চার বছরের জন্য শেষ হলো বিশ্বকাপ ফুটবল। বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ ব্রাজিলের সমর্থক। শুনে অবাক হয়েছি, রাস্তায় বলাবলি হচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া নাকি একত্রে বেহেশতেও যাবেন না। অথচ দুজনই ব্রাজিলের সমর্থক। সেমিফাইনালে ব্রাজিল জার্মানির কাছে গোল খেয়েছিল, প্রথমার্ধেই পাঁচটি। সর্বমোট ৭-১ গোলে শেষ হয়েছিল। তাই ফাইনাল কি হয়, কি হয়! নানামুণির নানা চিন্তা ছিল। কিন্তু না, বিশ্বকাপ ফাইনাল বিশ্বকাপের মতোই হয়েছে। অসাধারণ এক খেলায় জয়-পরাজয় হয়েছে। আমি খেলা দেখেছি কিন্তু কোনো দলের সমর্থক ছিলাম না। আমার বাড়ি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল দুই ভাগে বিভক্ত। দীপ আগাগোড়াই আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই তার মা তার দিকে এবং আমার বাড়িতে আর্জেন্টিনাই বেশি, ব্রাজিল কম। ব্রাজিলকে ৭ গোল দেওয়ায় সেমিফাইনাল থেকে আমি জার্মানির দিকে ছিলাম। সেহরি সেরে অতিরিক্ত সময়ের খেলা দেখছিলাম। পাশে বড় মেয়ে কুঁড়ি বসেছিল। শেষের দিকে যখন জার্মানি গোল করে তখন সে লাফিয়ে ওঠে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুই কি জার্মানির পক্ষে? দারুণ উত্তেজনা নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’ খেলাধুলাতেই মানুষ আনন্দ ও কষ্ট পায় বেশি। হেরে গেলে যেমন অঝরে কাঁদে, তেমনি জিতলে মুহূর্তে আনন্দে ফেটে পড়ে। অমন আনন্দ আর কিছুতে পাওয়া যায় না। বড় একটি ভালো খেলা দেখার ভাগ্য হলো আমাদের। বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানাই। পরাজিত আর্জেন্টিনাও বিজয়ীর মতো খেলেছে, তাদের জন্যও রইল একবুক শুভ কামনা। তবে একটা কথা না বললেই নয়, এই ক’দিন ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে পৃথিবীজুড়ে হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি অনেক কম ছিল। শুধু গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণ না হলে সময়টাকে শান্তিময় বলা যেত। পবিত্র মাহে রমজানের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটা শান্ত। আর ফুটবলের কারণে আপনাআপনি অনেকটা খুন-খারাবি কমেছিল। রাত জেগে থাকার কারণে রাতের চোরেরা তেমন চুরি করার সুযোগ পায়নি। তবে কলমচোরদের ফেরায় কে? তারা তাদের কাজ অবিরাম করে গেছে। জানি না, রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত আগামী বিশ্বকাপ দেখতে পাব কি না? আয়ুতে কুলাবে কি না!
আজ ১৬ রমজান। দেখতে দেখতে রোজা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা সময় মতো চাঁদ দেখিনি, তাই এবার ২৯ রোজা হবে। রহমত-বরকতের মাস দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারপরই শুরু হবে রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা-বিক্ষোভ। ছেলেটির সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, বিশ্বের এক খ্যাতনামা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। তাকে ক্রিকেট বোর্ড শাস্তি হিসেবে ছয় মাস খেলা থেকে নিষিদ্ধ করেছে, দেড় বছর বাইরে খেলতে পারবে না, কোনো বিজ্ঞাপনে অংশ নিতে পারবে না। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, ‘এক লোক খুব অসুখে পড়েছিল। অনেক চিকিৎসা করেও রোগ সারাতে পারেনি। একদিন খুব নাম করা বৈদ্য আনা হয়। বৈদ্য মশাই সাধ্যমতো হাত-পা-আঙ্গুল-টাঙ্গুল টিপে-টুপে ঔষধপত্র দিয়ে পা বাড়াতেই কাতর কণ্ঠে রোগী বলল, ‘বৈদ্য মশাই, চিকিৎসা দিলাইন, ঔষধ দিলাইন, পথ্যি দিলাইন না?’ বৈদ্য ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ঠিক বলেছেন। ভুল হয়ে গেছে। আপনি সিদ্ধ চালের ভাত খাবেন না। আতপ হজম হবে না। উঠতে পারবেন না, বসতে পারবেন না, উপুড় হতে পারবেন না, চিৎ হবেন না, কাত হবেন না।’ শুনতে শুনতে রোগী চিৎকার করে ওঠে, ‘তাইলে আমি কিবা করমু?’ বৈদ্য অাঁতকে উঠে বলেন, ‘হায় হায়, কিবাও করতে পারবেন না। ওটাই যে আপনার সব থেকে বড় অসুখ।’ সাকিব আল হাসানের ব্যাপারটাও হয়েছে তাই। এই অবক্ষয়ের জামানায় আমাদের গর্ব করার মতো তেমন কী আছে? ছোট্ট একটি ছেলে সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে। কোথায় ইমরান খান, গাভাস্কার, কপিল দেব, ক্রিকেটের বরপুত্র শচীন টেন্ডুলকার, জয়সুরিয়া, আফ্রিদি? হঠাৎ একদিন শুনলাম বিশ্বের সেরা অল রাউন্ডার আমাদের ছেলে সাকিব আল হাসান। বুকটা গর্বে ভরে গিয়েছিল। এখনো এক-দুই নম্বরেই থাকে। কথা নেই, বার্তা নেই বিদেশ থেকে ডেকে এনে এমন শাস্তি- এও কি ভাবা যায়? এ যেন ব্রাহ্মণের সঙ্গে চাড়ালের ইয়ার্কি।
ইংরেজ আমলে জাহাজের অনেক খালাসি যেমন বন্দরে বন্দরে নেমে থাকত, তেমনি খেলতে গিয়ে খেলোয়াড় বা ক্রিকেট বোর্ডের লাল্লু পাঞ্জুদের লোকেরা দলের সঙ্গে গিয়ে এদেশে-ওদেশে থেকে গিয়ে জাতির বদনাম করেছে তাদের ব্যাপারে বোর্ড কি করেছে? যতসব গোঁয়ার্তুমি। এক সময় এক দেশে এক চোরের হাত কাটার কথা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, যে হাত কাটবে সে যে চোর নয় তা আগে প্রমাণ করতে হবে। চোর তো আর চোরের হাত কাটতে পারবে না। যারা শাস্তি দিয়েছেন তারা কি কখনো কোনো দোষ করেননি? দলাদলি হানাহানি তো লেগেই আছে। পোঁ ধরতে না পারলে কত ভালো ভালো প্রতিভা আড়ালে চলে যাচ্ছে। যে শাস্তি সাকিব আল হাসানকে দেওয়া হয়েছে ওরকম শাস্তি পাওয়ার মতো আর কি কেউ ছিল না বা নেই? আর ইচ্ছা হলেই কি যাকে তাকে শাস্তি দেওয়া যায়? সাকিব আল হাসান শুধু ক্রিকেট বোর্ডের নয়, সে বাংলাদেশের সম্পদ, দেশের সম্মান। ক্ষমতা থাকা ভালো কিন্তু তা যেখানে সেখানে যখন তখন খাটানো ভালো নয়। সাকিবকে শাস্তি দেওয়ার আগে ভদ্রলোকদের একটু তলিয়ে দেখা কি উচিত ছিল। পত্রিকায় দেখলাম শাস্তি শুনেও ছেলেটির মুখের হাসি নাকি মিলায়নি। কেন মিলাবে? ছেলেটা কি চোর? যে চোরের মতো কাচুমাচু হয়ে মাথা নত করবে। এই শাস্তির জন্য যদি তার মন ভেঙে যায়, আর যদি ব্যাটে-বলে না করতে পারে, মন ভাঙা খুনের দায় কে নেবে? কারও মন ভাঙলে, কেউ অপমানিত হলে তাকে আবার আগের তেজে ফিরিয়ে আনা খুব সহজ নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেলাধুলায় আপনার আগ্রহ ঈর্ষা করার মতো। বিশেষ করে ক্রিকেটে ভালো কিছু হলে আপনার আনন্দের সীমা থাকে না। তাই সাকিব আল হাসানকে নিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের বাড়াবাড়ি বন্ধ করুন। জানেনই তো, দুধালু গাইয়ের লাথিও ভালো। যারা হিরো তাদের জিরোরা বুঝবে না, আপনি বুঝবেন। হিরোদের সামাল দিতে অভিজ্ঞতা ও মেধার দরকার। অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা যাদের নেই সেসব অখ্যাতদের বিখ্যাতদের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়াই ভালো। সাকিবের ব্যাপারটা দয়া করে দেখুন। না হলে দেশের ক্রীড়া জগতের মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি অনেক দিন। নেতা ছাড়াই জীবনের বেশিদিন কাটিয়ে গেলাম। আমার বাবা, তার মা-বাবার ছায়া খুব বেশিদিন পাননি। দুই-আড়াই বছর বয়সে মা হারিয়েছিলেন। বাপ হারিয়ে ছিলেন ২৪-২৫ বছর বয়সে। আমি মা হারিয়েছি ৫৯-৬০ বছরে। বাবা পরলোকে গেছেন তারও ৪ বছর আগে। তাই বলতেই হয় বাবা-মা’র ছায়া পেয়েছি অনেক দিন। কিন্তু নেতার ছায়া পাইনি বেশিদিন। তিনি নিজে মরে আমাদের যে মেরে গেলেন, সে থেকে মুক্তি পেলাম না আজও। যন্ত্রণা সইতে সব সময় কষ্ট হয় না। কিন্তু মাঝে মধ্যে বড় বেশি কষ্ট হয়। যখন খুব বেশি অনিয়ম দেখি, তখন নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের ছায়ায় বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ছায়ায়-মায়ায় যারা আজকাল কেরদানি করে নানা ধরনের কথা বলে তখন বুকটা জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যায়। তাই সেদিন বিরোধী দলহীন সংসদে জাসদকে নিয়ে জাতীয় পার্টির বাহাস সম্পর্কে দু’কথা লিখেছিলাম। যার একটি কথাও আমার ছিল না, সবই ছিল বাস্তব ঘটনা। মঈন উদ্দিন খান বাদল যত হাত-পা-মাথা ঝাঁকিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে চৌদ্দবার বঙ্গবন্ধুকে ‘বাপ বাপ’ ডেকে যাই বলুন তাতে আমাদের সান্ত্বনা কোথায়? জনাব হাসানুল হক ইনু ইদানীং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলেন। মন্ত্রী হলে অনেক কথাই বলা যায় বা বলতে হয়। সন্ত্রাসই যার জীবন, তার মুখে সন্ত্রাসবিরোধী কথাবার্তা মানায় না। লিখেছিলাম নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের কথা। ওরকম শত শত খান সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা আজ প্রায় সবাই সরকারের বড় বড় স্তম্ভ। শাজাহান খানকে নিয়ে মাদারীপুর থেকে কয়েকশ টেলিফোন ও মেসেজ এসেছে। একজন লিখেছে, ’86 Awami Legue leader and worker was killed by Sajahan khan and his gonobahini and now he becomes the minister. Whats the irony. Please write more and more. An admirer of you from Madaripur.’ আমি জানি না, জনাব খান ৮৬ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যার দায়ে দায়ী কি না! তবে এটা জানি তার নামে ২৮০টার ওপর হত্যা মামলা ছিল। সবই ছিল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যার অভিযোগ। আমি সে কথাটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সমস্যা হলো, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম, দেশ স্বাধীন করলাম, স্বাধীনতার পরপরই যারা পাকিস্তানি ছিল তারা, আর আমরা এক হয়ে গেলাম। ডালে চালে খিচুড়ি। যে বাঙালি আর্মি মুক্তিযুদ্ধ করল, আর যারা করল না স্বাধীনতার পর তাদের এক শিবিরে বসবাসের ব্যবস্থা হলো। পুলিশ যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল, যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে দেখল যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, সেই স্বাধীনতাবিরোধী আর মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ এক জায়গায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার কারণে পাকিস্তানি দালালের কর্তৃত্ব নেতৃত্ব মেনে নিতে হলো মুক্তিযোদ্ধা পুলিশের। মুক্তিযুদ্ধের পরে যেমন হয়েছিল, এখন তার চেয়ে বেশি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীরা কয়েক বছরের মধ্যে যেমন সব কর্তৃত্ব নেতৃত্ব দখল করে নিয়েছিল, ঠিক তেমনি স্বাধীনতার পর যারা বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছে, বঙ্গবন্ধু সরকারের সর্বনাশ করেছে, হত্যা-ধ্বংস করেছে তারা এখন প্রায় সবাই বর্তমান সরকারের মধ্যমণি। স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা যেমন জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শক্ত মাটিতে পা রেখেছিল, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুর বিরোধী রাজনৈতিক খুনিরা বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আমার ভগ্নী জননেত্রীর হাত-পা ধরে উচ্চাসনে আসীন হচ্ছেন- এটা সহ্য করতে সত্যি মন সায় দিতে চায় না।
দেশের মানুষ এক সময় মনে করত বঙ্গবন্ধুকে গালাগাল ও কটূক্তি করার জন্য মতিয়া চৌধুরীর ফাঁসি হবে, বড় বড় জাসদ নেতার কারাদণ্ড হবে কিন্তু তার বদলে তারা মন্ত্রিত্ব পাবেন, এটা কেউ কখনো ভাবেনি। আমরা বোকারা কেন যে এত কষ্ট করে ‘বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু’ করে জপতপ করে শত্রু হলাম বুঝতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধ করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা নিঃস্ব-রিক্ত। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ প্রতিরোধ করে প্রতিরোধ সংগ্রামী নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, বঞ্চিত। দু-একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার আবদুল মালেকের মতো উপদেষ্টা হয়ে দেশের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ‘৭৫-এর প্রতিরোধ সংগ্রামের কাউকে কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। আমাকে ছোটখাটো করার জন্য দু-চারবার দু-চারজন দালাল খোঁজা হয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারেনি। যেহেতু সময় বয়ে যায় তাই দু-চার কথা না লিখে পারি না। ছেলেবেলায় পড়ালেখা করিনি, লেখালেখির গুরুত্ব বুঝিনি। জীবনে কত কষ্ট করেছি শুধু সেই কষ্টগুলো কলমের অাঁচড়ে ধরে রাখলেই রুটি-রুজির জন্য কোনো কষ্ট করতে হতো না। আজ কত নেতা, কত বীর, কিন্তু বঙ্গবন্ধু যেদিন নিহত হয়েছিলেন সেদিন মোহাম্মদপুরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনো বীর খুঁজে পাইনি। প্রতিরোধ সংগ্রাম করতে গিয়ে তথাকথিত আওয়ামী লীগের বড় বড় পাণ্ডাদের বিরোধিতা ছাড়া সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। সে সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক নেতা সে যে কি জঘন্য গালাগাল করেছে, কানে আঙ্গুল দিয়েও সহ্য করা যেত না। তাদেরই আজ কি দাপট! অনেকে মরে না গেলে তারাও মন্ত্রী-টন্ত্রী থাকতেন। ব্যর্থদের মানুষ ত্যাগ করে, বিপদে যে রুখে দাঁড়ায় তাকে অনুসরণ করে, সম্মান দেখায়। কিন্তু আমাদের দেশে সব কিছু উল্টা চালে চলছে।
সব কথা একবারে বলা যাবে না। বলতে সময় লাগে। তবু প্রতিদিন বলে বলে অনেক কথাই শেষ করতে পারব বা করব। বঙ্গবন্ধু যখন নিহত হন তখন এসপি মর্যাদায় বিক্রমপুরের মহিউদ্দিন ছিলেন প্রধান দেহরক্ষী, তাকে সেদিন পাওয়া যায়নি। পুলিশের প্রধান ছিলেন নুরুল ইসলাম, বিডিআরের প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, বিমানবাহিনীর প্রধান এ. কে. খোন্দকার, নৌবাহিনীর প্রধানের এই মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না। রক্ষীবাহিনীর প্রধান নুরুজ্জামান দেশের বাইরে ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রধান তোফায়েল আহমেদ, পরিচালক আনোয়ার-উল-আলম শহীদ, সরোয়ার মোল্লা, মেজর হাসান- এরা কেউ বিপদগ্রস্ত বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধারে এগিয়ে যাননি। বরং সেনাবাহিনীর প্রধান জনাব শফিউল্লাহ জাতির পিতাকে বলেছিলেন, ‘পিছন দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন কি না?’ সেই শফিউল্লাহকে আওয়ামী লীগ এমপি বানিয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি বানিয়েছে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জনাব শফিউল্লাহকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছিল। অনেক বছর বিদেশে রাষ্ট্রদূতের চাকরি করেছেন। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের সময় তিনি লন্ডনে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। আমি তখন লন্ডনে। প্রায় এক হাজার বাঙালি লন্ডন হাইকমিশনের সামনে অবস্থান করছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ছবি তুলতে তিনি দেননি। ঢাকা থেকে নির্দেশ না পেলে তিনি ছবি তুলতে দেবেন না- এসব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানতেন। তারপরও তাকে মনোনয়ন দিয়ে সংসদ সদস্য বানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি করেছেন। জনাব এ. কে. খোন্দকার সবার আগে ছুটে গিয়ে মোশতাকের প্রতি আনুগত্য জানিয়েছিলেন। তিনিও রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনিও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। কি ভাগ্য! ব্যর্থতায় পুরস্কার, সফলতায় তিরস্কার আর নির্যাতন। মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান পাকিস্তান ফেরত দেশপ্রেমিক। মনে হয় বঙ্গবন্ধু তাকে জানতেন। শেষ পর্যন্ত বিডিআরের প্রধান ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর কিছুই করেননি, এক ফোঁটা চোখের পানিও ফেলেননি। তিনিও আওয়ামী লীগের নেতা হয়েছেন, মনোনয়ন পেয়েছেন। কার কথা বলব, কত বলব? আমাদের বোধশক্তি অনেকটা ভোঁতা হয়ে গেছে। কর্নেল জামিল বলে এক ভদ্রলোক, তিনিও পাকিস্তান ফেরত। তাকে ডিজিএফআই-এর প্রধান করে ব্রিগেডিয়ার পদোন্নতি দিয়ে তিন হাজার চৌকস সৈন্য ও সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র সরঞ্জামাদি দিয়ে প্রেসিডেন্টকে রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তার বাহিনীর ব্যবহারের জন্য দুখানা হেলিকপ্টার দেওয়া হয়েছিল। তিন হাজার সৈন্যের এক হাজার গণভবনের আশপাশেই রাখা ছিল। একটা দেশের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান এতকিছু হচ্ছে সবাই জানল, রাতে কেউ ঘুমালেন না, পরদিন শুক্রবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, তার নিরাপত্তায় সবাই সক্রিয় কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে ধড়ফড় করে জেগে এক কাপড়ে ছুটেছিলেন। মাঝপথে মারা পড়ে শহীদি দরজা পেয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর নিহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার ছবি জ্বল জ্বল করছে। হায়রে কপাল! যাকে দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হলো। দায়িত্ব অবহেলা করে ঘুমিয়ে রইলেন, একা এসে মরণের ভান করে হিরো হলেন। এত ষড়যন্ত্র হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রান্ত হবে তারই তো আগে জানার কথা ছিল, তারই তো প্রতিরোধ করার কথা। তাকে চৌকস দক্ষ যোগ্য ভাবতাম যদি খুনিদের মাঝপথে বাধা দিতেন, ষড়যন্ত্রকারীদের বন্দী করতেন, একেবারেই ওসব কিছু না পারলেও সময়মতো একটা কোম্পানি নিয়ে খুনিদের আগেই বঙ্গবন্ধুর বাড়ি রক্ষায় প্রতিরক্ষা বূ্যহ রচনা করতেন, একেবারে কোনো কিছু না করতে পারলেও একা না এসে দু-একশ সৈন্য নিয়ে খুনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তাহলেও না হয় ভাবতাম তিনি সদাপ্রস্তুত ছিলেন। এমন অলস মেধাহীন ডিজিএফআই’র প্রধান ছিলেন বলেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি। দেশের এই সর্বনাশের যদি বিচার হতো ভবিষ্যতে সবাই দায়িত্ব পালন করত। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে ব্রতী হতো। সব ন্যায়নীতি ধসে পড়ায় মানুষ কেমন যেন ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। জাতি নিরুৎসাহিত হলে তারচেয়ে বড় ক্ষতি আর নেই। আমাদের উৎসাহিত করা বংশীবাদকের প্রয়োজন। যার সুরের প্রবল টানে আমরা আবার নড়েচড়ে জেগে উঠব।
লেখক : রাজনীতিক।
পুনশ্চ: বাংলাদেশ প্রতিদিনে ‘বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা, বিশ্বকাপ ও সাকিব আল হাসান’ শিরোনামে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম-এর একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম পাল্টে লেখাটি হুবহু টাইমনিউজ পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।
ঢাকা, ১৫ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস





