কেউ পালাচ্ছে, কেউ কেবল দৌড়াচ্ছে, ধানিজমিতে বসে বসেও পার হয়েছে পৌষের রাত। কারো সন্তানেরা বাবার প্রতীক্ষায়, বাবা ঈদের জামা নিয়ে আসবে, কিন্তু বাবা আর আসেনি। পুরনো জামা দেখে কারো সন্তানের মুখ ফ্যাকাশে হয়েছে ঈদের দিনে।

বাবাহীন পরিবারে অসহায় মা ঈদে চকোলেটও দিতে পারেনি। এই দুঃখ, এই বেদনা, এই দৃশ্য তাদের আর সয় না। গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে রাতের বেলা ফার্মগেটের ফুটপাথে মুখ ঢেকে পড়ে থেকে দিনের বেলায় নেতাদের খোঁজ করার অভিশপ্ত জীবন থেকে তারা মুক্তি চায়। প্রতিনিয়ত অঝোরে কেঁদে কেঁদে অসুস্থ হয়ে যাওয়া মাকে একটি বার, একটি নজর দেখতে চায় ফেরারি নেতাকর্মীরা।

বিএনপি কর্মীদের হাজারো মায়ের অশ্র“বান কবে থামবে, থামাবে কে? সামাজিক প্রেক্ষাপটে এত দিনে অনুভূত হচ্ছে কর্মীদের, ‘আমাদের মায়েরা আসলেই কি গণতন্ত্রীগর্বা না বখাটের মা? বেগম জিয়া, তারেক কিংবা মির্জা ফখরুল সেই ঘোষণা দিন, আমরা শান্তি পাবো।’
এমন মানবেতর, অন্তরকাঁপা দৃশ্যপট শুধু একটি পরিবারের নয়, বেদনার এই নিঃস্বকাব্য বিএনপি কর্মীদের হাজার হাজার পরিবারে। তারা ধুঁকছে, তারা হাঁপাচ্ছে, তবুও তারা লড়ছে, জীবন বাজি রাখা প্রাণপণ এই লড়াইয়ের বিনিময়েও তাদের কোনো চাওয়া নেই। শুধু প্রশ্ন- এখন কেমন আছে বিএনপি? এই রক্ত, এই অশ্র“, বেদনার এই কাব্যের বিনিময়ে কতটুকু পুষ্ট, কতটুকু শক্তিমান হয়েছে বিএনপি?


কথা হয়েছে এমন অনেকের পরিবারের সাথে। তবে তারা পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। অনুরোধ রেখেছেন, নাম গোপন রেখে তার বিপদের খবরটি, পরিবারের খবরটি বিএনপির কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে।
এমন একজন প্রশ্ন রেখেছেন- আমি রাজনৈতিক কর্মী না বখাটে? কোর্টের বারান্দায়ই কি পার হবে জীবনের সোনালি সময়? মুক্তি কি পাবো না এই অভিশাপ থেকে? মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে পালাচ্ছি আর পালাচ্ছি! এ দৃশ্য দেখে পরিবার, পরিজন, ভাই ও বান্ধবের চোখে আমি বখাটে? সন্ত্রাস কিংবা প্রিয় দেশবিরোধী কোনো কর্মেই আমি জড়িত ছিলাম না? তবে রাজপথে মিছিল করেছি গণতন্ত্রের জন্য। আমি তো ভাবছি, আমি গণতন্ত্রের এক সংগ্রামী যুবক!

কলেজপড়ুয়া মেয়ে শান্তা। বাবা ফেরারি তাই কোনো আনন্দ নেই জীবনে। এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হলে বলেন, ‘ঈদের চাঁদ উঠলেও আমাদের পরিবারে সেই চাঁদ ওঠে না। এবারেরও ঈদেও নতুন জামা পেয়েছি মামার কাছ থেকে, কিন্তু বাবাবিহীন সেই জামা গায়ে দেয়ার সাধ জাগে না।’ শান্তার প্রশ্ন, ‘কবে দেশ শান্ত হবে আর বাবা ফিরবে আমাদের বুকে।’
এমন হাজারো পরিবার কে কার খবর রাখে। এক-একটি করুণ চিত্র বোম্বের মুভি ডিরেক্টরের কাহিনীকেও হার মানাবে। সারা দেশেই হাজার হাজার ফেরারি কর্মী আড়ালে-আবডালে কষ্টের প্রহর গুনছেন। বিএনপি কেন্দ্র এদের পরিসংখ্যার এখনো দাঁড় করাতে পারেনি।

মামলার সংখ্যা কত? কত মামলায় কত আসামি কিংবা ফেরারি হয়ে আছেন কতজন? তবে গত ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের কর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে, এদের মুক্তিতে দল সংগ্রাম করবে। অর্থসঙ্কট গোছাতে দলটি এর ভার বহন করবে।’ তিনি বলেন, ‘লক্ষাধিক মামলায় বিএনপিকে জড়ানো হয়েছে, ৫০ হাজারের অধিক নেতাকর্মী কারাগারে আটক রয়েছেন। এদের বিষয়ে দল কাজ করে যাচ্ছে, এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। একদিন জনগণ ঘুরে দাঁড়াবে।’ সূত্র-নয়াদিগন্ত

এসএ