একজন লেখকের কাছে তার প্রকাশিত গ্রন্থ সন্তানসম । মাতৃত্ব-পিতৃত্বের মায়ায় মম-হৃদয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠের ফলে যেমন রোমাঞ্চিত আনন্দের রোমন্থনের স্রোত সৃষ্টি হয় তেমনি একজন লেখক সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতোয়ারা হতে পারেন তার চিন্তাকে দুই মলাটের মাঝে বন্দি করে ।
আসন্ন বইমেলায় আপনার/আমার অসংখ্য বন্ধুর প্রথম কিংবা প্রাথমিক লগ্নের সৃষ্টি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে শুনে আপনি/আমি হয়তো অপেক্ষা করছি বন্ধুত্বের খাতিরে সৌজন্য কপি পাওয়ার আগ্রহে । অর্থের বিচারে এটা সংকীর্ণ না হলেও চিন্তার বিচারে একজন লেখকে পিছিয়ে দেয়ার জন্য এটা মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে । প্রকাশনা শিল্প সম্পর্কে যারা জানেন তারা অবশ্যই অবগত যে, নতুন কোন লেখকের পান্ডুলিপি অর্থ ছাড়া প্রেসে যায়না । মাত্র ১০০ কিংবা ততোধিক মূল্যের একখানা বই ক্রয় করতে আপনাকে কোনভাবেই সমস্যার সম্মূখীন হতে হয়না কিন্তু একজন লেখককে যদি তার ৫০ থেকে ১০০ জন বন্ধু, সহপাঠী, অগ্রজ-অনুজকে সৌজন্য কপি বিলিয়ে খুশি রাখতে হয় তবে লেখকের ইচ্ছাশক্তি মুকুলে ধাক্কা খায় এবং অমিত সম্ভাবনার ইতি ঘটে ।
মনে রাখা উচিত, ইতিহাসের কোন পরতেই সাহিত্য চর্চার সাথে ধণী/অভিজাতরা(কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত) সম্পৃক্ত হয়নি । মধ্যবিত্ত কিংবা গরীব শ্রেণীকেই সাহিত্য টানে । হোক সে লেখক হিসেবে কিংবা পাঠক । অর্থের সীমাবদ্ধতা লেখকদের ছিলো, আছে এবং রইবে বলেই ইতিহাস স্বীকৃত । কাজেই একজন লেখককে পরিপূর্ণ বিকশিত হওয়ার সুযোগ কেবল একজন পাঠকই দিতে পারে । প্রেরণা এবং প্রশংসা সকল কাজের গতিকে ত্বরাণ্বিত করে । লেখকদের ক্ষেত্রে এসব আরও সহায়ক ভূমিকা নেয় । কাজেই শুধু বন্ধু-বান্ধব নয় বরং আপন স্বজনদের এমন কি বাবা-মা লেখক হলে সন্তানের এবং সন্তান লেখক হলে বাবা-মায়েরও উচিত বই কিনে পড়া । এতে একদিকে যেমনি লেখক প্রেরণা পাবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে তেমনি অন্যদিকে লেখাও সঠিকভাবে মূল্যায়ণ হবে । কেননা ফ্রিতে যা পাওয়া যায়, চিরকালই ওসবের প্রতি বাংলাদেশী মানুষ্য নামক জীবনের আগ্রহ কম থাকে !
আগামীর রাত পোহালেই বাঙালির জ্ঞানের খোরাক হয়ে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী বৃহৎ আয়োজনের বই মেলা । শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয় বরং তাবৎ বিশ্বের আনাচে-কানাচে যতগুলো বই মেলা হয় তার মধ্যে বাংলাদেশীদের দ্বারা আয়োজিত ভাষার মাস ফেব্রুয়ারীর বই মেলা অন্যতম আলোচিত এবং ব্যাপক পরিসরের । বাংলা ভাষায় এমন বৃহৎ পরিমন্ডলে এবং তাৎপর্্যমন্ডিত বই ও বইপোকাদের মিলন মেলা আর দ্বিতীয়টি কোথাও পাওয়া যায় না বলেই প্রমাণিত । এখানে লেখকের সাথে পাঠকের যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয় তা সত্যিকারার্থেই বিশ্বে বিরল । দেশী-বিদেশী লেখকদের নতুন বইয়ের মনোদ্বেলিত গন্ধে চিন্তার রন্ধ্র-রন্ধ্রের জাগরণ ঘটে ।
ভাষার মাসের বইমেলাতে হাজার হাজার নতুন লেখকের সৃষ্টি আলোর মুখের দর্শন পায় । আগামীর কোন নজরুল-রবীন্দ্রনাথ তুল্য মহান কবি-সাহিত্যিকের পথচলার এটাই প্রারম্ভিকা হয়তো । আজকের নবীন লেখকদের দ্বারাই হয়তো সম্মৃদ্ধ হবে বিশ্ব সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাসের ভান্ডার । পুরানো কিংবা প্রতিষ্ঠিত লেখকদের কাছেও বই মেলা যেনো নতুব যৌবনের স্পর্শ-অনুভূতি জাগ্রত করে । বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনা শিল্পেও ঘটে বৃহৎ জাগরণ ।
আমার ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের জগতে এমন শতাধিক লেখক রয়েছেন যাদের এই বই মেলাতে প্রথম সৃষ্টি উম্মোচিত হতে যাচ্ছে । তাদের আনন্দ দেখে অজানা শিহরনে শিহরিত হই । তাদের সৃষ্টির পাঠক হিসেবে নিজেকে নব্য-কান্ডারিদের ভক্ত-অনুরক্ত ভাবতেই ভালো লাগে । সমরেশ, হুমায়ুনদের ছায়া তাদের মধ্যে প্রতিভাত হচ্ছে অনুভব করে-নতুন করে স্বপ্ন আঁকি । আমার মত নগণ্য পাঠকের কাছে বইমেলা সর্বদাই বিশাল আবেদনের; হোক সে ফ্রেব্রুয়ারীর কিংবা অন্য কোন পার্বণের । কেননা স্রষ্টাদের সৃষ্টিতে চিন্তার পুরোটা ডুবিয়ে দুঃখ-ক্লেশকে পেছনে ফেলে নতুন ভূবন তৈরির এমন সুযোগ আর কোথায় পাওয়া যাবে ? তাইতো অনুরোধ, লেখককে প্রেরণা দিন, বই কিনুন । বই পড়ুন, আলোকিত জীবন গড়ুন ।
লেখক: কলামিষ্ট
fb.com/rajucolumnist/





