সম্প্রতি কওমী ধারার মাদরাসা শিক্ষার ‘দাওরায়ে হাদিস’ সনদকে স্নাতককোত্তর সমমান দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। অবশ্য এর আগে ২০০৬ সালে ৪ দলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে অনুরূপ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। সর্বসাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনটি যে কাকতালীয়ভাবে হয়েছে এমনটা মনে করার কোন সুযোগ নেই। কারণ, কাওমী ধারার শিক্ষার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। আর এ শিক্ষার অর্জনও বেশ সমৃদ্ধই বলতে হবে। যদিও সরকারি পর্যায়ে এ শিক্ষার কোন স্বীকৃতি ছিল না। কিন্তু কোন প্রকার সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও স্বীকৃতি ছাড়াই কওমী ধারার আলেমরা ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য যে খেদমত করে যাচ্ছেন তা বিশ্ব ইতিহাসে এক নজীরবিহীন ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাই এই ধারার শিক্ষাকে কোন ভাবেই উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। সঙ্গত কারণেই কওমী সনদের সর্বোচ্চ সমমান কাঙ্খিত ও যৌক্তিক। এতে কোন বিতর্ক থাকার সুযোগ নেই।

তবে কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রদান পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনাও কম নয়। কেউ কেউ আবার এই স্বীকৃতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। তাই সচেতন মহল বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছেন। তারা বলছেন, কওমী সনদের স্বীকৃতি ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’ এমনটা যেন না হয়। একই সঙ্গে কওমি মান যথাযথভাবে রক্ষা করে শিক্ষার্থীরা যেন দেশীয় ও আন্তজার্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পান সেটি নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন তারা। উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তারা বলছেন, কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে সেনাবাহিনী, প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। ইসলামের বিভিন্ন শাখায় উচ্চতর গবেষণা করছেন। বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা যাতে সেই সুযোগ পান তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে মান প্রদানে সদিচ্ছা ও যৌক্তিকতা প্রমাণিত হবে।

মূলত কওমি সনদের স্বীকৃতি অর্থই ইসলামী শিক্ষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এটি কওমী ধারার আলেমদের বড় অর্জন বলাই যৌক্তিক। কিন্তু এই স্বীকৃতির পথচলা মোটেই সহজসাধ্য হবে বলে মনে হয় না বরং তা হবে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা। তাই সরকারের এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে কওমী শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে এবং দেশ, জাতি ও ইসলামের কল্যাণে তা কীভাবে কাজে লাগানো যায় তার দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য কওমী ধারার কারিকুলাম আরও গতিশীল ও সময়োপযোগী করা জরুরি। একই সঙ্গে এটা নিয়ে যাতে আর কেউ টালবাহানা করতে না পারে সেদিকেও নজর রাখতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারকেও আন্তরিক ও ইতিবাচক হতে হবে। মান প্রদানের বিষয়ে ছোটখাট বিতর্ক থাকলেও সার্বিকভাবে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলেই মনে হয়।

এমনকি মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে যেসব মহল নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করেন তারাও এই ধারার শিক্ষাকে সংস্কারের তাগিদ দিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন। কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেয়ায় খুশি আলিয়া মাদ্রাসার আলেমরাও। তারা মনে করেন, এই স্বীকৃতির ফলে সমাজে পিছিয়ে পড়া বিশাল একটা জনগোষ্ঠী মূল স্রোতধারায় আসবে এবং দেশ, জাতি ও সমাজের কল্যাণে অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। তবে এই স্বীকৃতি যেন শুধু কাগজে না হয় সেদিকে কর্তৃপক্ষ ও কওমি আলেমদের নজর রাখতে হবে। বিষয়টি নিয়ে কোন পক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে কী না সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মান ঘোষণার পর থেকে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে কওমি মাদরাসা। সরকারি শিক্ষাক্রমের সাথে কওমি পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্যের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে আলিয়া মাদরাসায় পড়ুয়ারা তাদের পাঠ্যতালিকার সাথে কওমি পাঠ্যতালিকার সামঞ্জস্যতার বিষয়টিও কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। সাধারণ শিক্ষিতরা এই শিক্ষার মান ও স্তর বিন্যাস সম্পর্কে অবগত হতে আগ্রহী। সার্বিকভাবে বিষয়টি নিয়ে কারও আগ্রহের কমতি নেই। আর এমনটিই স্বাভাবিক।

