মূলত একদেশদর্শীতার কারণেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা অনেকটাই পির্ছিয়ে পড়েছি। আর সে ধারা এখনও অব্যাহত আছে। আর এ ধারা কতদিন অব্যাহত থাকবে তা নিশ্চিত করে বলা বেশ কষ্টসাধ্যই বৈকি। এজন্য আমাদের দাসপ্রবন মনোবৃত্তিই এজন্য দায়ি। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন মানসিক দাসত্বেরশৃঙ্খলমুক্ত হতে পারে না, তখন তাদের কাছে স্বাধীনতার কল্যাণটা রীতিমত অধরায় থেকে যায়।

আর যখন কোন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা এই সংকীর্ণ বৃত্তে আটকা পড়ে যান, তখন সে জাতির আত্মপরিচয়ও ম্লান হয়ে পড়ে। যা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় স্বত্ত্বার সাথে সঙ্গতিহীন। আর এমনটা কারো কাম্য হতে পারে না।

এক প্রভূর দাসত্বের নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে অন্য প্রভূর প্রভূর গোলামী অবলীলায় মেনে নেয়ার কখনো স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হতে পারে না। দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতি আমাদেরকে সে বৃত্তেই আটকে ফেলেছে। কি সরকারি দল, আর কি বিরোধী দল সবাই যেন সেই প্রভূ তুষ্টিকেই ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে ফেলেছে। যেকোন ভাবে ক্ষমতার মসনদ রক্ষা বা মসনদকে যেকোন উপায়ে করায়ত্বই করণই এদের মোক্ষম উদ্দেশ্য। আর এ ধারা যদি আগামী দিনেও অব্যাহত থাকে তাহলে আমাদের জাতিস্বত্ত্বার মৃত্যুর জন্য বহিঃশত্রুর প্রয়োজন হবে না বরং আমাদের আত্মঘাতি কর্মকান্ডই যথেষ্ট হবে। বিষয় ভাবনার নয় কী ?

কোন দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি না থাকলে সে দেশকে পুরোপুরি স্বাধীন মনে করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। অনেক ত্যাগ ও কোরবানীর বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও ক্ষমতাকেন্দ্রীক উচ্চাভিলাষের কারণেই আমরা ক্রমেই আত্মমর্যাদাহীন জাতিতে পরিণত হওয়ার পথেই অগ্রসর হচ্ছি। এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাদের ভাগ্য বিধাতা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। আর আমরা জ্ঞানসারে হোক বা অজ্ঞতসারে হোক সেই অদৃশ্য শক্তির পুঁজা-অর্চনাকেই নিজেদের কর্তব্য হিসাবে গ্রহন করেছি। তাই আমরা সে অশুভ বৃত্ত থেকে তো বেড়িয়ে আসার চেষ্টা তো করছিই না বরং উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতেই আমরা সে গর্হিত পথেই অগ্রসর হচ্ছি।

নতজানু বা পরাশ্রয়ী বিদেশনীতি কোন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। কিন্তু আমরা বোধহয় নিজেদেরকে সেই অন্ধকার গহ্বরেই নিমজ্জিত করছি। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনায় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বর্জন করেছে ভারত। প্রতিবেশি দেশের পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা।

দুই প্রতিবেশী দেশ যখন একসঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় তখন বোঝাই যায় এটা পূর্বপরিকল্পত। বা সমঝোতার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্তত ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক সেটাই বলে। আর এটা সম্ভব হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বদ্যানতায়। কারণ সার্কভুক্ত দেশ মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান বা শ্রীলঙ্কার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশি কাছের। তবে আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল ঢাকার শীর্ষ সম্মেলন বর্জন বিষয়ক বক্তব্যকে অজুহাত হিসাবেই দেখতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। তারা বলছেন, ভারতীয় নীতির সমর্থনেই ঢাকা সার্কর শীর্ষ সম্মেলন বর্জন করেছে। যা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় চেতনার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক আগের চেয়ে আরো সুদৃঢ় হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে ও যৌক্তিক কারণেই সার্বভৌম দুটি দেশের সম্পর্ক সমান হওয়ার কথা। চলমান প্রেক্ষাপটে সার্বিক দিক বিবেচনায় এর মারাত্মক ব্যত্যয় ঘটেছে বলেই মনে হয়েছে। ফলে একটি দেশ এমনভাবে কাজ করতে যাতে তাদের ভাবমূর্তি ‘ক্রীতদাস’ বা ‘আজ্ঞাবহ’ হিসেবে ফুটে ওঠেছে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে। বাংলাদেশ সম্পর্কে এমনটাই বলা হয়েছে ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে। প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে কারো কারো দ্বিমত থাকলেও বাস্তবতার বিষয়টা কিন্তু উপেক্ষা করার মত নয়।

সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে অবাধ নির্বাচনে শেখ হাসিনা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই তার জয় নিশ্চিত করেন। যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পর করেছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও পশ্চিম জার্মানি। আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের যে ‘বেদনাদায়ক’ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাড় করিয়েছে তা তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কখনই শেষ হবে না। যার কারণে বিচারক নিয়োগের দীর্ঘ সময়ের প্রচলিত প্রথা ভেঙে জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে নয়, তিনি তার পছন্দের বিচারকদের সর্বোচ্চ আদালতের বেঞ্চে বসিয়েছেন। একই কাজ করেছেন দেশের নির্বাচন কমিশনের বেলায়ও। দুই ক্ষেত্রেই বিষয়গুলোতে ‘টেকনিক্যালি নিরপেক্ষ’ থাকার চেষ্টা করা হয়েছে।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আরেক প্রথা ভেঙ্গছে। ১৯৯০ এর সময় থেকে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। শেখ হাসিনার দল যেহেতু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইনটিও বাতিল করল। এখানে বিরোধীদের বাধা দেওয়া বা মত তারা গ্রাহ্যই করেনি। সরকারের প্রভাবে সুপ্রিম কোর্টও সাংবিধান সংশোধনীর পক্ষে রায় দেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষদের তত্ত্ববধানের পাস হওয়া সংবিধানি সংশোধনী কীভাবে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলো তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েই গেছে। যেমনটি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে।

এত সব কর্মকান্ডের পর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এবং আওয়ামী সরকারের কাজকর্ম ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার দাতাগোষ্ঠী যে সরলভাবে দেখবে তেমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এমনকি গণমাধ্যমের ওপরও তারা খড়গহস্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘চেতনা’ বিরোধী সংবাদপত্র ও চ্যানেলগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। বেশ কয়েকজন নামীদামী সাংবাদিককে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের পরিবারের সদস্য নিয়ে কোনো মন্তব্য করলেও সাইবার অপরাধ আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলে এ নির্বাচন বর্জন করে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয় বিরোধী দল। কিন্তু বিরোধী দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশি নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে তাদের। ফলে নির্বাচনে সরকারের অবৈধ প্রভাব বিস্তারের বিরোধী দলীয় অভিযোগটিও জোড়ালো ভিত্তি পেয়েছে।

২০১৫ সালে এটা সবার কাছেই স্পষ্ট হলো শুধু সরকার নয়, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যবসায়িকদের প্রতিষ্ঠান, বার কাউন্সিল, সাংবাদিকদের সংগঠন। এরপর...........। এনজিওগুলোও রয়েছে সরকারের নজরদারিতে। যেহেতু তাদের আর্থিক সহায়তা বিদেশ থেকে আসে। সেই সহায়তা আটকে যাওযার শঙ্কায় তারা সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে নিরপেক্ষ কোনো প্রতিবেদন দিতেও পারছে না। ফলে দেশে সুশাসনও বাধাগ্রস্থ হয়েছে।

এমনকি সাংবাদিকরাও এখানে স্বাধীনভাবে তাদের কাজ করতে পারছে না। সাংবাদিকরাও যে স্বাধীন নয় তা বুঝিয়ে দিতে বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৮৮টি মামলা করা হয়েছে।

এর আগে ১৯৯০ এর দিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে বড় ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। ওই সময়ে থেকেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এবং দেশের মানুষকে খুব ভালোভাবে চেনেন এবং জানেন। যেহেতু আইনশৃঙ্খরা বাহিনী তার সঙ্গে আছে সেহেতু কেউ চাইলে তার সরাতে পারেব না। এছাড়া তার সঙ্গে আছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতে অন্যতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের মতামতকে প্রাধান্য দেয়। কাজেই সার্কের মতো আঞ্চলিক সংস্থা নিয়ে তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আর ভারতকে অনুসরণ করে বাংলাদেশ যদি সার্ক সম্মেলনে না যাওযার সিদ্ধান্ত নেয় তবে তাতে বেশি বিস্ময়েরও কিছু নেই এবং শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছে।

‘দ্য ডিপ্লোমেট’ এর প্রতিবেদনে বিশেষ ক্ষেত্রে সরকারের দাসপ্রবণ মনেবৃত্তিসহ দেশের রূঢ় বাস্তবতার অংশ বিশেষ প্রকাশ পেয়েছে। আর তা আরও জোড়ালো ভিত্তি পেয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে।তিনি সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সম্মতি ব্যতীত যুদ্ধ ঘোষণা বা কোনো যুদ্ধে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই। গত ৪ অক্টোবর ঢাকায় সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেন।

দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দু’দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কী- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নয়াদিল্লিতে সাম্প্রতিক সফরে ভারতীয় সাংবাদিকরাও একই প্রশ্ন করেছিলেন। আমি তাদের বলেছি- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে। সবখানে ভারত আমাদের সহযোগিতা করে। ভারত যখন আক্রান্ত হবে নিশ্চয়ই আমরা (বাংলাদেশ) ভারতের সঙ্গে থাকব।”

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরির সেনাঘাঁটিতে এক হামলার ঘটনায় ১৯ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন। এর জন্য পাকিস্তানকে দোষারোপ করে আসছে ভারত। এই ঘটনার জের ধরে গত ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘সার্জিক্যাল’ হামলা চালানোর দাবি করেছে ভারত। এতে দু’জন পাক সেনা নিহত হয়েছেন। তবে পাকিস্তানের দাবি সার্জিক্যাল হামলা নয় স্বাভাবিক সীমান্ত গোলাগুলি হয়েছে। এদিকে পরদিন পাল্টা হামলায় ৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবিকে করেছে পাকিস্তান। তবে ভারত এ দাবি নাকচ করে দিয়েছে।

কূটনৈতিক বিরোধে বাংলাদেশ ভারতের অনুগামী হলেও রীতি অনুযায়ী যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন। এর আগে আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো ও বহুজাতিক বাহিনীতে সেনা পাঠানোর কথা বলা হলেও বাংলাদেশ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে এই প্রস্তাব এড়িয়ে যায়। সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসিবরোধী জোটে যোগদানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ জানিয়েছে, মুসলমানদের প্রধান দুই ধর্মীয় নগরী মক্কা ও মদীনা আক্রান্ত হলেই কেবল সেনা পাঠানো হবে।

ফলে ভারত আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ পাশে দাঁড়ানোর কথা বলতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বুঝিয়েছেন তার স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। আর ভারতের যুদ্ধে অংশ নিলে যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদির মতো মিত্র দেশের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান বাংলাদেশ কিভাবে উপেক্ষা করবে তাও পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়নের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের ২৫ (১৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা-এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি।”
“এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করিবেন; (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।” কাজেই যথাযথ বিস্তারিত কারণ না দেখিয়ে বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধে জড়ানোর সুযোগ নেই।

তবে সব কিছু ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে ঘোষণাটি কে দেবেন? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? জাতীয় সংবিধানের নবম-ক ভাগে ১৪১ ক (১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত 'জরুরি বিধানাবলী' অনুযায়ী 'যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের দ্বারা বাংলাদেশ বা উহার যে কোন অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন' হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি-স্বাক্ষর গ্রহণপূর্বক রাষ্ট্রপতি ৯০ থেক সর্বোচ্চ ১২০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। অন্যদিকে যুদ্ধ ঘোষণার বিষয়টি সংবিধানের চতুর্থ পরিচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

