার একর কৃষিজমি পানির অভাবে চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। তিস্তার পানিশূন্যতার কারণে তিস্তাপারের কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। নদীপথে যারা যাতায়াত করত, পানি শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের এখন ঘুরপথে হেঁটে শহরে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এ মৌসুমে তিস্তার পানি কমতে কমতে দাঁড়িয়েছিল ৪৫০ কিউসেকে। অথচ এ নদীতে স্বাভাবিকভাবে গড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কিউসেক পানি থাকা প্রয়োজন। তবে গত ১৩ এপ্রিল থেকে ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বাড়তে শুরু করে। এতে একপর্যায়ে পানির পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় হাজার কিউসেকে। এ অবস্থা চলে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। এ বছর শুকনো মৌসুমে ব্যারাজ এলাকায় সর্বনিম্ন ৪৫০ কিউসেক পানি থাকলেও গতকাল বিকেলে ৮৩০ কিউসেক পানি রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
নীলফামারী ডিমলা উপজেলার কোলঝাড় গ্রামের চাষি আমিনুর বলেন, গত কয়েক দিন ধরে খালে পানি ঢুকছে সেচের শেষ সময়ে। তাও আবার দুই দিন থেকে কমতে শুরু করেছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে এখনই ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. এনামুল হক বলেন, ভারত তিস্তার পানি সেচের কাজে ব্যবহার করার কথা বলে সে দেশের মহানন্দায় নিয়ে যাচ্ছে। এটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনই ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে তিস্তার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, তিস্তা নদীতে সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে পানি কম থাকে। এরপর মার্চে পানি বাড়তে থাকে। এবার ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত লম্বা সময় ধরে পানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যারা চাষাবাদ করে আসছে তারা অগভীর নলকূপ দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে পানি নেওয়ার ব্যবস্থা রাখেনি। ফলে কৃষকদের আরো সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
তিস্তা অঞ্চলে কর্মরত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, এখন তিস্তায় পানি যে অবস্থায় রয়েছে, তাতে তিস্তাকে কোনো নদী বলা যাবে না। একে এখন মরুভূমি বলতে হবে। কারণ এখানকার জমি এখন নদীপৃষ্ঠের চেয়ে ওপরে উঠে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে মরুভূমি হতে বাধ্য।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল একটি দীর্ঘস্থায়ী মরুকরণের দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বলেন, তিস্তার পানি এভাবে প্রতিবছর কমতে থাকলে লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। আগামী ১০ বছর এভাবে তিস্তায় পানিস্বল্পতা চলতে থাকলে পানির অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে যাবে। তিস্তার দুই পাড়ের লোকজন চাষাবাদ করতে না পেরে মারাত্মক খাদ্য সংকটে পড়বে। তিস্তার পানিস্বল্পতা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলকেও প্রভাবিত করবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার জন্য আমরা ভারতের যৌথ নদী কমিশনের সঙ্গে সর্বশেষ ২০১০ সালের ১ মার্চ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক করেছি। এরপর আর কোনো বৈঠক হয়নি। আবার কবে বৈঠক হবে তাও বলতে পারেননি মীর সাজ্জাদ হোসেন।
২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে ওই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এরপর বাংলাদেশ বেশ কয়বার তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি ভারতের কাছে বিভিন্ন ফোরামে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে তুলেছে। তবে চুক্তির আগে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে ভারত।
সর্বশেষ গত মার্চ মাসে মিয়ানমারে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ড. মনমোহন সিং বলেছেন, নির্বাচনের আগে আর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তাই ভারতে আগামী মাসে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগে দৃশ্যত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে তেমন কিছুই করণীয় নেই বাংলাদেশের।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারাজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তার পানি মহানন্দা নদীতে (ভারত অংশ) নিয়ে যাচ্ছে ভারত। শুকনো মৌসুমে এই সংযোগ খাল থেকে তারা জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ ও কোচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে। ১৯৭৭ সালে তিস্তা নদীর ওপর ব্যারাজ, হেড রেগুলেটর ও ক্লোজার ড্যাম তৈরির পরিকল্পনা করে বাংলাদেশ। বিষয়টি নজরে আসার পরপরই ভারত জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ৯২১ দশমিক ৫৩ মিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করে।
[b]ঢাকা, ২২ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// এনএস[/b]
মতামত
বিএনপির লংমার্চ: শুকিয়ে যাওয়া তিস্তায় হঠাৎ পানি
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হলো বিএনপির লংমার্চ কর্মসূচি। কিছু দিন আগেও বোরো মৌসুমের পানি না পেয়ে দিশাহারা হয়ে উঠেছিল তিস্তা ব্যারাজ এলাকার চাষিরা। কিন্তু হঠাৎই কয়েক সপ্তাহ ধরে





