বাগেরহাটের রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বেশ জমে উঠেছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বারক সুন্দরবন সংলগ্ন হওয়ায় দেশীয়-আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদ, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী, রাজনৈতিক দল সহ দেশের প্রায় সকল শ্রেণির মানুষই এই প্রকল্পের বিরোধীতা করে আসছেন।

তারা দাবি করছেন প্রস্তাবিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবন অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে বা ঐতিহ্য হারাবে। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ইউনেস্কোও উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রকল্পটি নিরাপদজনক দুরত্বে স্থানান্তরের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে।

শুরু থেকেই ব্যাপক বিরোধীতা করা হলেও সরকার কারো প্রতিক্রিয়াকে তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছে বলে মনে হয় না বরং প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না বলে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকেও কাজে লাগানো হচ্ছে।

এমন কি বিরোধীতাকারীদের জাতীয় উন্নয়নের প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসাবেও আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এখানেই শেষ নয় প্রকল্প বিরোধীদের বিশেষ এক রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসাবেও উল্লেখ করা হচ্ছে। বিরোধীদের মাত্রা জ্ঞান ও যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। যা কিছুটা হলেও শিষ্টাচার বিরোধী বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

এমনও বলা হচ্ছে যে, যারা এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরোধীতা করছেন তারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। তবে যারা প্রকল্পের পক্ষে সাফাই গাচ্ছেন তারাও যে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন একথাও তো অস্বীকার করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আর কোন বিষয়ে কথা বলতে গেলেই যে বিশেষজ্ঞ হতে হবে এমনটা মনে করারও কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। মাথায় সজোরে আঘাত করলে যে জীবের মৃত্যু হবে এ কথা বলতে কাউকে গবেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

যাহোক প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে পক্ষে-প্রতিক্রিয়া এখন তুঙ্গে উঠেছে। একমাত্র সরকার ছাড়া এই প্রকল্পের কাউকেই কথা বলতে শোনা যাচ্ছে না। বিরোধীতা যত বাড়ছে, সরকার পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনও ততই তীব্র হচ্ছে। ভাবসাব এরকম যে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে দেশের সকল সমস্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যাবে। এদিকে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধীদের প্রযুক্তি জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী । দেশের উন্নয়নকে যারা বাধাগ্রস্ত করতে চায় তারাই রামপালের বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এই প্রকল্প কেউ আটকে রাখতে পারবে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার যেকোন মূল্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বদ্ধপরিকর।

প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ যখন মুখোমুখি অবস্থানে তখন এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ ভারতেরই পরিবেশ কর্মী বিত্তু সাহগাল। তার মতে, এ প্রকল্পের ফলে পরিবেশের ওপর অনিবার্য পরিণতি নেমে আসবে। এর দরুণ প্রকল্পের বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কাও রয়েছে। ‘ইন্ডিয়া ফর অ্যানিম্যালস’-এর চতুর্থ সম্মেলনের সাইডলাইনে দ্য হিন্দুকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পরিবেশবিদ বিত্তু সাহগাল বলেন, সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কার্বন শোষণকারী বন। সেখানে কয়লা চালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে বিনিয়োগ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। কারণ, এ প্রকল্পের দরুণ পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, যার ফলে পরিচলন সৃষ্টি হতে পারে। ঝড়ো বাতাস সমেত সাইক্লোন তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী ১০ বছরেই প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার ও আইইউসিএন’র একটি প্রতিবেদনে এ প্রকল্প সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্বেগ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাতাসে কয়লার ছাই, বর্জ্য জল ও ছাইয়ের দরুণ দূষণ তৈরি হতে পারে। বেড়ে যাবে জাহাজ চলাচল ও ড্রেজিং। এ ছাড়া ক্রমবর্ধমান শিল্প ও অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রভাবকেও সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করা হয়

দ্য হিন্দুকে পরিবেশবিদ বিত্তু সাহগাল আরো বলেন, প্রাণী ও মানুষের মধ্যে বিরোধের কারণ হলো মানুষ প্রাণীদের এলাকায় অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। বন্যপ্রাণী ও বাস্তুসংস্থান বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘স্যাঙ্কচুয়ারি এশিয়া’র এই সম্পাদকের ভাষ্য, ‘রাজনীতিবিদরা নির্বাচনে জিততে চান বলে বনের একটা অংশ মানুষকে দেয়ার কোনো মানে হয় না।’ মূলত পরিবেশবাদীদের সমালোচনা সত্তে¡ও ২০০ কোটি ডলার অর্থায়নে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেছে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশ ভারত।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রামপাল কেন্দ্রের ৭০ শতাংশ অর্থ ঋণ দেবে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। বাকি ৩০ শতাংশ পিডিবি ও এনটিপিসি যৌথভাবে বিনিয়োগ করবে। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কেন্দ্র স্থাপনে আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এর ১৫ শতাংশ হিসাবে ৩০ কোটি ২১ লাখ ৮৪ হাজার ডলার দিতে হবে পিডিবিকে।

এই প্রকল্পের অর্থায়ন করবে ১৫% পি ডি বি, ১৫% ভারতীয় পক্ষ আর ৭০% ঋণ নেয়া হবে। যে নীট লাভ হবে সেটা ভাগ করা হবে ৫০% হারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পি ডি বি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে। যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ এর দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সাথে মাওয়া, খুলনার লবন চড়া এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা তে যে তিনটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পি ডি বির সাথে সেখানে সরকার মাওয়া থেকে ৪ টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবন চড়া থেকে ৩টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে।

সরকার এর মধ্যেই ১৪৫ ডলার করে রামপালের জন্য কয়লা আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তার মানে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা দিয়ে পি ডি বি এখান থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে হবে সেটা এখন প্রায় নিশ্চিত। প্রস্তাবিত এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১৮৩০ একর ফসলী জমি অধিগ্রহণের ফলে ৮০০০ পরিবার উচ্ছেদ হয়ে যাবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মসংস্থান হতে পারে সর্বোচ্চ ৬০০ জনের। ফলে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭৫০০ পরিবার। শুধু তাই নয় আমরা প্রতি বছর হারাবো কয়েক কোটি টাকার কৃষিজ উৎপাদন।

কয়লাভিত্তিক যেকোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে অন্য যে কোনো প্রকল্পের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। বিশেষত ভষ্মিভূত কয়লার ছাই এবং উৎপন্ন গ্যাসের ফলে বায়ু ও পানি দূষণের যুগপৎ প্রভাবের কারণে এই ক্ষতি হয়। এ ধরনের প্রকল্প এলাকার আশেপাশের অঞ্চলে এসিড বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে যা বৃক্ষ এবং বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে ভয়ানক মাত্রায়।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায় যে, ২০১০ সালে দেশটির মোট কার্বন ডাই অক্সাইডের ৮১ ভাগ উদগীরণ করেছে
কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো, যা থেকে মোট শক্তির মাত্র ৪১ ভাগ পাওয়া গেছে।

এই সকল বিবেচনায় বিশ্বব্যাপি সকল দেশেই কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। সা¤প্রতিককালে এই ধরনের প্রকল্প এড়িয়ে চলার চেষ্টাটাই বেশি চোখে পড়ে। এ ধরনের কয়লভিত্তিক প্রকল্প প্রতি ৫০০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রায় ২.২ বিলিয়ন গ্যালন পানির প্রয়োজন হয়।

রামপালের প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে মেটানো হবে পশুর নদী থেকে। পশুর নদীর পানি নোনা ও মিঠা জলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রয়োজন মেটাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই নদীটির সাথে ওই গোটা অঞ্চলের সামগ্রিক জীববৈচিত্রের সংযোগ রয়েছে। এটি ওই অঞ্চলের জনবসতির ক্ষেত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা সেই নদীর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে ফেলছি বলেই মনে হচ্ছে।

এই প্রকল্প এলাকা সুন্দরবনের ঘোষিত সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর অঞ্চল থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। অন্যান্য দেশে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫-২০ কি.মি.-এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় না। এমনকি এই ভারতীয় কোম্পানিকেও তার নিজের দেশেই এই যুক্তিতে মধ্য প্রদেশে একটি অনুরুপ প্রকল্প করতে দেয়া হয়নি। ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে প্রস্তাবিত ১৩২০ মেগাওয়াট রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কি.মি. দূরে! আবার সুন্দরবন থেকে দূরত্ব আসলেই ১৪ কি.মি. কিনা সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে। খোদ ইআইএ রিপোর্টের এক জায়গায় বলা হয়েছে প্রকল্পের স্থানটি এক সময় একেবারে সুন্দরবনেরই অংশ ছিল। যা রীতিমত উদ্বেগজনক বলেই মনে হয়।

প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ৬৬০ মেগাওয়াটের দু’টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট থাকবে। প্রথম ইউনিটটি নির্মাণ করতে সাড়ে চার বছর সময় লাগবে। প্রথম ইউনিটটি নির্মাণের সাড়ে চার বছর সময় জুড়ে গোটা এলাকার পরিবেশ, কৃষি, মৎস ও পানি সম্পদের উপর অসংখ্য ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদরা।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করা হবে। ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে ইআইএ রিপোর্টে আশংকা করা প্রকাশ হয়েছে। ড্রেজিং এর ফলে নদীর পানি ঘোলা হবে। ড্রেজিং সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তেল- গ্রীজ ইত্যাদি নিঃসৃত হয়ে নদীর পানির দূষিত হবে। পশুরনদীর তীরে যে ম্যানগ্রোভ বনের সারি আছে তা নির্মাণ পর্যায়ে জেটি নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে কাটা পড়বে। নদী তীরের ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে ঝোপঝাড়ের বিভিন্ন পাখিবিশেষ করে সারস ও বক জাতীয় পাখির বসতি নষ্ট হবে।

ইআইএ রিপোর্ট মতে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। পশুর নদী থেকে প্রতি ঘন্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার করা হবে। যতই পরিশোধনের কথা বলা হোক, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি নির্গমন হলে তাতে বিভিন্ন মাত্রায় দূষণকারী উপাদান থাকবেই যে কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেলায় 'শূন্য নির্গমণ' বা 'জিরো ডিসচার্জ' নীতি অবলম্বন করা হয়। এনটিপিসিই যখন ভারতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রনির্মাণ করে তখন 'জিরো ডিসচার্জ' নীতি অনুসরণ করে অথচ রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইআইএ রিপোর্টে বলা হয়েছে- 'পরিশোধন করার পর তরল বর্জ্য বা ইফ্লুয়েন্ট ঘন্টায় ১০০ ঘনমিটার হারে পশুর নদীতে নির্গত করা হবে।' যা গোটা সুন্দরবন এলাকার পরিবেশ ধ্বংস করবে।

ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে ২৭৫ মিটার উচু চিমনী থেকে নির্গত গ্যাসীয় বর্জ্যওে তাপমাত্রা হবে ১২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস ফলে আশেপাশের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রেবছরে ৭,৫০,০০০ টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। কিন্তু আরো ভয়ংকর ব্যাপার হলো, একদিকে বলা হয়েছে এই বিষাক্ত ছাই পরিবেশে নির্গত হলে ব্যাপক দূষণ হবে অন্যদিকে এই ছাই দিয়েওই প্রকল্পের মোট ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে! এই বর্জ্য ছাই এর বিষাক্ত ভারী ধাতু নিশ্চিত ভাবেই বৃষ্টির পানি সাথে মিশে, চুইয়ে প্রকল্প এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানির স্তর দূষিত করবে যার প্রভাব শুধু প্রকল্প এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

উৎপাদিত বর্জ্য ছাই সিমেন্ট কারখানা, ইট তৈরি ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও আসলে বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্য ছাই কোনো সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহারের বদলে ছাই এর পুকুর বা অ্যাশ পন্ডে গাদা করে রেখে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, জেনারেটর, কম্প্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কয়লা উঠানো নামানো, পরিবহন ইত্যাদির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে ভয়াবহ শব্দদূষণ হয়। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার, নাইট্রোজেন, কার্বন ইত্যাদির বিভিন্ন যৌগ কিংবা পারদ, সীসা, ক্যাডমিয়াম, ব্যারিয়াম ইত্যাদি ভারী ধাতুর দূষণ ছাড়াও কুলিং টাওয়ারে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণেও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আকারে নিউমোনিয়াা জাতীয় রোগ ছড়িয়ে পড়বে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে আমদানী করতে হবে। আমাদানীকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে মংলা বন্দরে এনে তারপর সেখান থেকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর গভীরতা সর্বত্র বড় জাহাজের জন্য উপযুক্ত না হওয়ার কারণে প্রথমে বড় জাহাজে করে কয়লা সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আনতে হবে, তারপর আকরাম পয়েন্ট থেকে একাধিক ছোট জাহাজে করে কয়লা মংলাবন্দরে নিয়ে যেতে হবে। ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার টন কয়লা লাগবে।অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষে ২৬ হাজার টন কয়লা লাগবে। এর জন্য সুন্দর বনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ কিমি নদী পথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দও পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিমি পথ ছোট জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে!

সরকারের পরিবেশ সমীক্ষাতেই স্বীকার করা হয়েছে, এভাবে সুন্দরবনের ভেতরদিয়ে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে, কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লার গুড়া, ভাঙা /টুকরো কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানি সহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী-খাল-মাটি সহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে। চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুইপাশের তীরের ভূমি ক্ষয় হবে। কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দ দূষণ হবে। রাতে জাহাজ চলার সময় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণী সহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশু-পাখির জীবনচক্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

মূলত ভারতীয় কোম্পানি এন টি পি সি র মধ্যপ্রদেশে প্রস্তাবিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে। তাঁরা বলেছে,” বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য প্রস্তাবিত স্থানটি কৃষি জমি, যা মোটেই প্রকল্পের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া নর্মদা নদী থেকে প্রকল্পের জন্য ৩২কিউসেক পানি টেনে নেয়া প্রকল্পের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। কৃষি জমির সল্পতা, নিকটবর্তী জনবসতি, পানির সল্পতা, পরিবেশগত প্রভাব এসব বিবেচনায় এই প্রকল্প বাতিল করা হোক’। যে বিবেচনায় এন টি পি সি নিজের দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রনির্মাণ করতে পারেনি সেই একই বিবেচনায় বাংলাদেশে কী তাদের প্রকল্প বাতিল হতে পারেনা?

প্রকল্পে ১৫% বিনিয়োগে ভারতীয় মালিকানা ৫০%। বিদ্যুতের দাম পড়ছে দ্বিগুণেরও বেশী। উচ্ছেদ হচ্ছে ৭৫০০ পরিবার। কৃষিজ সম্পদ হারাচ্ছে দেশ। পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে বাংলাদশে কিন্তু ৫০% শতাংশ মালিকানা ভারতীয় কোম্পানির? ভারত মধ্যপ্রদেশে যে প্রতিষ্ঠানকে কাজের অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ সেই এনটিপিসিকেই সুন্দরবনের উপর ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ করে দিচ্ছে পরিবেশের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব তোয়াক্কা না করেই।

তার উপর ভারতীয় কোম্পানিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র লাভের করও দিতে হবে না। এটা কীভাবে জাতীয় স্বার্থের অনুকুলে হয়? এ প্রশ্ন এখন আত্মসচেতন মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু সরকার একেবারে নির্বিকার। তারা বোধহয় একেবারে জিদ ধরে বসেছেন যেকোন মূল্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। পুঁজারী ব্রাহ্মণের মত মরলেও ‘টিকি’ দিতে রাজী নয়। অপরদিকে বিরোধীরাও বলছেন ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী’।যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

মূলত বাস্তবতা পরিহার করে একগুয়েমী কোন ভাবেই কল্যাণকর হতে পারে না। প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকমহলের উদ্বেগ একেবারে উপেক্ষা করার বিষয় বলে মনে হয় না। যেহেতু এই প্রকল্প নিয়ে সকল মহলেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তাই এই বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল আচরণই জনগণ আশা করে। সরকারের অবস্থান ও প্রকল্প বিরোধীদের উদ্বেগ নিয়ে প্রকল্প বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সমীক্ষা চালানো উচিত। আর এই সমীক্ষায় যদি বিরোধীদের অবস্থানের যৌক্তিকতা থাকে তাহলে এই প্রকল্প বাতিল অথবা নিরাপদ কোন স্থানে স্থানান্তর করা উচিত। আসলে রামপাল-পীরপাল-দেবোত্তর বড় কথা নয় বরং জাতীয় স্বার্থকেই বড় করে দেখতে হবে। কোন বিষয় জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি হলে তা অবশ্যই পরিতাজ্য। এখানে আবেগ আশ্রিত হওয়ার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)