সংবিধানের ৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহের সর্বাধিনায়কতা রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত হইবে এবং আইনের দ্বারা তাহার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত হইবে”। আর ৬৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “সংসদের সম্মতি ব্যতীত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাইবে না কিংবা প্রজাতন্ত্র কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিবেন না”।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ যদি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশ নিয়ে আক্রান্ত হয় তাহলে সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে। সেক্ষেত্রে সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদের বিধান স্থগিত হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ১৪১ (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অন্তর্গত বিধানাবলীর কারণে রাষ্ট্র যে আইন প্রণয়ন করিতে ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে সক্ষম নহেন, জরুরি-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতা-কালে এই সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২ অনুচ্ছেদসমূহের কোন কিছুই সেইরূপ আইন-প্রণয়ন ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কিত রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করিবে না; তবে অনুরূপভাবে প্রণীত কোন আইনের কর্তৃত্বে যাহা করা হইয়াছে বা করা হয় নাই, তাহা ব্যতীত অনুরূপ আইন যে পরিমাণে কর্তৃত্বহীন, জরুরি-অবস্থার ঘোষণা অকার্যকর হইবার অব্যবহিত পরে তাহা সেই পরিমাণে অকার্যকর হইবে।”
এ ছাড়া জরুরি-অবস্থার সময় মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিত থাকবে। সংবিধানের ১৪১ গ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জরুরি-অবস্থা ঘোষণার ৯৫[ কার্যকরতা-কালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি] আদেশের দ্বারা ঘোষণা করিতে পারিবেন যে, আদেশে উল্লেখিত এবং সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অন্তর্গত মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎকরণের জন্য আদালতে মামলা রুজু করিবার অধিকার এবং আদেশে অনুরূপভাবে উল্লেখিত কোন অধিকার বলবৎকরণের জন্য কোন আদালতে বিবেচনাধীন সকল মামলা জরুরি-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতা-কালে কিংবা উক্ত আদেশের দ্বারা নির্ধারিত স্বল্পতর কালের জন্য স্থগিত থাকিবে।”

সর্বোপরি আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে,`Affirming that it is our sacred duty to safeguard, protect and defend this Constitution and to maintain its supremacy as the embodiment of the will of the people of Bangladesh so that we may prosper in freedom and may make our full contribution towards international peace and co-operation in keeping with the progressive aspirations of mankind.’

 

আর্থাৎ আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমরা যাহাতে স্বাধীন স্বত্ত্বার সমৃদ্ধি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্খার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারি, সেই জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য।

সার্বিক দিক বিবেচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষে অন্যকোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সুযোগ বা আগাম ইঙ্গিত দেয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আর এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও একমত নন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগ বাড়িয়ে ভারতের পক্ষে যুদ্ধ করার ঘোষণা প্রদান করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

গত ২ অক্টোবর বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন এটা ভারত ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা দুই দেশ বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করুন বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। এমনকি অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বিরূপ মন্তব্যের পরও দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে। দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক চলবে, ঝগড়াঝাঁটিও চলবে।

পাক-ভারত উত্তেজনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাষায় বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। যুদ্ধ হলে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি হবে। আমরা চাই দুই দেশ নিজেরাই তাদের সমস্যার সমাধান করুক।’

এমনকি জাতীয় সংসদে বক্তব্য দানকালে ভারত ও পাকিস্তানকে সংযত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী । তিনি বলেন, ‘আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় কোনও অশান্তি চাই না। এখানে কোনও দেশে সংঘাত-সংঘর্ষ হলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা এ অঞ্চলের মানুষের শান্তি চাই। ভারত ও পাকিস্তাানকে বলব, দেশ দুটিই যেন সংযত হয়।’ গত ৬ অক্টোবর দশম জাতীয় সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আসলে প্রত্যেক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মত আমাদেরও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি থাকা উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোথাও যেন একটা বিপত্তি ঘটছে বলেই মনে হচ্ছে। যা আগামী দিনে আমাদের দেশ ও জাতিস্বত্ত¦ার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। কোন বৈরি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষেত্রে আমাদের সংবিধানে সুষ্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। আর তা আমাদের হতে হবে জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট।

কিন্তু আবেগতাড়িত হয়ে কোন বন্ধু রাষ্ট্রের পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে বলে মনে হয় না। আর সংবিধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এমন এখতিয়ারও দেয় নি। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য খুবই সুষ্পষ্ট ও সময়োচিত। তাই আমাদেরকে আবেগ নির্ভর না হয়ে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের উপযোগী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে ‘কৃতদাসের হাসি’ গৌরবের কিছু নয়।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবিএইচ