ফিদেল আলেসান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ যিনি ফিদেল কাস্ত্রো বা শুধুই কাস্ত্রো নামে পরিচিত। তিনি প্রথম জীবনে একজন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা ও পরে সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব জুড়ে নজির স্থাপন করার গৌরব অর্জন করেছেন।
১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলে বিরান জেলায় স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক অসচ্ছল অভিবাসী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন তিনি। বিংশ শতাব্দির এ মহানায়ক, বিশ্বব্যাপী মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদের জয়জয়কারের মধ্যেও সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে টিকিয়ে রেখে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
বিকল্প পথে বিপ্লবের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরশাসকের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার প্রত্যাশায় ১৯৫৩ সালে একটি সশস্ত্র দল নিয়ে মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলা করেছিলেন কাস্ত্রো। মনকাডা হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন সে জবানবন্দি ছিল তৎকালীন বিউবার রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্য্যপূর্ণ।
সেই জবানবন্দির মধ্যে কিউবার সামরিক স্বৈরশাসক ও বুর্যোয়া শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট এবং সেই সংকট সমাধানের কার্যকরী পথ-নির্দেশনা করেছিলেন তিনি। তার সেই জবানবন্দি মূলক বক্তৃতা ব্যপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল গোটা কিউবা জুড়ে।
এরই ধারাকাহিকতায় ১৯৫৯ সালে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কিউবার মার্কিন সমর্থিত একনায়ক ফুলগেন্সিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ শতকের কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো।
তার পিতা ছিলেন ছোট্ট আখের খামারি। তাই তার শৈশব মোটেও সচ্ছল ছিল না। দরিদ্র শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ছোট বেলা থেকেই কাজ করেছেন কাস্ত্রো। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের বাবার আখের খামারে
শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগঠিত করে একটি ধর্মঘটের আয়োজন করেছিলেন কাস্ত্রো।
অসচ্ছলতার মাঝে একটি জেসুইট বোর্ডিং স্কুল থেকে আইনের স্নাতক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলায়ও ফিদেল ছিলেন তুখোড়। ১৯৪৪ সালে কিউবার সেরা অলরাউন্ডার স্কুল অ্যাথলেট পুরস্কার প্রাপ্তির গৌরব অর্জন করেন।
আইন বিষয়ে ডিগ্রী নেওয়ার পরপরই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অসচ্ছলতা দূর করতে হাভানায় একজন আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবনের সুচনা করেছিলেন ফিদেল। আইন পেশায় দরিদ্র মক্কেলদের পক্ষে লড়ে অল্প দিনের মধ্যেই ব্যাপক সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন তিনি।
হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সময় প্রেসিডেন্ট ফালজেন্সিও বাতিস্তা এবং কিউবার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সমালোচনা নিবন্ধ লিখে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৪৭ সালে নবগঠিত কিউবান পিপলস পার্টিতে যোগ দেন ফিদেল কাস্ত্রো।
রাজনীতিতে যোগ দিয়েই তুখোড় বক্তা কাস্ত্রো মার্কিন ব্যবসায়ী শ্রেণী ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবিচার, দারিদ্র, বেকারত্ব ও নিম্ন মজুরীর অভিযোগ নিয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে দলের তরুণ
সদস্যদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো দলীয় কংগ্রেসের সদস্য প্রার্থী হন। নির্বাচনে পিপলস পার্টি যখন বিজয়ের ঠিক দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই জাতীয় নির্বাচনের আগে জেনারেল বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করেন ফলে নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়।
সামরিক স্বৈরাচারের হাত থেকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সকল গণতান্ত্রিক পথ অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে অত্যন্ত বাস্তবিক কারণে বিকল্প পথে বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করার প্রত্যয়ে মাত্র ১২৩ জন নারী পুরুষের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে ১৯৫৩ সালে মনকাডা ব্যারাকে একটি ব্যর্থ আক্রমণ করেন, এবং সংঘর্ষে মাত্র ৮ জন নিহত হলেও ফিদেলসহ অন্যরা পরাস্ত হয়ে কারারুদ্ধ হন।
মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলার 'বিদ্রোহীদের আটক করা মাত্র হত্যা' করার নির্দেশ জারি করেন বাতিস্তা। এই আদেশে ফিদেল কাস্ত্রের প্রায় ৮০ জন সহযোদ্ধাকে হত্যা করা হলেও ফিদেলকে আটককারী লেফট্যানেন্ট বাতিস্তার নির্দেশ উপেক্ষা করে তাকে বেসামরিক কারাগারে পাঠিয়ে দেন। এতে করে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। পরর্তীতে কারাগারে তাকে বিষ খাইয়ে হত্যার জেন্য বাতিস্তা দায়িত্ব প্রদান করেন ক্যাপ্টেন পেলেতিয়ারকে।
কিন্তু পেলেতিয়ার দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন। এই বিরুদ্ধচারণের জন্য কোর্ট মার্শালে ফাঁসি দেওয়া হয় ক্যাপ্টেন পেলেতিয়ারকে। বিশ্ব জনমতের কথা বিবেচনা করে পরে কাস্ত্রোকে হত্যা না করে বিচারের মুখোমুখি করেন বাতিস্তা। মনকাডা হামলার ঐ বিচারে তার ১৫ বছরের কারাদন্ড হলেও প্রবল জনসমর্থনের কারণে মাত্র দুই বছরের মাথায় তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন বাতিস্তা সরকার।
২ বছর জেল খেটে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিপ্লবী চে গুয়েভারার সাথে ১৯৫৫ সালের জুন মাসে রাউল কাস্ত্রোর সাথে নিকো লোপেজের মাধ্যমে চে গুয়েভারার পরিচয় হয়। এবং পরে রাউল কাস্ত্রোর মাধ্যমে বিপ্লবী চে এর সাথে পরিচয় হয় ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে ।
চে গুয়েভারার ছিলেন একজন আপাদমস্তক মার্কসবাদী বিপ্লবী। কথিত আছে চে গুয়েভারার সংষ্পর্শে এসেই ফিদেল কাস্ত্রো ক্রমান্বয়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী হয়ে উঠেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কিউবা জয়ের তিন বছর পর অত্যন্ত যথার্থ ভাবেই চে গুয়েভারাকে কেস্ত্রোর মস্তিস্ক বলে আখ্যায়িত করেছিল।
কিউবা বিপ্লব ও বিপ্লবের পরিকল্পনায় কাস্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেক্সিকো হতে কিউবায় আক্রমণ চালানো। সে লক্ষ্যেকে সামনে রেখেই চে গুয়েভারারকে সঙ্গে নিয়েই গেরিলা দল গড়ে তোলার জন্যে মেক্সিকোয় পাড়ি জমান ফিদেল। সেখানে একটি গেরিলা দল গঠন এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের পর চে গুয়েভারা, জুয়ান আলমেইডাসহ প্রায় ৮০ জনের একটি বিপ্লবী দল নিয়ে ১৯৫৬ সালে কিউবায় ফিরে আসেন ফিদেল।
১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই মনকাডার সেই হামলার নামানুসারে ফিদেল কাস্ত্রো নেতৃত্বাধীন গেরিলা দল 'জুলাই টুয়েন্টি সিক্স মুভমেন্ট' হিসেবে গোটা কিউবা জুড়ে ব্যপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি বাতিস্তার প্রায় হাজার খানেক সেনা গেরিলাদের হাতে প্রাণ হারালে যুক্তরাষ্ট্র
বিমান, বোমা, জাহাজ ও ট্যাংক পাঠিয়ে গেরিলাদের দমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তৎকালীন নাপাম বোমার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও গেরিলাদের সঙ্গে বাতিস্তা ব্যার্থ হওয়ায় বাতিস্তাকে নির্বাচন দেওয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৫৮ সালের মার্চে বাতিস্তা কিউবাতে নির্বাচন দিলেও সে দেশের জনগণ ঐ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন। ফিদেলের সেনারা চারদিক দিয়ে রাজধানী হাভানাকে ঘিরে ফেলা শুরু করলে ১৯৫৯ সালের পহেলা জানুয়ারি কিউবা ছেড়ে পালিয়ে যান জেনারেল বাতিস্তা।
পরে ৯ জানুয়ারি রাজধানী হাভানায় ঢুকে দেশের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহন বরেন ফিদেল কাস্ত্রোর গেরিলারা। আর এরই মধ্যো দিয়ে কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ফিদেল।
এই আজীবন বিপ্লবী ১৯৬৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ কিউবার সাধারণ স¤পাদক নির্বাচিত হন এবং কিউবাকে একটি সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে কিউবার প্রেসিডেন্ট অফ দ্য কাউন্সিল অফ স্টেটস এবং কাউন্সিল অফ দ্য মিনিস্টারস নির্বাচিত হন তিনি। একইসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কিউবা-বিপ্লবের পরবর্তি অর্ধশত বছর ধরে পরপর ১০ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যা কিংবা উৎখাতের লাগাতার চেষ্টাকে ব্যার্থ করে দিয়ে কিউবার শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। অবশেষে স্বাস্থ্যগত কারণে ৮১ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় কিউবার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ২০০৬ সালের ৩১ জুলাই সাময়িকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন রাউল কাস্ত্রোর নিকট।
কেবল সমাজতন্ত্রের অনুসারী নয়, বিশ্বব্যাপী নানা মত ও পথের কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌরাণিক এক চরিত্রের অধিকারী কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর ৮৮তম জন্মবার্ষিকীতে এই মহান বিপ্লবীর প্রতি লাল সালাম।
এমবিএইচ





