গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় বিচার, সাম্য, আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই আমরা মরণপণ লড়াইয়ের মাধ্যমে দেশকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার ৪ দশক অতিক্রান্ত হলেও আমরা সে গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি বলে মনে হয় না। স্বাধীনতার কাঙ্খিত সুফলটা আজও আমাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।

দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। সামাজিক ন্যায়বিচার ও সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমানের বিষয়টি এখনো আমাদের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে।

আইনের শাসনের অনুপস্থিতিও আমাদের দেশ ও জাতিস্বত্তাকে হুমকীর মুখোমুখি ঠেলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি তো আমাদের আসেই নি বরং দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে যে মহাপ্রলয় সৃষ্টি হয়েছে, তা অনতিবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে আমাদের ধ্বংসের জন্য পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন হবে না বরং আমাদের আত্মঘাতি কর্মকান্ডই যথেষ্ট হবে বলে মনে হয়।

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় (Preamble) বলা হয়েছে-

Further pledging that it shall be a fundamental aim of the State to realize through the democratic process a socialist society, free from exploitation-a society in which the rule of law, fundamental human rights and freedom, equality and justice, political, economic and social, will be secured for all citizen.

অর্থাৎ আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা-যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

মূলত আমরা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে কিছুটা হলেও বিচ্যুত হয়েছি বলেই মনে হয়। দেশের গণতন্ত্র এখনও বিকশিত ও পরিশীলিত হয়নি। সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার আলোকে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ,সর্বজনীন আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা আজও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। ফলে আমরা ভৌগলিক স্বাধীনতা লাভ করলেও স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো আজও অনেকটাই অধরায় রয়ে গেছে।
আর এজন্য দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতিই প্রধানত দায়ি। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা খুবই জরুরি।

আসলে ক্ষমতা কোন উপভোগের বিষয় নয় বরং তা অবশ্যই সেবামূলক কাজ। যারা ক্ষমতাসীন হন বা ক্ষমতাসীন হওয়ার চেষ্টা করেন তারা সকলেই গণমানুষের সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু কোন ভাবে ক্ষমতায় যেতে পারলে সেসব আপ্তবাক্য আর ক্ষমতাসীনদের খেয়াল করার সময় থাকে না প্রায় ক্ষেত্রেই বরং জনগণের সেবক থেকে তারা রাজাধিরাজে পরিণত হন। ভুলে যান তাদের পূর্বাপর আত্মপরিচয় ও কৃত প্রতিশ্রুতি।

যেমন ভুলে গিয়েছিলেন মহাভারতে বর্ণিত মণিপুর-রাজকণ্যা চিত্রাঙ্গদা। ক্ষমতার প্রভাব বলয় এই রাজকণ্যাকে একেবারে অন্ধ করে দিয়েছিল। ভুলতে বসেছিলেন নিজ স্বত্তাকেও।

তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি একজন নারী বরং তিনি পুরুষের সমকক্ষ ও ক্ষেত্র বিশেষে আরও অধিকতর ক্ষমতাবান মনে করতেন নিজেকে।

মূলত রাজকুমারী হওয়ার অহমিকায় মণিপুর-রাজকণ্যা চিত্রাঙ্গদা নিজের আত্মপরিচয় ভূলে গিয়েছিলেন। পিতাও তার একমাত্র কণ্যাকে পুরুষের মত বেশভূষায় ভূষিত করে, ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা দিয়ে রাজকর্মে নিযুক্ত করেছিলেন পুরুষের বেশে, পুরুষ মনোবৃত্তি গ্রহণ করে তিনি সব সময় পুরুষোচিত কাজে নিয়োজিত থাকতেন।

একদিন মৃগয়ায় বের হয়ে হরিণের সন্ধানে গভীর বনে পান্ডবপুত্র অর্জুনের সাথে দেখা হয়। তখনই তিনি নিজেকে আবিস্কার করতে সক্ষম হন। অর্জুনকে দেখে তার মনে ভাবান্তর দেখা দেয়। অবলীলায় তার মুখ থেকে নিসৃত হয়-

‘শিখে পুরুনের বিদ্যা, প’রে পুরুষের
বেশ, পুরুষের সাথে থেকে, এতদিন
ভুলে ছিনু যাহা, সেই মুখে চেয়ে, সেই
আপনাতে-আপনি-অটলমূর্তি হেরি
সেই মহুর্তেই জানিলাম মনে, নারী
আমি। সেই মহুর্তেই প্রথম দেখিনু
সম্মূখে পুরুষ মোর।’

আসলে ক্ষমতার অহমিকা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি-বৈষয়িক জৌলুস এক শ্রেণির মানুষকে নীচে নামিয়ে দেয়। তখন তার আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। যেকোন ভাবে ক্ষমতা চর্চাটাই তার কাছে মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

নিজেদের কৃত কোন অপরাধই তাদের কাছে অপরাধ বলে মনে হয় না। বরং রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে চরিতার্থ করতেই স্বেচ্ছাচারি ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়। অথচ এই নশ্বর পৃথিবীতে কোন কিছু চিরস্থায়ী নয়। বিত্ত-বৈভব, রূপ-সৌন্দর্য, ক্ষমতা-প্রভাব, প্রতিপত্তি কোন কিছুরই স্থায়িত্ব নেই ।

একদিন কর্পূরের মত সবকিছুই শুণ্যে মিলিয়ে যায়। আর এসব মানুষকে কখনোই অমরত্ব দেয় না বরং মানুষ চিরঞ্জীব করে রাখে তার সৎকর্ম। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় ও অতিমাত্রায় বৈষয়িক লোভ -লালসায় বাস্তবতা মোটেই উপলব্ধি করতে পারি না।

কিন্তু এক সময় এই মোহটা আর অবশিষ্ট থাকে না। এক সময় ছন্দপতন ঘটে। দুনিয়ার জৌলুস একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে আসে। তখন আর সময় থাকে না। তাইতো রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদা আক্ষেপ করেই বলেছিলেন,

‘হায় আমারে করিল
অতিক্রম আমার এ তুচ্ছ দেহখানা,
মৃত্যুহীন অন্তরে এই ছদ্মবেশ
ক্ষণস্থায়ী’।

আগেই বলা হয় যে, দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে মহাপ্রলয় সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাপ্রলয় থামিয়ে অর্থনীতির গতি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের হলেও সৃষ্ট এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে তাদের বেশ গা ছাড়া ভাবই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এ ধরনের বড় ইস্যুতে রাষ্ট্রের এমন উদাসীনতার বিষয়টি মোটেই গ্রহনযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি আধুনিক যুগে সবচেয়ে মনোযোগ আকর্ষণকারী ব্যাংক ডাকাতিগুলোর একটি।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। অথচ বাংলাদেশে ওই সাইবার ডাকাতির ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদনটি দিয়েছে তা রহস্যজনক কারণে এখনও প্রকাশ করেনি সরকার। সর্বশেষ গত মাসে প্রতিবেদনটি প্রকাশের কথা থাকলেও তা হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনটি আদৌ প্রকাশ হবে কিনা তা নিয়েও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে। যা রীতিমত উদ্বেগজনক।

এর আগেও আমাদের দেশে শেয়ারমার্কেট, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনিসহ বিভিন্ন সেক্টরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারীর ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এসব কোন ঘটনারই সুষ্টু তদন্ত বা অপরাধীদের সনাক্ত করে দায়িদের কোন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি বরং ক্ষেত্র বিশেষে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পরোক্ষভাবে অপরাধের পক্ষেই গেছে।

খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে শেয়ার কেলেঙ্কারীর ঘটনা একটি তদন্ত কমিটি গঠন ও গঠিত কমিটি একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেও রহস্যজনক কারণে তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

মূলত অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারীর কোন ঘটনারই কোন যৌক্তিক পরিণতি আমরা লক্ষ্য করিনি। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই আরও উৎসাহী হয়ে তাদের অপরাধ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে এমন নৈরাজ্য এখন দেশের গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও প্রবেশে করেছে। বিশেষ করে রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সংবাদ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট দাবি করেছে, ‘বাংলাদেশে রিজার্ভ চুরি বিষয়ক প্রতিবেদনটি কখনও প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে’।

প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে গুঞ্জন থাকার কথাও জানানো হয়েছে। এ ব্যাংক ডাকাতিকে রহস্যময় হিসেবে উল্লেখ করে ‘এ রহস্য রহস্যই থেকে যাবে’ বলে উদ্বেগ জানিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। যা আমাদের রাষ্ট্রের সক্ষমতা, আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতাকে রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়।

প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত হ্যাকাররা ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনে স্থানান্তরে সক্ষম হয়। ওই অর্থ ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার ব্রাঞ্চের চারটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন থেকে সাইবার ডাকাতি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের চেষ্টা দুইবার থামিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সর্বশেষ গত মাসে প্রতিবেদনটি প্রকাশের কথা থাকলেও তা হয়নি।

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে আহবায়ক করে গত ১৫ মার্চ তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার।

কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অন্তরবর্তীকালীন প্রতিবেদন এবং ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। সময় মতো প্রতিবেদন জমা দেয় ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি। কমিটির অপর দুই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস।

এ কমিটি গত ৩০ মে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এ সময় অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।’ এরপর, গত ২১ জুলাই অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। কিন্তু প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চার মাস পরও প্রকাশ্যে আসেনি সেটি।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন এক মাস পর্যন্ত সাইবার ডাকাতির তথ্যটি গোপন করেছিল, ব্যাংক কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল কিনা, ভবিষ্যতে কিভাবে এ ধরনের সাইবার অপরাধ ঠেকানো যাবে তা নির্ধারণ করাই ছিল ওই তদন্ত কমিটির কাজ।

ইকোনমিস্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন তদন্ত প্রতিবেদনের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করবেন না।

আর প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করায় গুঞ্জন উঠেছে যে প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা উঠে আসায় এবং ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাইবার ডাকাতির পর থেকে সরকার অবিরতভাবে বহিরাগত হ্যাকার, নিউ ইয়র্ক ফেডারেল এবং সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা সুইফটকে দায়ী করে আসছে।

কিন্তু কিভাবে সাইবার ডাকাতরা সুইফট কোড ব্যবহার করে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে টাকা সরিয়ে নিতে পারলো সে ব্যাখ্যা এখনও কেউ দিতে পারেনি। কিংবা নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভও সেই কোড শনাক্ত করতে কেন ব্যর্থ হলো তার সুরাহাও পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেম হ্যাক করার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে অবস্থান না করেই ট্রান্সফার অর্ডার দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

যদি তা সত্যি হয়, তবে এটি বিশ্বের লেনদেন ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে এ সাইবার ডাকাতির ক্ষেত্রে হ্যাকারদের সঙ্গে সুইফট টার্মিনালের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার এখনও চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইন থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফিলিপাইনি প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়ার্তে এ ব্যাপারে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ফিলিপাইনের একটি আদালত থেকে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফিলিপিনো কর্মকর্তারা হয়তো আশা করছেন বাংলাদেশিরা তাদের তাদের টাকা ফেরত নেবে এবং তারা শান্তি থাকবেন। তবে ফিলিপাইনে অর্থ পাচার সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতির বিপরীতে এ অর্থ নিতান্ত কম বলে উল্লেখ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট।

দেশের সকল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বিধান এবং দুষ্টের দমন করে শিষ্টের লালন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। মূলত রিজার্ভ চুরি সহ দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে লুটপাট এবং তৎপরবর্তী ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর এ ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার (Maciver) বলেছেন, The state is an association which acting through law as promulgated by a government endowed to this end with coercive power, maintaining within a community territorially demarcated, the universal external condition of social order.’

অর্থাৎ রাষ্ট্র এমন একটি সংঘ, যা সরকারের ঘোষিত আইন অনুসারে কার্য সম্পাদন করে। সরকার আইন ঘোষণা করার এবং তা পালন করবার শক্তির অধিকারী। ঐ শক্তির সাহায্যে সরকার নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলার বাহ্যিক ও সর্বজনীন অবস্থা বজায় রাখে।
এ প্রসঙ্গে উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) এর বক্তব্য হলো,‌ ‘‍A state is a people organized for law within a definite territory.’
অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট ভূ-ভাগের মধ্যে আইনের মাধ্যমে সংগঠিত জনসমূহকে রাষ্ট্র বলে।

দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নিরবতা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ধরনের প্রশ্নে সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনা সরকারের পক্ষে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় এমন সন্দেহ-সংশয়ের কারণ।

ফলে রিজার্ভ চুরির ঘটনার রহস্যটা রহস্যই থেকে যাচ্ছে। মূলত রাষ্ট্রের সেবক হিসাবে সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলাসহ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান। কিন্তু তারা যদি সেবার মনোভাব পরিহার করে মানসিকভাবেই রাজাধিরাজ বনে যান, তাহলে জনগণ রাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। হয়তো ক্ষমতাও হয়তো তাদের জন্য চিরস্থায়ী হবে না।

কালের পরিক্রমায় হাতছাড়া হয়ে যাবে। দাঁড়াতে হবে জনতার কাতারে। তখন রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদার মত তাদেরকে অনুশোচনায় করতে হবে।


(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এসএম