এক.
শিরোনামটি নেগেটিভ নয়। আমি নেগেটিভ মানসিকতা নিয়েও লিখছি না। কিন্তু নেগেটিভ হলো শিরোনামের বিষয়টির ব্যবহার। একজন প্রধানমন্ত্রী এক হাজার টাকার শাড়িও পরতে পারেন। তাতে কোনো দোষ নেই। ছয় হাজার টাকার শাড়ি পরিধানেও বাহবা পেতেই পারেন। আর সুইস ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা বাড়লে সেটা পজেটিভ সংবাদও হতে পারে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। কোন দেশের মানুষ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার এই প্রতিযোগিতা করছেন? বাংলাদেশের। আমাদের প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশ। যেই দেশে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে অর্ধ লক্ষাধিক টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে! কি জঘন্য পরিস্থিতি। আবার সেই দেশের মানুষ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার প্রতিযোগিতা করে।
পাঠক, এই খবরের সত্যতা দেখতে আমরা দৈনিক প্রথম আলোর এই সম্পর্কিত সংবাদটিতে চোখা বুলাতে পারি। ২৯ জুন ২০১৭ প্রথম আলো লিখেছে, “সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ আরও বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ জমা হয়েছে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে। অথচ সারা দুনিয়া থেকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ জমার পরিমাণ কমেছে।’’
পরিসংখ্যানটি এমন, ‘‘২০১৬ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ থেকে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় বিনিময় করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায় (বাংলাদেশি মুদ্রায় এক সুইস ফ্রাঁর বিনিময়মূল্য ৮৬ টাকা)। ২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ থেকে জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৫ কোটি সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগের বছরের চেয়ে এ জমার পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বা ২০ শতাংশ বেড়েছে।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসএনবির বার্ষিক এ প্রতিবেদন থেকে বাংলাদেশের অর্থ জমার এ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল—এই সময়ের মধ্যে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের জমা রাখা অর্থের পরিমাণও তিন গুণ বেড়ে গেছে।’’
অন্যদিকে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমার পরিমাণ ২০১৬ সালে এসে আগের বছরের চেয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।
মজার বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমান টাকা বাংলাদেশ থেকে পাঁচার হয়েছে। সরকারি দলের রুই-কাতলাদের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। মাঝে মাঝে আ্ওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করছেন। বিএনপি জোট ক্ষমতায় গেলে অর্জিত টাকা পয়সা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা টিকিয়ে রাখতে পারবেন না বলে তিনি গত সপ্তাহেও প্রকাশ্য সভায় সতর্কতা জারি করেন। এরই মধ্যে সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় গড়ে তোলার খবরে দেশবাসী অবাক হয়নি। বরং মন্ত্রী মহোদয়ের সতর্কতার ধারাবাহিক ফল হিসেবেই বিবেচনা করছে সবাই।
তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়ায় এইসব কালো টাকার পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুইস ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমার যে পরিমাণ বলা হচ্ছে, তা পুরোটাই বাংলাদেশ থেকে গেছে বিষয়টি তেমন নয়। দেশের বাইরে বৈধভাবে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসীর পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও সেখানে অর্থ জমা করছেন।’ ব্যাংক কর্মকর্তার এমন প্রতিক্রিয়ার পর সাউস ব্যাংকের টাকার উৎস এবং মালিকদের তালিকাটি বুঝতে আর পাঠকদের কষ্ট হচ্ছে না।
দুই.
‘‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতার সময় উদাহরণ টেনে নিজের পরনের শাড়ি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, শাড়িটি তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের দেওয়া। তিনি তাঁর কয়েকজন বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে সোনারগাঁ গিয়েছিলেন। সেখান থেকে জামদানি শাড়িটা কিনেছেন ছয় হাজার টাকা দিয়ে। তবে দাম চেয়েছিল সাড়ে ছয় হাজার টাকা।’’ দৈনিক প্রথম আলোর সংবাদটি এভাবেই লিখেছে।
তবে দৈনিক যুগান্তরের এ সংক্রান্ত সংবাদের অনলাইন ভার্সনের কমেন্টে জনৈক ব্যক্তি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, "সংসদ অধিবেশন শাড়ির দাম বলার জায়গা নয়।সংসদ দেশের আইন প্রনয়ন করার জায়গা। যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী পড়নের শাড়ির দাম বলেন, সে সংসদ দেশের জন্য কি আইন প্রনয়ন করবে? এ ধরনের নজির বিশ্বের কোন সংসদে নাই। এসব প্রমান করে আমাদের সংসদে কোন কাজ নাই বলে এভাবে সময় অতিবাহিত করেন। যদি সংসদে বিরোধী দল থাকতো তাহলে সরকারী দল শাড়ির আচলটা গোচানোর সময় পেত না। বিরোধী দল যেটা আছে সেটা সরকার দলের পোষা বিরোধী দল।যার নাম জাতীয় পার্টি (এরশাদ)। নেতা স্বৈরাচার এরশাদ আর নেত্রী স্বৈরচারানী স্ত্রী রওশন।"
আমার প্রশ্ন হলো, শাড়ির দাম, গান, আড্ডা আর গল্পের স্থল হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় সংসদ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সংসদ চালাতে মিনিটে খরচ হয় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। ঐ টাকা এদেশের খেটে খাওয়া মানুষেরা মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে পরিশোধ করে। পরচর্চা আর পরনিন্দা ছাড়া কিছুই হয়নি বিগত কয়েকবছর। নাচ, গান ও অভিনয় ছাড়াও নানা আয়োজনে বায়োস্কোপ দেখানোও হয়েছে এই মহান সংসদে। সর্বশেষ সংযোজিত হল পড়নের শাড়ীর দাম নিয়ে বক্তব্য। যদিও দাম কেউ জানতেও চাইনি। ৬ হাজার টাকার শাড়ীর মুল্য নিয়ে অনির্ধারিত ৪ মিনিট বক্তব্যে জাতি পরিশোধ করল ৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা!! এ ধরণের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরী। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে আজ শেখ হাসিনার যেমন দায়িত্ববোধ বাড়তো, তেমনি বিরোধী দলগুলোও জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারতো। সুইস ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা দেশে ইনভেস্ট করার ব্যবস্থা করা হোক। আর ৬ হাজারের শাড়ির গল্প বাদ দিয়ে জাতীয় সংসদ হয়ে উঠুক গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রতিষ্ঠান।
লেখক: রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মী।
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।)