কওমী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কওমি মাদরাসায় যে পাঠ্যক্রম অনুসরণ হয় তা হলো এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন পাঠ্যক্রম। যে পাঠ্যক্রমের ওপর পুরো উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। যাকে বলা হয় ‘দরসে নেজামি’ তথা ‘নেজামি পাঠ্যক্রম’। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে মুসলিম শাসকদের আমলে পরিচালিত মাদরাসাগুলোতে এই পাঠ্যক্রমই প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে হাজার হাজার মাদরাসা ধ্বংস হওয়ার পর এখানকার উলামায়ে কেরাম ১৮৬৬ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই একমাত্র জনগণের দান-সদকায় পরিচালিত এই কওমি মাদরাসার ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাতেও প্রাচীন এই ‘নেজামি’ পাঠ্যক্রমকেই বেছে নেওয়া হয়। কারণ, এই পাঠ্যক্রম ছিল শত শত বছরের পরীক্ষিত। মুসলিম বিশ্বের একটি বিশাল ঐতিহ্য এই পাঠ্যক্রমকে ঘিরেই।

তারা দাবি করছেন, আলিয়া মাদরাসায়ও প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নেজামি এই পাঠ্যতালিকাই অনুসরণ করা হয়। তবে তাতে কাটছাঁট করা হয় তুলনামূলক বেশি। এতে কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি অন্যান্য পার্থিব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে কারণে যদিও এতে শিক্ষার মান উন্নত; কিন্তু শুধু ইসলামি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমানুষের আস্থা ও ভক্তি অর্জন করতে তারা ব্যর্থই হয়েছে। এমনকি আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদে বেশির ভাগই সরকারি সনদ গ্রহণ করার উদ্দেশ্য থাকায় আলিম বা ফাজিল পাস করার পর সাধারণ শিক্ষার দিকেই ধাবিত হয়ে যায়।

তারা আরও দাবি করছেন যে, কওমি মাদরাসা ও আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যতালিকার ধারা এক হলেও চিন্তা-চেতনায় বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। কওমি মাদরাসার শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবিষয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আবার কিতাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কওমি মাদরাসার পাঠ্যতালিকা প্রণয়নের সময় যেমন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সেরা কিতাবটি নির্বাচন করা হয়, তেমনি লেখকের তাকওয়া-পরহেজগারীর প্রতিও সমান দৃষ্টি রাখা হয়। কারণ ইসলামের দিকনির্দেশনা হলো, কোনো কিছু শিখতে হলে দেখেশুনে উস্তাদ নির্বাচন করা। তাই কওমি মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে এমন কোনো লেখকের কিতাব অন্তর্ভূক্ত করা হয় না, যে লেখকের দ্বীনদারী-তাকওয়া-পরহেজগারীতে সামান্যও বিতর্ক থাকে। সে কারণে তাঁরা যে কিতাব পড়াবেন লেখকের মূল কিতাবটিই পড়াতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আলিয়া মাদরাসায় বিভিন্ন সংকলক কর্তৃক একটি কিতাবকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে পড়ানো হয়। যার কারণে মূল কিতাব থেকে ছাত্ররা অনেক দূরে থাকে। অনেক সময় পুরো কিতাব শেষ করার পরও ছাত্ররা মূল কিতাবটির দেখা পায় না।

কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বেশ জমে উঠেছে। আর এর যৌক্তিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করার মত নয়। আলীয়া ধারার শিক্ষা সাধারণ শিক্ষার সমমান পেয়েছে কালের দীর্ঘ পরিক্রমায়। ১৯৮৫ সালে আলিয়া মাদরাসার দাখিল শ্রেণিকে মাধ্যমিকের সমমান দেয়ার পর ১৯৮৭ সালের আলিম শ্রেণি স্বাভাবিকভাবে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির সমমান পায়। কিন্তু ব্যত্যয় ঘটে ফাযিল ও কামিল শ্রেণির ক্ষেত্রে। পেছনের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালের ফাযিল ও ১৯৯১ সালের কামিল যথাক্রমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান পাওয়ার কথা।

এমননি মাদরাসা শিক্ষার ফাযিল শ্রেণিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যায়ে কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু ফাযিল ও কামিল শ্রেণির পরীক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে সরকার নিয়ন্ত্রিণ বোর্ড হওয়ার পরও উভয় শ্রেণিকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির সমধান দেয়া হয়নি বা যৌক্তিক মনে করা হয়নি। আর এ বিষয়ে কেউ প্রশ্নও তোলেনি। তাই সরকারের অনুমোদনহীন কওমী বোর্ডের অধীনে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান ঘোষণায় প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বলেই মনে হচেছ। সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষরা যদি আন্তরিক হতেন তাহলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মান দেয়াটায় ছিল অধিক যুক্তযুক্ত এবং এ মান বাস্তবায়নের জন্য একটি কওমী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও অনস্বীকার্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বোধ অনেকটা আবেগেরই আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যা কাঙ্খিত নয়।

প্রশ্ন উঠেছে কওমী মাদরাসার কারিকুলাম ও পঠনের সময়সীমা নিয়েও। সনদের সরকারি স্বীকৃতি মানেই হলো সকল ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা। কিন্তু কওমী মাদসায় যে কারিকুলাম বা দরসে নেজামী অনুসরণ করা হয় তা কী সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ? উত্তরটা নেতিবাচকই হওয়ার কথা। আর সাধারণ ও আলিয়া মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করতে ১৭ বছরের সময় প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে কওমীদের একটি পক্ষ তাদের পাঠ্যক্রমকে ১৭ মেয়াদি উল্লেখ করেছেন। তারা দাবি করছেন, প্রাথমিক পর্যায় (মারহাতুল ইবতেদায়িয়্যাহ) ৫ বছর, নিম্ন মাধ্যমিক (মুতাওসসিতা) ৩ বছর, মাধ্যমিক (সানোবিয়্যা আম্মাহ) ২ বছর, উচ্চ মাধ্যমিক (সানোবিয়্যা খাসসাহ্) ২ বছর, স্নাতক (মারহাতুল ফজিলাহ) ৪ বছর ও ১ সময় লাগে স্নাতকোত্তর (মারহালাতুত তাকমীল) করতে। সব মিলয়ে কওমিতেও ১৭ বছর সময় লাগে। আর কওমির মান কোনোভাবেই সাধারণ শিক্ষার মানের চাইতে কম হবে না, বরং বেশি হবে। এমনটিই দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষটি।

কিন্তু কওমী শিক্ষাবোর্ড বেফাক সূত্র থেকে পাওয়া প্রথম শ্রেণি থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত শ্রেণিগুলো হচ্ছে- ১. ইবতেদায়ি ২. তাইসির ৩. মিজান ৪. নাহুমির ৫. হেদায়েতুন্নাহু ৬. কাফিয়া ৭. শরহে জামি ৮. শরহে বেকায়া ৯. হেদায়া/জালালাইন ১০. মেশকাত ও ১১. দাওরায়ে হাদিস। এই দশটি শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা আবার পাঁচটি ভাগে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পরীক্ষাগুলোর নাম হচ্ছে- ইবতেদায়িয়া, মুতাওয়াসসিতা, সনোবিয়্যা, ফজিলত ও দাওরায়ে হাদিস। তবে কোনটা মাধ্যমিক, কোনটা উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা কোনটা অনার্স পর্যায়ের পরীক্ষা সে ব্যাপারে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি বেফাক সংশ্লিষ্টরা। মূলত বর্ণিত কারিকুলামে একেকটি বিষয়কে একেকটি শ্রেণি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যা মূল ধারার সাধারণ ও মাদরাসা শিক্ষার সাথে মোটেই সামঞ্জস্যশীল নয়।

আরেক পক্ষের দাবি মতে, কওমি মাদরাসার শিক্ষাক্রমটি মূলত ১৬ বছরের। শিশু শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অত্যন্ত সুন্দর এবং অনন্য অবকাঠামোতেই এই শিক্ষাক্রম প্রণীত। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছাত্রদের বয়স বিবেচনায় কয়েক বছর কমিয়েও পাঠ্যক্রম তৈরি করেছে, যা একান্তই তাদের স্বতন্ত্র বিষয়। তা কওমি মাদরাসার মূল পাঠ্যক্রম নয়। যেমন কেউ হাফেজে কুরআনের কথা বিবেচনা করে ইবতেদায়ী পাঠ্যক্রমে দুই বছর কমিয়ে মোট ১৪ বছরের পাঠ্যক্রম তৈরি করেছে। আবার কেউ সাধারণ শিক্ষিতদের কথা মাথায় রেখে সেটাকে ১২ বছরে এনেছে। এগুলো ভিন্নভাবে পড়ানো হয়। কিন্তু মূল পাঠ্যক্রম ১৬ বছরের।

এতে কোনো সংগত কারণ ছাড়া কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। বরং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ১৬ বছর লেখাপড়া করেই একজন ছাত্রকে দাওরায়ে হাদিস পাস করতে হয়। সুতরাং দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মান দেওয়ার মধ্যে স্তর বিন্যাস এবং শিক্ষার বয়সের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার দুর্বলতা কওমি মাদরাসাগুলোর আছে বলে মনে হয় না। তাদের বর্ণিত শ্রেণিগুলো হচ্ছে, শিশু শ্রেণি, প্রথম শ্রেণী (প্রাথমিক ১, দ্বিতীয় শ্রেণি (প্রাথমিক ২), তৃতীয় শ্রেণি (প্রাথমিক ৩), চতুর্থ শ্রেণি (প্রাথমিক ৪), পঞ্চম শ্রেণি (প্রাথমিক ৫), ষষ্ঠ শ্রেণি (নিম্ন মাধ্যমিক ১), সপ্তম শ্রেণি (নিম্ন মাধ্যমিক ২), অষ্টম শ্রেণি (নিম্ন মাধ্যমিক ৩), নবম শ্রেণি (মাধ্যমিক ১), দশম শ্রেণি (মাধ্যমিক ২), একাদশ শ্রেণি (উচ্চ মাধ্যমিক ১), দ্বাদশ বর্ষ (উচ্চ মাধ্যমিক ২), ত্রয়োদশ শ্রেণি (স্নাতক ১), চতুর্দশ শ্রেণি (স্নতক ২), পঞ্চদশ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস (স্নাতকোত্তর)। কিন্তু উল্লেখিত শ্রেণিগুলোতে কোন পঠন মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি।

তারা আরও দাবি করছেন, এই পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করার পর অনেকে আরো উচ্চশিক্ষার জন্য আগ্রহী হয়ে থাকেন। তাদের জন্য রয়েছে বিভাগভিত্তিক উচ্চাশিক্ষার ব্যবস্থা। যেমন- ইসলামি আইন শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য ইফতা বিভাগ (তাখাসসুস ফিল ফিকহিল ইসলামী)। হাদিস ও হাদিসের নীতি শাস্ত্রের জন্য হাদিস বিভাগ (তাখাসসুস ফি উলূমিল হাদিস)। তাফসির ও তাফসিরের নীতি শাস্ত্রের জন্য তাফসির বিভাগ (তাখাসসুস ফি উলূমিল কুরআন)। তাজবিদ ও তাজবিদের নীতি শাস্ত্রের জন্য তাজবিদ বিভাগ (তাখাসসুস ফী তাজবীদিল কুরআন)। ইসলামি অর্থনীতির জন্য ইকতিসাদ বিভাগ (তাখাসসুস ফি ফিকহিল মু’আমালাত ওয়াল ইকতিসাদিল ইসলামি)। আরবি সাহিত্যের জন্য কিসমুল আদব (তাখাসসুস ফি আদবিল আরবি)। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের জন্য বাংলা সাহিত্য ও ইসলামী গবেষণা বিভাগ। অনেক জায়গায় আলাদা সাংবাদিকতা বিভাগও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মূলত বেসরকারিভাবে পরিচালিত কওমি মাদরাসাগুলো এতোদিন পরিচালিত হয়ে আসছিলো তাদের নিজস্ব বোর্ডের অধীনে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বোর্ড হিসেবে পরিচিত বেফাক। প্রথম সারির আরও চারটি বোর্ড থাকলেও অঞ্চলভিত্তিক বোর্ডের সংখ্যা দুই ডজনেরও বেশি। একটির সিলেবাসের সঙ্গে মিল নেই অন্যটির। এর মধ্যে আবার শর্ট কোর্স বলেও একটা কোর্স চালু আছে কওমি মাদরাসায়। সে কোর্সে পড়ে দাওরায়ে হাদিস পাস করা যায় ৭ বছরে। ফলে মাস্টার্সের মান দেয়া হলেও মাস্টার্স পাসের সময়ের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস পাসের সময়ের বড় দূরত্ব দেখা যায়।

অপরদিকে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু এসএসসি পাস করতেই সময় লাগে ১০ বছর। এইচএসসিতে ২ বছর ও অনার্স করতে ৪ বছর সময় লাগে। মাস্টার্সের ১ বছর নিয়ে মোট ১৭ বছর পার করতে হয় একজন শিক্ষার্থীকে। ১৭ বছরের পড়াশোনার সঙ্গে ১০ বছর কীভাবে তুলনা করা যায় সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, মান যেহেতু একই, সময়টাও একই হওয়া উচিত।

কাওমী ধারার কারিকুলাম পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে, যেহেতু কাওমী শিক্ষা বা বোর্ডগুলোর উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই তাই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার কারিকুলাম মোটেই সুবিন্যস্ত হয়নি। দেশের আলিয়া ধারার মাদরাসা শিক্ষার জন্য এখ পর্যন্ত একটি বোর্ড থাকলেও কওমী ধারার মাদরাসা শিক্ষার বোর্ড ২ ডজনেরও বেশী। আর বোর্ডের আধিক্যতেও দোষের কিছু নেই। কিন্তু এসব বোর্ডের উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ বা কওমীর কেন্দ্রীয় কোন কর্তৃপক্ষ না থাকায় অভিন্ন কারিকুলাম প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। আর পঠনের সময়সীমা নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি। দাওরায়ে হাদিস সনদ লাভে সর্বোচ্চ ১৭ বছর থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ৭ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্রে সময়সীমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যা বাস্তব সম্মত বলে মনে হয় না।

তাই সবার আগে সরকারের নিয়ন্ত্রণেই হোক বা কওমীর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনেই হোক এ শিক্ষার কারিকুলামকে ঢেলে সাজিয়ে এক ও অভিন্ন করার দরকার। সাধারণ শিক্ষার সাথে সঙ্গতি রেখে পঠনের সময়সীমাও নির্ধারিত হওয়া জরুরি। দাওয়ারে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও এ শিক্ষার মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরের বিষয়টি এখন বেশ অষ্পষ্ট। এ বিষয়েও স্পষ্টতা আনা দরকার। কওমী শিক্ষায় ইসলামী শিক্ষার মান নিয়ে কোন পক্ষেরই তেমন কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রশ্ন আছে সাধারণ বিষয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে। বিশেষ করে মাতৃভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজী শিক্ষার মান নিয়ে। তাই কওমী শিক্ষার্থীরা যাতে মাতৃভাষা ও ইংরেজী ভাষায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন এজন্যই পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী ও গতিশীল করা উচিত।

আমরা একথা বলছি না যে, কওমী শিক্ষার শিক্ষার্থীদের উপর আলিয়া নেসাবের শিক্ষার্থীদের মত অপ্রয়োজনীয় বিষয় চাপিয়ে দিয়ে কওমী ধারার শিক্ষার স্বকীয়তা বিনষ্ট করা হোক। কিন্তু যতটুকু না হলেই নয় ততটুকু তো অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের উপর চাপ কমানোর জন্য উর্দ্দু ও ফার্সীর ভাষার বিষয়টি পূনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। মূলত কওমী ধারার শিক্ষার উদ্দেশ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতি, ভূগোল, নৃবিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী তৈরি করা নয় বরং একনিষ্ঠ আলেম তৈরি করা যারা তাদের অর্জিত ইলম ও আমলের মাধ্যমে ইসলামী আদর্শ ও ঐহিত্যকে সমুন্নত রাখতে পারেন। মূলত কওমী শিক্ষা হচ্ছে ওহীর শিক্ষা বা আধ্যাত্বিক শিক্ষা। তাই সাধারণ শিক্ষার সমমানের অজুহাতে তাদের উপর এমন কোন বোঝা চাপানো উচিত হবে না যা কওমী ধারার শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে ব্যহত করে।
সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)