কালের গতিধারায় কেলেন্ডারের পাতা থেকে আরও একটি বছর বিদায় নিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিদায়ী বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির, সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব মিলানোটা বেশ জরুরি হয়ে পড়েছে। এক কথায় হালখাত বলা চলে।

সরকার বলছে তারা বিদায়ী বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় সকল ক্ষেত্রেই সফলতার ও সার্থকতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষ তাদের এ দাবির স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তারা সরকারের ব্যর্থতাগুলোকে মূখ্য হিসাবে উল্লেখ করছেন। সাফল্যকে একেবারে গৌণ হিসাবে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুত্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে বেশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে মনে করছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা। একই সাথে বিভিন্ন দেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে জনশক্তি রফতানির বাজার উন্মুক্ত এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের আশানুরূপ অগ্রগতিরও দাবি করা হচ্ছে।

আর বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি নিয়েও সরকার বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছে বলে দৃশ্যত মনে হলেও বাস্তবতা কিন্তু অনেকটাই আলাদা। যা সরকারের আষাঢ়ে গল্প বলেই মনে করছেন আত্মসচেতন মানুষ।

মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের কথা বলা হলেও এসব প্রচারণার মধ্যে মারাত্মক শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলেই মনে করেন অভিজ্ঞমহল। পদ্মাসেতু নির্মাণে খাজনার চেয়ে বাজনাটা বেশী বলেই মনে হচ্ছে। বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হলেও মূলত সরকারের বিদেশনীতি সম্পূর্ণ একদেশদর্শী বলেই প্রতীয়মান।

জনশক্তি রফতানী ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও এর যতার্থতা খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বরং বৈদেশিক শ্রমবাজারে ধ্বস নামায় রেমিটেন্স প্রবাহেও মন্দাভাবের সৃষ্টি হয়েছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আর এ ধারা অব্যাহত থাকলে তার পরিণতি শুভ হবে বলে মনে হয় না।

বিভিন্ন বিষয়ে সরকার আত্মতুষ্টিতে থাকলেও মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে সরকারের কথিত সাফল্য অনেকাংশেই ম্লান হয়েছে বলে মনে করছেন খোদ সরকার সংশ্লিষ্টরাও। বিশেষ করে রাজধানীর হলি আর্টিজান বেকারিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলা, বিচারবহির্ভূত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনা, বিরোধীদের দমনে একের পর এক মামলা-হামলা ও সভা-সমাবেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতা এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে।

একই সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের টেন্ডার ও চাঁদাবাজি, দখলবাজী, সন্ত্রাস এবং নিজেদের মধ্যে কোন্দলের ঘটনাও ক্ষমতাসীনদের প্রায় সময়েই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এছাড়া বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দেয়া, বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট জালিয়াতি এবং খুনাখুনির ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সরকার এসব বিষয় আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না।

৫ জানুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দাবি করে আসছে, বর্তমান সরকারের সময়ে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কিন্তু সরকারের এ দাবির কোন সারবত্তা খুঁজে পাচ্ছেন না অর্থনীতিবিদরা। তবে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে কোন সাফল্য সরকার পক্ষও দাবি করছেন না। অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টার পরও বড় ধরনের সুফল আসছে না।

মূলত মাননীয় মন্ত্রীর আত্মস্বীকৃতি থেকেই দেশে বিনিয়োগের বেহাল দশার ছাপটা খুবই সুষ্পষ্ট। যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অশনিসংকেতই বলতে হবে।

আসলে বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দায় শ্লথ করে দিয়েছে দেশের অর্থনীনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে। চিহ্নিত কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার কারণে মন্দাভাব কাটছে না বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। সরকারের এই তিন বছরে পদ্মা সেতু ছাড়া দৃশ্যমান কোনো বিনিয়োগ নেই। যদিও বিষয়টি নিয়ে আগাগোড়ায় বিতর্ক রয়েছে। যেটুকু বেড়েছে তার হিসাব সীমাবদ্ধ রয়েছে কাগজে-কলমে।

ফলে কাঙ্খিত হারে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি। যা ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যাকে জটিল হতে জটিলতর করে তুলেছে। এ পরিস্থিতির সঙ্গে যোগ হয়েছে রেমিটেন্সে ধস, দুর্বল অবকাঠামো, নিন্মমানের ব্যবসার পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন কঠিন হবে।

এমনকি এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশের ওপরে যাবে না বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিনিয়োগ মন্দা ও রেমিটেন্স কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্র অর্জিত হবে না বলে মন্তব্য করা হয় এ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিবেদনে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না পর্যাপ্ত জমি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে। নতুন শিল্প স্থাপনে গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও ঋণের সুদের হার কিছুটা কমলেও এখনও সিঙ্গেল ডিজিটে আসেনি।

আওয়ামী লীগের ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমুন্নত এবং নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন নিশ্চিত করার মতো মৌলিক প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণী ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সিভিল সমাজসহ দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রকৃত অর্থে কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। বরং এ দীর্ঘ সময়জুড়ে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করেছে। চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে কোন কার্যকর ভূমিকা গ্রহণে সরকারকে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে না। বরং যেনতেনভাবে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার একটা প্রাণান্তকর প্রয়াসই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আসলে বিরোধী দলকে দমন করতেই সরকার বিরাজনীতি করণের পথকে বেছে নিয়েছে। থেমে থেমে চলেছে সন্ত্রাসবাদী ও উগ্রবাসী তৎপরতাও। যদিও বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সময়ে সময়ে বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে বিভিন্ন দেশ। কেউ কেউ এ দেশ থেকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়েও নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম তাদের নির্ধারিত খেলা বাতিল করেছে।

দেশে-বিদেশে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৫৩ জন সংসদ সদস্য। ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ওই বছর ১২ জানুয়ারি টানা দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো একতরফা নির্বাচন হওয়ায় তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছিল। তবে প্রতিবেশী ভারত এ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছে এবং সে সমর্থন এখনও অব্যাহত আছে।

তৃতীয় বছর ২০১৬তে এসে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড বেশ আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কুমিল্লায় সোহাগী জাহান তনু হত্যা, চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতু হত্যা এবং তিতুমীর কলেজের ছাত্রী আফসানা হত্যা।

এসব হত্যার তদন্তের অগ্রগতি এখনও পর্যন্ত আশানুরূপ না হওয়ায় সমালোচিত হচ্ছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। যা সরকারের ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। এ ছাড়াও ২০১৫-এর প্রথম থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বিদেশী নাগরিক, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার ধর্মযাজক রয়েছেন।

কিন্তু সরকার ঘটনার মূলে না গিয়ে এসব ঘটনার প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ি ও বিরোধী দলের সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হিসাবে উল্লেখ করেছে। ফলে এসব ঘটনায় দায়িদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি বরং অপরাধীরা আস্কারা পেয়ে অতিমাত্রায় অপরাধ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

গত বছর দেশের দুটি স্থানে বড় ধরনের সংখ্যালঘু হামলা হয়। একটি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে অপরটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। অভিযোগ ওঠে, গত ৬ ও ৭ নভেম্বর চিনিকলের জায়গা দখল নিয়ে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেয় পুলিশ।

এ ছাড়া গত ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। কিন্তু সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এসব ঘটনার পর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে লোক দেখানো ও দায়সারা গোছেরই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে ৫৩৫ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ১৭২ জন, ২০১৫ সালে ১৮৫ জন ও ২০১৬ সালে ১৭৫ জন। একই সময়ে গুমের শিকার হন ১৯৫ জন। এদের মধ্যে ২০১৪ সালে ৩৯, ২০১৫ সালে ৬৬ ও বিদায়ী বছরে ৯০ জন। এ ছাড়া গত তিন বছরে আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলজনিত সংঘর্ষে ১৪৬ জন নিহত হয়েছেন।

সরকার বিরোধীদের অভিযোগ, গত তিন বছরে বিরোধী দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোও তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে। তিন বছরের অনেক সময়েই মাঠের বিরোধী দল বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করার মতো সাংবিধানিক কোনো অধিকারই দেয়া হয়নি। যখন দলটি অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন তারা। শুধু তাই নয়, মামলা-হামলা করে অনেকটা কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে তাদের।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও মামলার হাত থেকে রেহাই পাননি। বিএনপির দাবি, তিন বছরে প্রায় ২০ হাজার মামলায় কয়েক লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। শুধু বিরোধী দল নয়, গত তিন বছরে ভিন্নমত দমনেরও নানা ঘটনা লক্ষ করা গেছে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার কারণেও বিভিন্ন পেশাজীবীকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তাদের হয়রানি করা হয়েছে। এতে প্রকৃত গণতন্ত্র ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সংসদের বাইরে মাঠের বিরোধী দল বিএনপিকে শুরু থেকেই কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ ওঠে। জনগণের কোনো দাবি নিয়ে বিএনপি মাঠে নামতে পারেনি। নানা অজুহাত দেখিয়ে গত তিন বছরে তাদের সাতটি সমাবেশ করতে দেয়নি ক্ষমতাসীনরা। নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে সমাবেশ করাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে চলে সহিংসতা। তিন মাসের সহিংসতার পর কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু তার পরও মাঠে নামতে পারেনি বিএনপি। তিন বছরের মধ্যে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি নানা শর্তে একটি সমাবেশ করতে দেয়া হয় বিএনপিকে। এরপর আর তাদের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি।

৭ নভেম্বর উপলক্ষে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ও পরে নয়া পল্টনে সমাবেশের অনুমতি চাইলেও সরকার তা দেয়নি। সর্বশেষ ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে ৭ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চায় বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তা আমলেই নেয়নি। অথচ একই মাঠে ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি এবং মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ সমাবেশ করে।

বিরোধীদের মাঠে নামতে না দেয়ার পাশাপাশি বিগত তিন বছরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনেও দেখা যায় একতরফা আধিপত্য। বিনাভোটেই নির্বাচিত হন শত শত স্থানীয় প্রতিনিধি। অথচ গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে জনগণের শাসন। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে জনগণই বেশী উপেক্ষিত হয়েছে।

গত তিন বছরে ঢাকার দুই, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও সর্বশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ছাড়া সব নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ব্যাপক সহিংস ঘটনায় কয়েকশ’ মানুষের প্রাণহানি এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের রেকর্ড সৃষ্টি হয়। যদিও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ছয় ধাপে চার হাজারেরও অধিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু ও ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বোচ্চ ২০৭ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ডও সৃষ্টি হয় এ নির্বাচনে। পরে অক্টোবর পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনেও ওই সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

এর আগে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা, বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের প্রার্থী হতে বাধা দেয়া, ভোটার ও প্রার্থীদের মারধর করাসহ নির্বাচনী অনিয়মের কারণে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে ছিল সরকার। যা দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য মোটেই সুখকর নয়।

৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অনেক এমপি বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাগোষ্ঠী কড়া সমালোচনা করেছিল। এই সরকারের শুরুর দিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে এক বৈরী সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।

এ জন্য সরকার প্রতিবেশী ও পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিদেশীদের আস্থায় আনতে সরকারের প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তাই সরকারকে ছাড় দিতে হয়েছে। তার একটা বড় দৃষ্টান্ত হল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য পদে জাপানকে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা।

পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেক লবিং করতে হয়েছে সমর্থন পেতে। তবে প্রথম দিকে আমেরিকা ও ইউরোপ যেভাবে সরকারের প্রতি সমালোচনামুখর ছিল, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। প্রতিবেশী ভারত এই সরকারের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছে।

পশ্চিমাদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে চীন বর্তমান সরকারের সঙ্গে জোরালোভাবে কাজ করতে শুরু করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করে দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত করেন। ওই সময়ে সই হয় প্রায় ২৭টি চুক্তি। যা সরকারের স্নায়ু কমাতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে।

সরকার ও বিরোধী পক্ষ যত কথায় বলুক না কেন দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ঘাটতির বিষয়টি খুবই সুস্পষ্ট। বিশেষ করে দেশে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক কার্যক্রম নিয়ে নানাবিধ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সম্পৃক্ততা একেবারে নেই বললেই চলে।

কিন্তু দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে কোন জাতিই কখনো উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়নি। আর শাসনকাজে জনগণের অংশগ্রহণ না থাকলে জাতীয় উন্নয়নেও জনগণকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয় না।

মূলত ফরাসী বিপ্লবের পর জনগণকেই শাসন ক্ষমতায় সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। ফলে ফরাসীরা অতিঅল্প সময়ের মধ্যেই উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই সরকারের বিভিন্ন সাফল্য ম্লান করে দিয়েছে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব ও ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা।

তাই জাতিকে আত্মমর্যাদাশীল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশে অবাধ গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় আমাদের সকল অর্জনই ম্লান হতে বাধ্য।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমএনজে