নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। অভিযোগ ইসি নিরপেক্ষ নয়। বরং ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবাহী একটি প্রতিষ্ঠান। আর সিইসি সহ অপরাপর কমিশনাররা সরকারের দাসানুদাস। কমিশন সরকারি দলের অঙ্গলী হেলনেই সবকিছু করে থাকে। ‘যেমনি নাচায় তেমনি নাচি’ এমন অবস্থা।
অনেকে মেরুদন্ডহীন কমিশন বলতেও কসুর করেন না। আবার এমনও শোনা যায় যে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন নয়। তাই সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কমিশনের কিছু করার থাকে না। সম্প্রতি এমন কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মুখে। যা দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে।
তিনি বলেছেন, তার কথায় নাকি কিছুই হয় না। তাহলে একথা ধরেই নিতে হয় যে, কোন এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় চলে নির্বাচন কমিশন। নেপথ্যের শক্তিই হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের চালিকা শক্তি। অভিযোগ মতে, নির্বাচন কমিশন হলো ‘পুতুল নাচের নাট্যশালা’! কমিশনাররা কুশীলব! বাস্তবতা যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে ‘নিধিরাম সর্দার’ আর ‘পালের গোদা’ হয়ে না থেকে আত্মসম্মান নিয়ে তিনি সহ বর্তমান কমিশনকে অনেক আগেই কেটে পরা উচিত ছিল বলেই মনে হয়।
সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থেকে, রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ও জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের সৎকার করে ‘তাল পাতার সেপাই’ আর ‘গদাই লস্করী’ হয়ে থাকার চেয়ে বেয়াই-বিয়ানকে সময় দেয়া বেশী সম্মানের। সিইসি নিকট-অতীতে ডাকসাইটে আমলা ছিলেন। আর আমলাদের আত্মসম্মানটা অন্যদের চেয়ে একটু বেশীই থাকার কথা। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমই মনে হয়। ‘আমলার আমলনামা’টা মোটেই যুতসই হয়নি। আর বিপত্তিটা তো এখানেই।
মূলত স্বাধীনতার চেতনা লালন ও ধারণ না করলে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কখনো স্বাধীন হতে পারে না। আর কোন দেশের একাধিক স্বাধীন স্বত্তা থাকে না বা থাকা উচিতও নয়। কারণ, সবকিছুই রাষ্ট্রের অধীন। আর রাষ্ট্রই শুধু স্বাধীন-সার্বভৌম। কিন্তু রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে আবার স্বেচ্ছাচারি হিসাবে দেখা যাবে না। রাষ্ট্র সহ সকল স্বাধীনতাই সংবিধান ও আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। তাই রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারি হওয়ার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের সবকিছু সংবিধান ও
আইনানুগভাবে চলছে কিনা তা তদারক করা। কোথাও কোন ব্যত্যয় ঘটলে তার যথাযথ প্রতিবিধান করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সংবিধান ও প্রচিলত আইন যাকে যে অধিকার দিয়েছে প্রত্যেকের জন্য সে অধিকার নিশ্চিত করা। দেশের মানুষ এসব নিশ্চয়তা প্রদানের বিনিময়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল হয়; কর প্রদান করে। কিন্তু জনগণ রাষ্ট্রের কাছে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে কি না সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।
কারো অধিকার হরণ করার স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে দেয়া হয়নি। কিন্তু আমাদের প্রধান সমস্যাই হলো আমরা শুধু নিজের অধিকার বিষয়েই সচেতন। অন্যের অধিকারটা আমাদের কাছে মূখ্য নয়; শুধুই গৌণ। আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতাও এজন্য কম দায়ি নয়। আত্মপুঁজাটা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। আর এ বৃত্ত থেকে কোন ভাবেই বেড়িয়ে আসতে পারছি না। আসলে সংবিধিবদ্ধ স্বাধীনতা-অধীনতা বড় কথা নয় বরং দাসপ্রবণ মনোবৃত্তিই আমাদের জাতীয় অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়।
সংবিধান ও আইন দিয়ে যতই স্বাধীনতা দেয়া হোক আমরা যতক্ষণ মানসিক দাসত্বের শৃঙ্খলমুক্ত না হতে পেরেছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোন ভাবেই প্রকৃত স্বাধীন হতে পারবো না। স্বাধীনতার সুফলটাও আমাদের হাতে ধরা দেবে না। তাই আমাদের নির্বাচন কমিশনের উপর সরকারের খবরদারির বিষয়টি মূলত গৌণ, মুখ্য হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ অপরাপর কমিশনারদের দাসপ্রবণ মনোবৃত্তি। একথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। শুধু আমাদের দেশে নয় বরং বিশ্বের সকল দেশের নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃত। দলমতের উর্দ্ধে থেকে দেশের সকল নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আর এ দায়িত্ব পালনে যত প্রকার সহযোগিতা দরকার তা প্রদানে রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তাও প্রদান করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। শুধু তাই নয় সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ১৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'The Election Commission shall be independent in the exercise of its functions and subject only to this Constitution and any other law.’
অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছে। তাই নির্বাচন কমিশন স্বাধীন নয় একথা বলার দৃশ্যত কোন যৌক্তিকতা থাকে না। সংবিধান ও আইন ছাড়া অন্য কারো কাছে নির্বাচন কমিশনের কোন দায়বদ্ধতা নেই।
কিন্তু বাস্তবতা আমাদের জন্য মোটেই সুখকর নয়। এ নিয়ে বাজারে অনেক কথা চাউর থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য আমাদেরকে বেশ হতাশ করেছে বলেই বলতে হবে। তার কথায় নাকি কিছুই হয় না এই কথাটা এই সাংবিধানিক পদাধিকারীর জন্য যেমন বেমানান, ঠিক তেমনিভাবে দেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক বৈকি !
যাহোক বর্তমান নির্বাচন কমিশন অনেক বিতর্কেরই জন্ম দিয়েছে। কমিশন সব সময়ই ক্ষমতাসীনরে আনুকুল্য দিয়েছে একথা তো বহুল আলোচিত বিষয়। এতে ক্ষমতাসীনরা যতটা না দোষী তারচেয়ে বেশী দায়ি নির্বাচন কমিশন। অধীনস্তরা প্রভূভক্তিকে নিজেদের ধর্মকর্ম মনে করলে কে না পূলকবোধ করে? কারণ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন প্রভূ ভক্তিতে অতীতের সকল রেকর্ডই ভঙ্গ করেছে। ৫ জানুয়ারির একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচন করার কলঙ্কতিলক এই কমিশনেরই ললাটেই। একথা তো কেউই অস্বীকার করেন না!
যে নির্বাচনে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতির কথা বলা হয়। অথচ নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ১০ম জাতীয় সংসদের নির্বচনে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকায় ২৯ কেন্দ্রে কোন ভোটার ভোট প্রদান না করলেও ভৌতিক ভোটের কোন অভাব হয়নি। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ মনোয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করলেও তার আবেদন তো নির্বাচন কমিশন তো গ্রহণ করেই নি বরং তিনি নির্বাচন না করেও রীতিমত সংসদ সদস্য। এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদও অলঙ্কৃত করেছেন। তা সম্ভব হয়েছিল রকীব কমিশনের করিৎকর্মার কারণে। আর এই নির্বাচন করতে গিয়েই ২৪ টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এমন অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত বর্তমান নির্বাচন কমিশন।
জানা গেছে, আগামী ফেব্রুয়ারীতে শেষ হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের মেয়াদ। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ কমিশনের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ৯ সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সম্প্রতি ইউপি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির ঘটনায় ইসির ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। সহিংস ইউপি নির্বাচনে তো ২ শতাধিক মানুষের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। ভোটারবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশ্ব গণমাধ্যমে সহিংসতা ও ভোটার না থাকার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।
বাংলাদেশের এক তরফা নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন উল্লেখ করে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিশ্ব গণমাধ্যম বাংলাদেশের নির্বাচনের খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যমগুলো বলেছে বিরোধী দলহীন নির্বাচনে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা গভীর সংকটে পড়বে। বিবিসি, রয়টার্স, এ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি), এএফপি, আল-জাজিরা, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী
সাময়িকী ফিনান্সিয়াল টাইমসসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রভাবশালী গণমাধ্যমেই বাংলাদেশের নির্বাচন ‘সহিংস’ এবং ভোটার ‘খরায়’ ভুগছে বলে মন্তব্য করেছে। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কড়া সমালোচনায় মুখর ছিল বিশ্ব গণমাধ্যম।
নির্বাচনকালীন সময়ে বিবিসির খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের বিরোধীদলের বর্জনের এ নির্বাচনে চলছে সহিংসতা। সংবাদ আটটেমে বাংলাদেশের নির্বাচনকে রেখেছে শীর্ষে। তারা শিরোনাম করেছে, সহিংসতা আর বয়কটের মধ্যদিয়ে চলছে ভোট গ্রহণ। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আগুন, ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণ, সহিংসতা ও নিরাপত্তাবাহিনীর সরাসরি গুলীতে হতাহতের খবরও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে সংবাদ মাধ্যমটি।
বিবিসি আরো লিখেছে, ৫০ হাজার নিরাপত্তাবাহিনী নিয়োজিত করার পরও সহিংসতার ভয়ে সাধারণ মানুষ ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী ফিনান্সিয়াল টাইমস অনলাইন সংস্করণে বলেছে, ভোটকেন্দ্র দখল, অগ্নিসংযোগ, ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের মধ্যে দিয়ে সকাল আটটা থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিরোধী দলহীন এ নির্বাচন পরিণত হয়েছে সহিংসতা আর গ্রেফতারের নির্বাচনে। একই মত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি নিউজও।
আল-জাজিরা ‘বাংলাদেশর নিবার্চনের মৃত্যু’ শিরোনামে তাদের অনলাইন সংস্করণে বলেছে, এক তরফা এ নির্বাচনে পুলিশের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ১১ জন নিহত হয়েছে। সহিংসতা হয়েছে কমপক্ষে এক হাজার ভোটেকেন্দ্রে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘এই নির্বাচন চলমান সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারবে না। সংসদে এই সরকারের কোনো বিরোধী দল থাকবে না। ফলে তারা গ্রহণযোগ্যতার গভীর সংকটে পড়বে।’
বিশ্বখ্যাত ফরাসি সংবাদ সংস্থা ‘এএফপি’ তাদের সংবাদ শিরোনাম করেছে, কেন্দ্রে আগুন ও পুলিশী আক্রমণের মধ্যদিয়ে চলছে ভোটগ্রহণ। সকালে ভোট কেন্দ্রগুলো খোলার পর সেখানে ভোটারদের কোনো লাইন দেখা যায়নি বলেও উল্লেখ করে তারা। পরবর্তীতে বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে ব্যর্থ নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচনী সততা প্রকল্প (ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট-ইআইপি) নামের একটি বৈশ্বিক প্রকল্প।
তারা বলেছে, এমন ব্যর্থ নির্বাচনের ফলে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়, ভোটার উপস্থিতি কমে যায় এবং সরকারের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বের ১০৭টি দেশের ১২৭টি নির্বাচনের ওপর করা জরিপের ভিত্তিতে তারা নির্বাচনী সততার ধারণা সূচক (পিইআই) প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে ১৫তম।
এক প্রাণঘাতি ইউপি নির্বাচনের পর এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পর এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ সিটিতে আগামী ২২ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবার কথা।
উল্লেখ্য, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসি ২০১২ সালে দায়িত্ব নেয়। এ কমিশনের অধীনে ২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কিছুটা শান্তিপূর্ণ হলেও পরবর্তী কমিশন সে ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক জালিয়াতি ও ভোট ডাকাতি হয়। ইসির এ ব্যর্থতার জন্য সর্বমহল থেকেই তীব্র সমালোচনা হলে ইসির কানে পানি প্রবেশ করেনি। বরং এসব বিতর্কিত ও কলঙ্কিত নির্বাচনের পক্ষে ইসি সাফাই গেয়েছে। ফলে রকীব কমিশন গণমানুষের কাছে বিশ্বস্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। বিশেষ করে সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে সরকারদলীয় সমর্থকদের হাতে সারা দেশে কয়েক হাজার আহত এবং দুই শতাধিক লোক নিহত হওয়ায় ইসির ভাবমর্যাদা ভীষণভাবে ক্ষুন্ন হয়।
এমতাবস্থায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারীতে শেষ হচ্ছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। মনে করা হচ্ছে যে, রকীব কমিশনের এটিই শেষ নির্বাচন। মূলত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে তা কোন ভাবেই স্বীকার করা হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টির পরোক্তভাবে হলেও আত্মস্বীকৃতি মিলেছে।
ইসি কর্মকর্তার বরাতে গণমাধ্যমে খবর বেড়িয়েছে যে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে ধস নেমেছে তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে। বিদায়ের আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদায়ের আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করে বদনাম ঘুচাতে চায় ইসি।
এ দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে এসিড টেস্ট হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। দলটির মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে বলা হয়েছে, তারা এ নির্বাচনকে এসিড টেস্ট হিসেবে নিয়েছেন। তিনি মনে করছেন ইতঃপূর্বে এ সরকারের সময় বর্তমান কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়নি। তার ভাষায় এ নির্বাচন কমিশন মেরুদন্ডহীন। নির্বাচন কমিশন ইতঃপূর্বে দেশ ও সারা বিশ্বে সমালোচিত হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশনের শেষ সময়। তারা মনে করছেন এ শেষ সময়ে নির্বাচন কমিশন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাবে।
মূলত ইসি কর্মকর্তার বক্তব্যের মাধ্যমে অতীতের নির্বাচনগুলো যে গ্রহণযোগ্য ছিল না তার আত্মস্বীকৃতি পাওয়া যায়। যাহোক ইসি বোধহয় বিলম্বে হলেও উপলব্ধি করেছে যে আগের নির্বাচনগুলো সম্পর্কে বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে এসেছে তার সারবত্তা অবশ্যই রয়েছে। কমিশনের উপলব্ধিটা বেশ বিলম্বিত হলেও সাধুবাদ জানাতে কার্পণ্য করাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে, দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যেভাবে ধ্বংস করেছে তা কি শুধু নাসিক নির্বাচনের মাধ্যমেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে?
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার সবগুলোয় ছিল চরমভাবে বিতর্কিত। কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে বিশেষ আনুকুল্য দেয়া হয়েছে বলেও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও নির্বাচন কমিশন তা মোটেই আমলে নেয়নি। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু প্রার্থীদের শো-কজ করা হলেও পরে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তাই বিরোধী দলীয় এক শীর্ষনেতা সরকারি দলের প্রার্থীদের শো-কজের বিষয়টিকে ‘প্রেমপত্র’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
কেউ নির্বাচন করতে না চাইলেও তাকে জোর করে নির্বাচন করানো এবং জিতিয়ে দেয়ার অভিনব রেকর্ড স্থাপন করেছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। মোট ভোটারের চেয়ে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যার আধিক্য কৃতিত্ব এই কমিশনের কব্জায়। জালভোট, ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই আর গণহারে সীল মারার ঘটনা তো রয়েছেই। মূলত বর্তমান নির্বাচন কমিশনই দেশের পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করেছে।
এতকিছুর পরও কমিশন জীবন সায়াহ্নে এসে আবারও ছন্দে ফেরার আশার বাণী আমাদেরকে শোনাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের সৃষ্ট অনাসৃষ্টি কি একমাত্র ‘নাসিক’ নির্বাচনের মাধ্যমে দূর করা সম্ভভ হবে? মূলত নির্বাচন কমিশনের এমন চিন্তাকে ‘আকাশ কুসুম’ হিসাবেই দেখছেন দেশের সচেতন মানুষ। কারণ, দেশের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নির্বাচনী সংস্কৃতিকে যেভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে তা অন্তত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষে পুনরুদ্ধার করা মোটেই সম্ভব নয়। ‘আয় লো সখী উইরা যাই’ বলার আগে নিজের ডানার সক্ষমতার কথাটাও ভাবতে হবে। কিন্তু বিদায়ী নির্বাচন কমিশনের যে লেজেগোবরে অবস্থা তাতে এমন আশা করাটা মোটেই যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয় না।
বিদায়ী নির্বাচন কমিশন হয়তো ‘নাসিক’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঙ্গাস্নান করে পাপমুক্ত হতে চাচ্ছেন। একথা মনে রাখা উচিত যে, পাপ মোচনেরও একটা সীমা-পরিসীমা আছে। পাপের ভান্ডার যদি খুবই সমৃদ্ধ হয় তাহলে গোলাপ জলেও দফারফা হবে বলে মনে হয় না। তাই গঙ্গাজলে অবগাহন করলেই যে সব কালো স্বেতশুভ্র হয়ে যাবে এমনটা মনে করাটাও যৌক্তিক হবে বলে মনে হয় না। যদিও গঙ্গাচলে পাপমোচন হয়েও যায় তবে বর্তমান কমিশন যাদের অধিকার হরণ করে অন্যদের আনকুল্য দিয়েছে তার শাপমোচন হবে কিভাবে ?
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা





