রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই অগ্নি দুর্যোগ কোন ভাবেই থামছে না। এক ঘটনার রেশ না কাটতেই আবার নতুন ঘটনা ঘটছে। কোন দুর্ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পর সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বিষয়টি নিয়ে কিছুটা সক্রিয়তা দেখালেও তা বেশিদিন স্থায়ী হচ্ছে না। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বারবার।

মূলত অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ, সহায়ক অবকাঠামো ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন করা হচ্ছে ঠিক ততটুকুই। সঙ্গত কারণেই সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নগরজীবনে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমছে না।

মূলত যুৎসই পরিকল্পনার অভাব, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অনিয়ম, দুর্নীতি, দায়ীত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণেই আমাদের দেশে বিশেষ ঢাকা নগরীতে অগ্নি দুর্ঘনার প্রকোপ আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর টিকাটুলির একটি সুপার মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ২০ নভেম্বর বিকেলে মার্কেটের দোতলায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ব্যাপক। বস্তুত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বেআইনী ও অনুমোদনহীন স্থাপনা, ভবন নির্মাণের সময় অগ্নি নির্বাপণে যথাযথ সুযোগ সুবিধা না রাখা, অপ্রশস্ত সিঁড়ি, বহির্গমনে অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত না করা এজন্য প্রধানত দায়ী।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ সাম্প্রতিক এক জরিপে ঢাকার জনবহুল ভবন বিশেষ করে হাসপাতাল, শপিং মল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ২ হাজার ৬ শ ১২টি ভবনের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেখেছে। কিন্তু ফলাফল শুধুই হতাশাব্যঞ্জকই নয় বরং রীতিমত উদ্বেগজনকই বলতে হবে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, মাত্র ৭৪টি ভবন ছাড়া বাকি সব ভবন তথা দুই হাজার ৫৩৮টি ভবন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকার অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত বনানীতে কেনাকাটার জন্য বেশ জনপ্রিয় সুপার মার্কেটগুলোও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। অগ্নি নির্বাপণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এসব সুপার মার্কেটগুলো এখন রীতিমত মৃত্যুফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকারে অকুস্থল থেকে বেরিয়ে আসার পথ এবং আগুন নেভানোর ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রশস্ত সিঁড়ি এবং এক ভবন থেকে আরেক ভবনের প্রয়োজনীয় দূরত্ব রক্ষা করা জরুরি হলেও ভবন নির্মাণে এসব অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ অনুসরণ করা হয় না। অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি ভবনে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকা। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। মূলত বহুতল ভবনে আগুন নির্বাপণ ও জরুরি নির্গমনে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি। এগুলো হলো-রাইজার স্থাপন, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিং কলার, আন্ডারগ্রাউন্ড পানির রিজার্ভ, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, স্মোক ও হিট ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন ও ফায়ার লিফট নির্মাণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের অল্প সংখ্যক ভবনেই এসব নিয়ম মানা হয়। ফলে নিয়মিত বিরতিতেই অগ্নিকান্ডে হতাহত ও সম্পদের ক্ষতি ঘটনা আমাদের নগর জীবনে অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে।

আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও আইন অমান্যের প্রবণতাও অগ্নি দুর্ঘটনার জন্য কম দায়ী নয়। আমাদের দেশে অগ্নি প্রতিরোধ, নির্বাপণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও তা মানেন না সিংহভাগ ভবন মালিক। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারা ও অর্থদন্ডসহ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তি বিধানও থাকলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণের তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এ আইন প্রয়োগের নিয়ম থাকলেও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নানাবিধ সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণে এসব আইনের প্রয়োগ নেই। এজন্য ভবন মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতায় প্রধানত দায়ী।

এজন্য গণসচেতনতার অভাবও কম দায়ী নয়। নাম মাত্র অনুমোদন নিয়ে বা না নিয়েই গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও মার্কেটসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। অনিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে নিয়ম না মানা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে এক দিকে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে অগ্নিকান্ডের পর নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবন থেকে জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা আরও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এসব অসঙ্গতি দূর করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা করা জরুরি হলেও সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দায়িত্বহীনতার কারণে সমস্যা তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে যাচ্ছে।

সঙ্গত কারণেই রাজধানীসহ সারা দেশেই অগ্নিদুর্ঘটনার অতিস্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত দশ বছরে আমাদের দেশে প্রায় ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডজনিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় ১ হাজার ৫শ ৯০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজধানীর গুলশান-১ সংলগ্ন ডিএনসিসি মার্কেটের পাশে কাঁচাবাজারে ঘটে যায় আরো একটি ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। ফায়ার সার্ভিসের সাথে গুলশানের এই অগ্নিকান্ড নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর কিছু বিশেষ সদস্যরা যোগ দিয়েছিল। রাজধানীর পল্লবীর চলন্তিকা বস্তিতেও এ বছরই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুরো বস্তিই ভষ্মীভূত হয়েছে।

গুলশান অগ্নিকান্ডের মাত্র একদিন আগে ঢাকার বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর তৎপর অগ্নি নির্বাপণ ও পরবর্তী উদ্ধার কাজের পরেও প্রায় ২৫ জন নিহত ও অর্ধ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে বলে সরকারি খবরে জানানো হয়েছে। ভবনটির নবম তলা থেকে এই অগ্নিকান্ডের উৎপত্তি ঘটেছিল বলে জানা যায়। তবে এই আগুন লাগার পরে দেখা গেছে সেখানের জরুরী নির্গমন রাস্তাটি পুরোপুরি ছিল বন্ধ। গণপূর্ত মন্ত্রীর বক্তব্য মতে, ভবনটির মালিক মূল নকশা না মেনেই নির্মাণ করেছিলেন এই এফআর টাওয়ার। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ২০১৯ সালেই আরো একটি ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে রাজধানীতে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার চকবাজার সংলগ্ন এলাকায় একটি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে দ্রুত আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পরে। সরকারি হিসাব মতে চকবাজারের এই অগ্নিকান্ডে ৭৮ জন মানুষ মারা যায়। এতে অগণিত মানুষ আহত ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

২০১০ সালে রাজধানীর নিমতলীতে অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু সেই অগ্নিকান্ডের পরেও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার কোন ধরনের পদক্ষেপই নেয়নি বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থার নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের বড় ধরনের ভবনগুলোতে আগুন লাগলে প্রচুর মানুষ হতাহত হবে এমনটাই স্বাভাবিক। কেননা, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণেই ফায়ার সার্ভিসের সেফটি রুলস না মেনেই এবং অন্যান্য আরো অনেক নিয়ম উপেক্ষা করেই নির্মাণ করা হয় ভবনগুলো’।

এছাড়া ২০১২ সালের তাজরীন ফ্যাশনস্ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে একশ সতের জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায় ও প্রায় দুই-শতাধিক মানুষ আহত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে কারখানায় আগুন লাগার মধ্যে এটিই সবচাইতে ভয়াবহ বলে গণ্য করা হয়।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালেই টঙ্গীতে অবস্থিত একটি সিগারেটের কারখানায় বিস্ফোরণের কারণে আগুন লেগে প্রায় ২৫ জন নিহত হয়েছিল। এমন সময় পাঁচতলা সেই ভবনটির উপরের তিনতলা আগুনের কারণে ধসে যায়। একই সালে গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় একটি কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের কারণে আগুন ধরে যাওয়ার পর সেখানে পাঁচজন নিহত ও প্রায় দশজন আহত হয়েছিল বলে জানা যায়। ফায়ার সার্ভিসের দেয়া তথ্যমতে ঢাকায় প্রায় এগারো হাজার বহুতল ভবন এই ধরনের অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এই ধরনের সকল ভবনের ফায়ার সার্ভিস থেকে কোন ধরনের ছাড়পত্র নেই এমনকি আগুন নেভানোর কোন পরিকল্পনাও নেই। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

মূলত মাত্রাতিরিক্ত যানজট, বসতি এলাকায় রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ, অনিয়ন্ত্রিত সড়ক দুর্ঘটনা আর লাগামহীন অগ্নিকান্ডের ফলে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হতে যাচ্ছে ঢাকা মহানগরী। প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১৮ সালে রাজধানী ঢাকাতেই ২ হাজার ৮৮টি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিশ্বের অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকাকে। ঢাকার অগ্নি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সে চিত্রই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে।

বসুন্ধরা সিটি: ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ বসুন্ধরা সিটিতে আগুন লাগে। এ আগুনে প্রাণহানি না ঘটলেও পুরো ঢাকা শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল তীব্রভাবে। কারণ, এই অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি ছিল স্মরণকালের সর্ববৃহৎ।

নিমতলী: ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর নবাব কাটরায় রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারান নারী ও শিশুসহ প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ। ঘটনার সময় ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় দুই বোন এবং পাশের বাড়িতে এক মেয়ের বিয়ের আয়োজন চলছিল। বাড়ির নিচতলায় রান্না চলছিল রান্না-বান্নার কাজ।

রান্নার জায়গার পাশেই ছিল কেমিক্যালের গুদাম। প্রচন্ড তাপে গুদামে থাকা কেমিক্যালের প্লাস্টিক ড্রাম গলে যায়। এরপর মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

তাজরীন ফ্যাশনস্: ২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১১১ জন প্রাণ হারান। ঢাকা মহানগরীর উপকণ্ঠ আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড কারখানায় ভয়ানক এ দুর্ঘটনায় নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। এতে সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোশাকশ্রমিক। আগুন থেকে রেহাই পেতে উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরও ১০ জনের।

রাজধানীর বস্তি: ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ দিবাগত রাতে মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। এর আগে ২০১৬ সালের ০৫ অক্টোবর হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ সংলগ্ন শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে ঊফ বাজার বস্তিতে আগুনে পুড়ে যায় ৫০টি ঘর। এছাড়া ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর একই বস্তিতে লাগা আগুনে প্রাণ হারান ১১ জন। একই বছর ১২ মার্চ রাজধানীর পল্লবীর ইলিয়াস আলী মোল্লা বস্তিতে আগুন লাগে। অগ্নিকান্ডে বস্তির প্রায় ৫ হাজার ঘরের সব পুড়ে যায়।

ডিএনসিসি মার্কেট: ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি ভোরবেলা গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মার্কেটটির বহু দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ছাড়াও চলতি বছরের ৩০ মার্চ ভোরে আবার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ভোর ৫টা ৪৮ মিনিটে মার্কেটের কাঁচাবাজারের পূর্ব পাশে আগুন লাগে।

চকবাজারের চুড়িহাট্টা: চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। রাত পৌনে ১১টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। জানা যায়, সেখানে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় আগুন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ অগ্নিকান্ডে ৭০ জন নিহত হন। আহত হন অনেকেই।

বনানী এফআর টাওয়ার: চলতি বছরের ২৮ মার্চ রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন প্রায় ৭০ জন।

গার্মেন্টস শিল্প: ২০১২ সালে গরীব অ্যান্ড গরীব গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডে নিহত হন ২১ জন। এছাড়া হামীম গ্রুপে অগ্নিকান্ডে ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালের ২৮ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্মার্ট এক্সপোর্ট গার্মেন্টস লিমিটেডে আগুনে পুড়ে ৭ নারী পোশাকশ্রমিক নিহত হন।

মূলত অপরিকল্পিত নগর কাঠামো, সেকেল ইমারতবিধি; সর্বপরি প্রায়োগিক দুর্বলতা, নির্মাণ ক্ষেত্রে ইমারতবিধি লঙ্ঘন, আইন, গণসচেতনার অভাব, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুলতা, সংশ্লিষ্টদের অতি মুনাফার হীনমন্যতা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যর্থতা ও উদাসীনতা আমাদের দেশে অগ্নি দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণ। মূলত আমাদের দেশে ইমারত নির্মাণের আইন তৈরি হয়েছে ২০০৬ সালে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও ইমারত আইন হালনাগাদ করা হয়নি। এমনকি বিদ্যমান আইনের পক্ষেও যথাযথ জনমতও গঠন করা হয়নি।

ক্ষেত্র বিশেষে অজ্ঞতার কারণেই ইমারত নির্মাণে ইমারতবিধি মানা হচ্ছে না। ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বিশেষত বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগের যথাযথ তদারকির অভাবে ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বাধ্যবাধকতা মানা হয় না। তাই অগ্নিদুর্যোগও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। তাই সর্বসাধারণের জন্য নিরাপদ নগর ব্যবস্থা নিশ্চিত সর্বোপরি অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে ইমারত নির্মাণবিধি হালনাগাদ করণ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের কোন বিকল্প নেই। আর এ দায়ভার পুরোপুরি সরকারের।

[email protected]
লেখক: ইবনে নূরুল হুদা

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি