‘ফর দ্যা পিপল, ডিসপাইট দ্যা পিপল’– শ্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া কামাল আতাতুর্কের আধুনিকীকরণের অগ্রযাত্রা বেশ প্রভাব ফেলে তুর্কির শহুরে অঞ্চলের মানুষের কাছে।

ইউরোপীয় আধুনিকতার আদলে তুরস্ককে গড়ে তোলার জন্যে সেক্যুলারিজমের আবরণে তিনি নজিরবিহীনভাবে ধর্মহীনতাকে চাপিয়ে দেন। এই প্রক্রিয়াটি সে সময় ‘কামালিজম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশটিতে একদলীয় শাসন চলতে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মেরুকরণ শুরু হলে তুরস্কও তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে নি। তুরস্কের তৎকালীন ডেমোক্রেট সরকার পশ্চিমাদের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চা শুরু হয়। ন্যাটোর সদস্যপদ গ্রহণ করে। সে সময় তুরস্কের ইসলামী চিন্তাবিদগণ ধর্মহীন সমাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোতে সমর্থন দান করেন।

পরবর্তী ইসলামপন্থী দলগুলোও আদর্শিক কারণে কমিউনিস্ট বিরোধী অবস্থানে অটল থাকে। অপরদিকে বামপন্থী রাজনীতিতে কুর্দিরা বেশ জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে। আর সমাজের এলিট ও সেক্যুলার ধারাকে জোরালো সমর্থন দিতে থাকে কামাল আতাতুর্কের আদর্শবাহী সেনাবাহিনী। যারা সেক্যুলারিজমের ব্যানারে ধর্মহীনতাকে টিকিয়ে রাখতে চার চারটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে।

‘হয় তুমি তুর্কি নয়তো কুর্দি, হয় তুমি ইসলামপন্থী নয়তো সেক্যুলার’– অবস্থা যখন এ পর্যায়ে দাঁড়ায়, তখন তুরস্কের ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গাগুলোতেও পক্ষ-বিপক্ষের আওয়াজ ওঠে। সেনাবাহিনীর চাপে কোয়ালিশন সরকারগুলোর অবস্থাও হয়ে পড়ে নড়বড়ে।

৯৭ সালে ইসলামপন্থী এরবাকান সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হলেও তুরস্কের মূলধারার রাজনীতিতে ইসলামপন্থীরা ধারাবাহিকভাবে তাদের অবস্থান দৃঢ় করে তোলে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে উদার ইসলামপন্থী দল একেপিকে তুরস্কের জনগণ এককভাবে নির্বাচিত করে। উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কারণে দলটির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়তে থাকে। পরবর্তী সব নির্বাচনে জয়লাভ করে দলটি। যা দেশটির বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

তুলনামূলক উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক সাফল্য ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও ইসলামপ্রীতির কারণে একেপি সরকারকে নানা সময় বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তবে বেশ দৃঢ়তার সাথে একেপি’র প্রাজ্ঞ নেতারা তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। এক্ষেত্রে তুরস্কের সেনাবাহিনী, বিচার ব্যবস্থা, অর্থনীতি– এই তিনটি প্রভাবক গুরুত্বের সাথে বিবেচ্য।

কামালবাদী মূলনীতির ধারক তুরস্কের সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। যারা ৬০ সালে ডেমোক্রেট ও ৭১ সালে সুলেমান ডেমিরেলের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণে সরাসরি নেতৃত্ব দেয়। শুধু তাই নয়, ৮০ ও ৯৭ সালে আরো দুটো নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করে সেনাবাহিনী।

২০০২ সালে একেপি ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীর ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নেয়। শুরু থেকেই নিজেদের সেক্যুলারিস্ট ও গণতান্ত্রিক হিসেবে দাবি করা একেপি ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়। আর এতে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ লাভের বিষয়টিকে ব্যবহার করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদের জন্যে সঙ্গত কারণেই ‘কোপেনহেগেন ক্রাইটেরিয়া’র শর্ত পূরণ আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। ক্রাইটেরিয়াতে বলা হয়েছিল, রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ রাখতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বেসামরিক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন হতে হবে এবং বছরে ছয়বারের বেশি বৈঠকে মিলিত হতে পারবে না।

ইইউ’র সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্যে গৃহীত এব পদক্ষেপের কারণে গণতান্ত্রিক ভাবাপন্ন ব্যবসায়ী, উদারবাদী বুদ্ধিজীবী ও কর্মতৎপর মধ্যবিত্ত সমাজের সমর্থন একেপি সরকারের দিকে ঝুঁকতে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জন করতে পারলে তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আরো বাড়বে বলেও মত দেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হোসেইন কিভরিকোগলু। এজন্যে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কট্টর সেক্যুলার ও প্রধান বিরোধীদলের ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে জনগণ রায় দেয়। এর ফলে প্রায় ৮৭ বছর ধরে দাপিয়ে বেড়ানো সেনাবহিনীর মুখে লাগাম পড়াতে সক্ষম হয় কৌশলী একেপি সরকার। 

বিচার ব্যবস্থা
তুরস্কের বিচার ব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রভাবশালী অঙ্গটি হলো ‘সাংবিধানিক আদালত’। ১৯৬১ সালে গঠিত এই সাংবিধানিক আদালতকে ৮২ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরো ক্ষমতাশালী করা হয়। সেক্যুলারিজমের সাথে সংঘর্ষিক যে কোনো রকম কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ ও রদ করতে সুপ্রিম কোর্টের এই প্রভাবশালী অঙ্গটি পুলিশিংয়ের কাজ করে থাকে।

বিভিন্ন সময় ইসলামপন্থী রাজনীতিক ও দলসমূহকে নিষিদ্ধ করে এই সাংবিধানিক আদালত। এছাড়া ৯৭ সালে এরবাকান সরকারকেও ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। এছাড়া সাংবিধানিক আদালত কুর্দিদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলটিকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে তুরস্কের সাংবিধানিক আদালতের কর্মকাণ্ড অনেকটা অগণতান্ত্রিক বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

২০১০ সালের গণভোটের রায় অনুযায়ী কিছুটা হলেও এখতিয়ার সরকারের অনুকূলে আসে। সে অনুসারে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি আইন পাশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়োগের দায়িত্বে থাকা ‘হায়ার কাউন্সিল অব জাজেজ অ্যান্ড প্রসিকিউটরস’ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে এসেছে।

অর্থনীতি
সেনাবাহিনীর অযাচিত হস্তক্ষেপ ও অস্থিতিশীল গণতন্ত্র, কুর্দি আন্দোলনসহ নানা কারণে এক সময় ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বেকারত্বের দেশ ছিল তুরস্ক। বিভিন্ন সময় তুরস্কের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও ২০০০-০১ সালের দিকে তা চরম আকার ধারণ করে। এসব বিপর্যয় সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী তুরস্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসে একেপি। ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বছরে ৭.৫ শতাংশ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় দেশটি।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুদের নিম্নমুখী হারের কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে পূর্বের তুলনায়। সাথে সাথে অর্থনীতিতে বেসরকারীকরণের ব্যাপ্তিকে সময়োপযোগী করে গড়ে তোলার কারণে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগও বেড়ে যায়। অর্থনীতিকে আরো গতিশীল ও জনকল্যাণমুখী করতে একেপি’র পদক্ষেপগুলো সফলতার মুখ দেখতে শুরু করে।

ফলে দেখা যায়, ২০০৮ সালে যেখানে গড়ে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৮’শ মার্কিন ডলার, ২০১১ সালে তা ১০ হাজার ডলার ছুঁয়ে যায়। যেটা সে সময় তুলনামূলকভাবে ইইউভুক্ত কয়েকটি দেশকেও ছাড়িয়ে যায়। এসব সফলতার কারণে জনগণ ধীরে ধীরে নিজেদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো অনুভব করতে থাকে।

২০০২ সালে দৈনিক ৪ ডলারের নিচে আয় করা লোকের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। আর ২০১২ সালে সেই সব লোকের হার চলে আসে ৩ শতাংশের নিচে। ফলে লোকজনের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যায়, বেড়ে যায় চাহিদা ও উৎপাদনের পরিমাণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকারের চুক্তি, তুর্কি লিরার মূল্য পুনর্নিধারণ, সুদের নিম্নমুখী হার ও বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে বিশাল পরিমাণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

তুরস্কের অর্থনীতি পূর্বের তুলনায় যে অনেক বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেছে তা সাম্প্রতিক সময়ের আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতেও স্বীকার করা হয়েছে। এই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই একেপি সরকারের সগৌরবে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকগণ। বিরোধীপক্ষের দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও সর্বশেষ নির্বাচনে একেপি’র প্রাপ্ত ভোটের হার অতীতের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।

এরদোয়ানের নেতৃত্ব

তুরস্কের ইসলামপন্থী রাজনীতিতে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন এরদোয়ান। প্রথমদিকে ইসলামপন্থী ব্যক্তিদের নিয়ে দল গঠন করলেও তিনি একেপি’কে ইসলামপন্থী হিসেবে প্রকাশ করতে দেননি। আদর্শিকভাবে দলটিকে সামাজিক রক্ষণশীল ও অর্থনৈতিক উদারবাদী হিসেবে তুরস্কের রাজনীতিতে তুলে ধরতে সক্ষম হন। বহুদলীয় গণতন্ত্র সূচনা হওয়ার পর তুরস্কের গণতন্ত্রে সংস্কারের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল তীব্রভাবে।

পাশাপাশি ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্যে সময়োপযোগী পদক্ষেপেরও দরকার ছিল। ঠিক এসব সংকটজনক পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় আসে একেপি। নিজের উপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন এরদোয়ান। দায়িত্ব পেয়ে এরদোয়ান মনোযোগ দেন দেশের সংকটজনক পরিস্থিতিগুলো মোকাবেলায়। জাতীয় ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারের নীতি প্রণয়ন করা হয়। প্রাথমিক এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে একেপিকে তুলে আনেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

শুরুর দিকে সেক্যুলারপন্থী সামাজিক আন্দোলন যেমন ফেতুল্লাহ গুলেনের মতো ব্যক্তিও সমর্থন দেন এরদোয়ানকে। প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতাও এরদোয়ান আমলে তুরস্কের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেন। ফলে সংবিধান সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও উন্নয়ন পদক্ষেপে এরদোয়ান উদার ও মধ্যপন্থী সেক্যুলাদেরও সমর্থন আদায় করে নিতে সক্ষম হন। স্বাধীনভাবে ধর্মীয় মূলবোধ ও গণতন্ত্র চর্চার প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে পরিচিত সেনাবাহিনীকে জনসমর্থনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা এবং সাংবিধানিক আদালতকে আরো গণতান্ত্রিক করার পদক্ষেপের বাস্তবায়ন জনগণ সমর্থন করে।

এরদোয়ানের চমক
জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে নানা সময় গৃহীত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে তুর্কি সরকার প্রধান রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সময়ে সময়ে কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ উঠা মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের পদচ্যুত করে এক্ষেত্রে অনমনীয় মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। এক সময়ের উন্নয়নশীল দেশ তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনীতির ১৮তম রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে এরদোয়ানের সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

রাষ্ট্রের উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে নানা সময় পালন করতে হয়েছে কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা। অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন উদারহরণ পাওয়া দুস্কর। মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াতেও রাষ্ট্রের তৎকালীন ছয়টি মূলনীতিতে ‘গণতন্ত্র’কে স্থান দেয়া হয়নি। জনসমর্থনের মাধ্যমে উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নের স্বার্থে এরদোয়ান কিছু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন। এটি সমালোচকদের দৃষ্টিতে ‘সুশাসন’ পরিপন্থী মনে হলেও দৃশ্যত তা তুরস্কের উন্নয়নকে টেকসই করেছে। ফলে এক সময়ের বৈদেশিক ঋণনির্ভর তুরস্ক বর্তমানে পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে ।

ইসলামী পূনর্জাগরণের পথ উন্মোচন
কামাল পাশার ইসলাম খেদানো কর্মসূচি একদিকে যখন চলছিল, আরেকদিকে ইসলামের ‘সন্তানরা’ ঠিকই জান দিয়ে ইসলামের পতাকা ধরে মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তুর্কির লোকেরা ইসলাম কী সেটা জানে একজন লোকের কারণে, তিনি বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী। তিনি পাহাড় থেকে পাহাড়ে ইসলাম সাথে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। আর তাঁর লেখা তাফসীর ‘রিসালায়ে নূর’ তাঁর সহচররা হাতে হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন ইজমির থেকে গাজিয়েনতেপ, ইস্তানবুল থেকে কায়সারি পর্যন্ত। গ্রামের পাহাড়ে বসে লেখা বই নাড়িয়ে দিচ্ছিল আংকারার তখত।

এই মহান পুরুষের রুহানী সন্তানেরা বার বার চেষ্টা করেছেন ইসলামকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। ‘৬০ এর দশক থেকে প্রতি দশকে কমপক্ষে একবার করে তাদের সেই চেষ্টাকে ক্যু, ফাঁসি, গণহত্যা, জেল, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ইত্যাদির মাধ্যমে ‘আতাতুর্কে’র ‘সন্তান’রাও রুখে দিয়েছেন। একবার নয়, বারবার এই ঘটনা ঘটেছে। ‘৭০ এর দশকে তুর্কির অবিসংবাদিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব নাজিমুদ্দীন এরবাকান শুরু করেন মিল্লি গুরুশ বা ন্যাশনাল ভিশন আন্দোলন।

এটাই ছিল তুর্কির ইসলামপন্থী আন্দোলন। আজকের এরদোয়ান, গুল, দাউতোগলুসহ সকল ইসলামী নেতা হোজ্জা এরবাকানের প্রত্যক্ষ বা রুহানী ছাত্র। ১৯৯৭ সালে যখন এরবাকানের নির্বাচিত ইসলামপন্থী সরকারকে মাত্র ৮ মাসের মাথায় ক্যু করে উৎখাত করা হলো তখন ইস্তানবুলের সাবেক মেয়র এবং তুখোড় তরুণ ইসলামী নেতা রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও আব্দুল্লাহ গুল একটি আপাত মধ্যমপন্থী ধারার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করলেন। দলের নাম আক পার্টি বা একেপি; ইংরেজিতে জাস্টিস এন্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি। ২০০২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বারংবার সব ধরনের স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে নিরংকুশভাবে জয়লাভ করে চলেছে এই আক পার্টি।

যেভাবে সম্ভব হয়েছে
এরদোয়ানরা ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরগুলোতে কিছু ইন্সটিটিউশান গড়ে তোলায় গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন। জোর-জবরদস্তি করে ক্ষমতায় থাকা কেমালিস্ট দলটির অদ্ভুত অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে তুর্কি অর্থনীতি নিজেকে মোটেই মেলে ধরতে পারছিল না। এরদোয়ানদের সাথে যারা আক পার্টি গড়ে তোলায় এগিয়ে এসেছিলেন এদের অনেকেই এসেছিলেন মূলত অর্থনৈতিক দর্শনে মিল থাকার কারণে, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে নয়। এরদোয়ানের পার্টি যে অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করেছিল সেটা ছিল উদারনৈতিক পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের জন্য খুবই উপযোগী।

এরা খুব ঝানু ব্যবসায়ী আর ব্যক্তিগতভাবে পরহেযগার। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবসময় আইনের শাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আক পার্টি প্রশাসনযন্ত্রের উঁচু স্তরে অন্তত একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন যাতে ব্যবসায়ীদের মনে এই আশ্বাস জন্মেছিল যে, এখানে ব্যবসা করলে চাঁদাবাজি আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্য সহ্য করতে হবে না। বিশ্বব্যাংকের ডাটা বলছে, ২০০৫ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৬ হাজার ডলারের একটু বেশি আর ২০১৩ সালে এটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ডলারের উপরে। মূলত অর্থনৈতিক শক্তিই হচ্ছে এরদোয়ানদের পায়ের নিচের সেই মাটি যার উপরে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে এরদোয়ান তাঁর অন্য এজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তুর্কি ইসলামপন্থীদের একটা বড় অংশ হচ্ছে ১৯৬০-৯০ এর দশকে গ্রাম থেকে শহরে আসা ইমিগ্রেন্ট জনশক্তি। এই সময়টা তুর্কির নগরায়নের সময়। বলাই বাহুল্য, রাজার নীতি নিয়ন্ত্রণ করে শহর। শহুরে মডার্নিটির ইট পাথরে এই জনগোষ্ঠী গড়হাজির থাকতেন আর ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলেন আনাতোলিয়ান ইসলামের সুগন্ধ।

রাজনীতি বা সংস্কৃতি, শিক্ষা বা ব্যবসা এসব কিছুতেই তাঁরা খুঁজেছেন একই ফ্লেভারের কোনো গ্রুপ। এই গ্রুপ একদিকে যেমন ইসলামপন্থীদেরকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে ওয়াকফ ও দান করার আনাতোলিয়ান সংস্কৃতিকে পুরোপুরি জারি রেখেছে। এর ফলে সামাজিক সেবার এক বিরাট নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এসব নেটওয়ার্কের অনেকগুলোই বিভিন্ন সুফী খানকা দ্বারা উদ্বুদ্ধ বা জড়িত।

কিন্তু হাল আমলের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এসব সামাজিক সেবার নেটওয়ার্ক সবসময় ইসলামপন্থী আন্দোলনের সহায়ক শক্তি হিসাবেই কাজ করে গেছে। অন্তত জনগণের চোখে ইসলামপন্থী আন্দোলন আর এইসব সামাজিক কর্মসূচি, যা আসলে একটা সমান্তরাল রাষ্ট্রের মতই, সকল বিপদে-আপদে মানুষের কাজে এসেছে, এদের মধ্যে কোনো ফারাক চোখে পড়েনি। এসব নেটওয়ার্কের রয়েছে হাজারো স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, এনজিও, রাইটার্স গিল্ড, বহু পত্রিকা, বেশ কিছু টিভি চ্যানেল আর প্রকাশনা সংস্থা।

এই পুরা কর্মযজ্ঞ ও যন্ত্রই ইসলামীকরণের ইঞ্জিন হিসাবে কাজ করেছে। সময়মত সবকিছু একই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের দিকে ‘ক্লিক’ করেছে। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে অসম্ভব মেধাবী, কৌশলী ও দুনিয়াদারীর বুঝওয়ালা একদল অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বের হাতে। স্মরণ করা যেতে পারে, এই লোকগুলো কীভাবে নিয়মিত ইউরোপিয়ান, ইজরাইলী বা আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটদের নাকানিচুবানি খাওয়ান।

এর সাথে যোগ হয়েছে একটা নূন্যতম মান পর্যন্ত সার্বজনীন শিক্ষা। বর্তমানে তুর্কি স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিটিউটের ডাটা বলছে, সাক্ষরতার হার ৯৮.৭৮%। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এটা ৫৮% এর কাছাকাছি। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আদর্শবাদী কোনো উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত করা যত সহজ অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেটা ততটা সহজ নয়। বিশেষত তা আরো কঠিন যদি পেটে ক্ষুধা থাকে। একবেলার ভাল খাবার আর ভোট এইসব দেশে তাৎপর্যের দিক থেকে খুব কমই পার্থক্য বহন করে।

আরেকটা ব্যাপার সম্ভবত তুর্কিদের ক্ষেত্রে খুব সহায়ক ছিল। ইসলামপন্থীরা শুধু উসমানী খিলাফাতের ৬২৩ বছরের গৌরবজ্জ্বল অতীতের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে সেদিকে ফিরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করাই জনসমর্থন মোবিলাইজ করার জন্য অনেক বড় শক্তি ছিল। মুস্তাফা কামাল বই পুস্তক উলটে-পালটে দিয়েছেন, কিন্তু অলি-গলিতে গগনচুম্বী সুউচ্চ মিনারগুলো তো এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে উসমানী খিলাফাতের গাঁথা আর গৌরব।

মো: নাছের মাহমুদ
লেখক: গবেষক ও শিক্ষার্থী
মাদ্রাসা-ই-আলীয়া ঢাকা