সদ্য প্রকাশিত একটি সংবাদে সারাদেশেই তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি তা দেশের গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও স্থান করে নিয়েছে।

খবরটি যেমন গণপ্রশাসন ও বিচারবিভাগের জন্য স্বত্তিদায়ক হয়নি, ঠিক তেমনিভাবে তা দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাকরই বলতে হবে। তাই এই সংবাদটিকে লুফে নিয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

খবরটি বিবিসি খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচারও করেছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বঙ্গুবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বরিশালের অগৈলঝড়া উপজেলার সাবেক ও বর্তমানে বরগুনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সলমনের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

স্বাধীনতা বিদসে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতার পুরস্কার প্রাপ্ত স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের রহমানের অঙ্কিত চিত্র দাওয়াতপত্রে ছাপানো বিষয়ে এই মামলা করা হয় বলে জানা গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে দাওয়াতপত্রে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতভাবে ছাপানোর কারণে জাতির মানহানি ঘটেছে। আর এ জন্য দায়ি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে।

ফলে এঘটনার জন্য বরগুনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা গাজী তারেক সলমনকে অভিযুক্ত করে আদালতে ৫ কোটি টাকার মানহানী মামলা দেয়া হয়েছে। আর এ অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ইউএনও আদালতে জামিন আবেদন করলে বরিশালের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট অভিযোগ ইউএনওর জামিন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। যা দেশের আত্মসচেতন মানুষকে বিস্মিত ও হতবাক করেছে। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে বেশ উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

অবশ্য ঘন্টা দুই পরে তারেক সলমনের জামিন পুনর্বিবেচনা করে মঞ্জুর করা হয়ে। জামিন না মঞ্জুর করে আবার মঞ্জুর করার বিষয়টিও সাধারণ মানুষ ভাল চোখে দেখেছে বলে মনে হয় না।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাঠ পর্যায়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সর্বোপরি তিনি একজন মধ্যম সারির আমলা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি জামিন অযোগ্য হয়ে থাকে তাহলে তার জামিন না মঞ্জুরের বিষয়ে কারো কোন আপত্তি থাকা উচিত নয়। কারণ, আমাদের দেশের সংবিধান অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকই সমান বলে স্বীকৃত।

আমাদের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ The State shall endeavor to ensure equality of opportunity to all citizens.’ অর্থাৎ সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।

তাই একজন আমলার ক্ষেত্রে আইন শিথিল হবে এমনটা মনে করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ, পদপদবী, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অনুযায়ি যদি আইনের প্রয়োগ ভিন্নতর হয় তাহলে দেশে সুশাসন আছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। আর তা গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে মোটেই কাঙ্খিতও নয়।

তাই একজন আমলার বিরুদ্ধে মামলা এবং তার জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো নিয়ে কারো কোন আপত্তি থাকা উচিত নয় যদি তা যথাযথ প্রক্রিয়া, আইন ও সংবিধান মেনে করা হয়। তাই একজন থানা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল অফেন্স ও কগনিজেন্স নেয়া কতখানি যৌক্তিক হয়েছে তা আলোচনা-পর্যালোচনার দাবি রাখে বৈকি।

প্রথমেই অভিযোগে ধরন নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। অভিযোগটা হলো বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির । এখন বিকৃত কাকে বলে সেটা নিয়ে তো আলোচনা আবশ্যক। সাধারণভাবে আমরা কোন কিছুর অবয়বকে ভিন্নতর অবয়ব দেয়াকে বিকৃতি বলি। যেমন কোন মানুষের অঙ্গচ্ছেদনকেও বিকৃত বলা হয়। তাই কোন ব্যক্তি অথবা কোন বস্তুর চিত্র অঙ্কনের সময় অবয়বের কোন অংশ বাদ দিলে বা কোন ব্যক্তিকে অসম্মান করার জন্য ব্যঙ্গাত্মক চিত্র অংকন করলে তা বিকৃতির পর্যায়ে পরে।

যেমন কোন ব্যক্তির চিত্র অংকনের সময় নাক কাটা, কানকাটা বা যে কোন ভাবে অঙ্গহীন করে অঙ্কন করাকে বিকৃত বলা যেতে পারে। চেয়ারের ৪ পায়ার স্থলে যদি দু’একটি পা কম করে অঙ্কন করা হয় তাহলে চেয়ারের চিত্র বিকৃতি হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানান্তরকেও অনেক সময় চুরি বলে আখ্যা দেয়া হয়। কিন্তু অঙ্কন শিল্পির অদক্ষতা ও চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে চিত্রের শৈল্পিক মানের যদি তারতম্য ঘটে তাহলে কোন ভাবেই তা বিকৃত বলার সুযোগ নেই।

কারণ এটা স্বতঃপ্রণোদিত নয় বরং শুধুই শিল্পির শিল্পের দুর্বলতা। আর সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কর্মকে আপরাধ বলে আখ্যা দেয়ার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। দেশের প্রচলিত আইন তো এমনটিই বলে।

নালিশি ঘটনার ক্ষেত্রে যা হয়েছে তাতে ছবি বিকৃতি ঘটার মতো কোন ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। কারণ, এটি ছিল উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে একটি নান্দনিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। যা ছিল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সৃজনশীল ও অতিপ্রশংসনীয় কর্ম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও গভীর শ্রদ্ধার ফসল।

শিশু চিত্রকররা তাদের ক্ষুদে প্রতিভা, রং তুলির অদক্ষ আঁচরে ও অপরিশীলিত শিল্প মাধুর্য দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে এবং বিচারকদের বিচারে সেরা দু’টি চিত্রকর্ম বাছাই করে দাওয়াত পত্রে ছাপানো হয়েছে। আর অভিযোগ করা হয়েছে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী অদ্রিজা করের আঁকা ছবিটি দাওয়াত পত্রের পেছনের পাতায় ছাপাকে কেন্দ্র করে। দাওয়াত পত্রে মুদ্রিত বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যা কোন যুক্তিতেই ধোপে টেকে না বরং তা অভিযোগকারীর বিকারগ্রস্থতাই প্রমাণ করে।

মূলত চিত্রের শিল্প বিচারের শিল্পির শিল্প উত্তীর্ণ হওয়া এক কথা আর ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে অসম্মান করার জন্য বিকৃত আরেক কথা। অদ্রিতা করের অঙ্কিত চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশও করা হয়েছে। চিত্রটি কেউ কেউ উৎকৃষ্ট মানের নাও মনে করতে পারেন কিন্তু এতে যে ছবি বিকৃতি বা জাতির মানহানি হওয়ার মত ঘটনা ঘটেনি তা জোরালোভাবেই বলার সুযোগ আছে। আর এটি কোন পেশাদার শিল্পির শিল্পকর্ম নয় যে তা কালোত্তীর্ণ হতে হবে বরং এটি ছিল ৫ম শ্রেণির পড়া একজন শিশু শিল্পির চিত্রকর্ম।

চিন্তুার সুস্থতা থাকলে এই শিশু শিল্পিকে সাধুবাদই দিতে হবে। কিন্তু এই চিত্রকে কেন্দ্র করেই অনাকাঙ্খিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে। অতিউৎসাহী হয়ে একজন আমলার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোকে আদালতে মামলাও দেয়া হয়েছে এবং আদালত তা কগনিজেন্সও নিয়েছে। এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার কয়েক ঘন্টার কারাবাসও হয়ে গেছে।

অঙ্কন শিল্পি অদ্রিজা করের মধ্যেও একটা অজানা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। না জানি এ কারণে তাকেও হয়রানীর শিকার হতে হয় কী না ? যা জনমনে নানাবিধ প্রশ্নে সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাও যদি এমন অনাকাঙ্খিতভাবে নাজেহালের শিকার হন তাহলে আমাদের মত আমজনতার কী অবস্থা হবে তা আত্মসেচতন মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।

একজন শীর্ষ আমলা আইনের যথাযথভাবে সুযোগ পেলেন না এই জন্য বলবো যে, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে সরকারের অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তারিক সলমনের ক্ষেত্রে সে বিধি উপেক্ষা করে মামলা গ্রহণ ও তার বিরুদ্ধে কগনিজেন্স নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। যা একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার হাজতবাস পর্যন্ত যেয়ে ঠেকেছে।

তাই কোথাকার জল কোথায় দিয়ে পৌঁছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এ নাটকের শেষ দেখার জন্য আমাদেরকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের একজন আমলা কেন আইনী সুবিধা পেলেন না, আর যাদের কারণে তিনি অনাকাঙ্খিতভাবে হেনস্থা হলেন তাদেরই বা কী হবে ? এ প্রশ্নই এখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

মূলত এ ঘটনার দ্বারা প্রমাণ হয় দেশে আইন ও সাংবিধানিক শাসন নেই। রাষ্ট্রর সকল ক্ষেত্রেই চলছে স্বেচ্ছাচারিতা। রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। সরকার জনগণের জন্য সুশাসন উপরহার দিতে পারছে বলে মনে হয় না। আর রাজনীতিকদের এই নেতিবাচক চিন্তা-চেতনার আমাদের দেশ এখনও কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি বরং গোষ্ঠিকেন্দ্রীক ও আত্মকেন্দ্রীক রাজনীতি আমাদের জাতিস্বত্বাকে ক্রমেই হীনবল করে দিচ্ছে।

অবস্থার যত দ্রুত অবনতি হচ্ছে তাতে হয়তো আমাদের জাতিস্বত্তাই একদিন অস্তিত্ব সংকটে পরবে বলেই মনে করা হচেছ।

একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্মানহানী ও নাজেহালের বিষয়টি জাতি কোনভাবেই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। আর তা সঙ্গতও নয়। এমনকি খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সরকারের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে ‘এ্যাডমিনিসট্রেটিভ সার্ভিস কমিশন’ কড়া বিবৃতি দিয়ে তাদের আমলাতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন।

গণরোষ ও গণধিক্কারের মুখে এই মামলার বাদীকে এ্যাড. ওবায়দুল্লাহকে সরকারি দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় আমরা কেউই খতিয়ে দেখছি না। দেশে কেন এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে, আর তার প্রতিকারেরই বা কী পথ আছে তাও আমরা খতিয়ে দেখছি না। একজন আমলা নিগ্রহের ঘটনাকে করে আমরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সমর্থ হয়েছি কিন্তু অন্য নাগরিকদের ক্ষেত্রে আমরা তেমনটি করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। আমাদের মূল ব্যর্থতা তো সেখানেই।

দেশে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয় বরং দেশের একশ্রেণির অসাধু রাজনীতিকদের কাছে গোটা দেশই জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ উদ্ধারের বলি হয়ে কত শত মানুষ যে নিগ্রহের স্বীকার বা সর্বশান্ত হচ্ছে এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া খুবই দুষ্কর। ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিককে নাজেহাল করেছে বলে গণমাধ্যমে সবিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

একথা বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয় যে, প্রচলিত নেতিবাচক রাজনীতি ও সুশাসনের অভাবেই জনজীবন দুর্বিসহ উঠেছে। আমলা নিগ্রহের ঘটনা এসবের ধারাবাকিতা মাত্র। মূলত এতে কোন অভিনবত্ব দেখা যাচ্ছে না। যতদিন সুস্থ্যধারার রাজনীতি এবং আইন ও সাংবিধানিক শাসন ফিরে না আসছে ততদিন এ ধরনের ঘটনার বারবারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে এতে সন্দেহ করার কোন অবকাশ থাকে না।

সুশাসনের অভাবেই জনজীবনে যেমন শান্তি নেই ঠিক তেমনিভাবে মানুষ জানামালের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কোন ক্ষেত্রেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। আইন ও সংবিধান এখন প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আর আইনের শাসনের অনুপস্থিতির কারণেই দেশে হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ ও গুপ্তহত্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে দেশে অন্যায়ভাবে আটক গুমের ঘটনা বিষয়ক একটি প্রতিবেন প্রকাশ করেছে। এতে দেশের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও সরকার পক্ষ এটিকে মিথ্যা প্রচারণা বলে দাবি করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তা যৌক্তিকভাবে খন্ডন করতে পারেনি। এতে রাষ্ট্র পক্ষের দৈন্যতায় প্রকাশ পেয়েছে। যা কারো কাম্য ছিল না।

দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড কোন ভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বিষয়ে একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। এতে বলা হয়েছে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৮৫ জন মানুষ। যদিও বিষয়টি সরকার পক্ষ জোরালোভাবে অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সম্প্রতি সাভারের সরকার দলীয় এমপি ডা. এনামুর রহমান মানবজমিন প্রত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন তার দেয়া ১৪ জনের তালিকা থেকে কয়েকজনকে ক্রসফায়ার দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে।

যা সরকারের ক্রসফায়ার সংক্রান্ত এতদিনের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের আত্মস্বীকৃতি বলে মনে করছেন দেশের সচেতন মানুষ। যদিও তিনি বিবৃতি দিয়ে তার এই প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কিন্তু মানুষের যা বোঝা দরকার তা তো বুঝে গেছেন। হত্যার আত্মস্বীকৃতি দিয়ে তা প্রত্যাহার করে নিলেই নিজেকে দায়মুক্ত করা যায় না।

গণপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তার সম্মানহানীর বিষয়ে আমরা যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলেও আর সকল ক্ষেত্রেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার পক্ষও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের আর্ত-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিতভাবে রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত নাগরিকের সম্মানহানীর ঘটনা এই প্রথম নয় বরং হরহামেশায় চলছে।

এ থেকে মুক্ত নন দেশের শীর্ষ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীমহল, সুশীল সমাজ, আইনবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষক সমাজ সহ কোন শ্রেণির পেশার মানুষ। রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাদর্শী হওয়ার কারণে দেশের শীর্ষ রাজনীতিকদের হেনস্তার অভিযোগটিও বেশ জোড়ালো। ভিন্নতমের কারণে বিভিন্ন পেশাজীবীরা নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হচেছন বলেও অভিযোগ আছে।

আর বঙ্গবন্ধু আর প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃতির অভিযোগে যে কত মানুষ অহেতুক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন তা সর্বসাম্প্রতিক ঘটনা থেকে দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে হওয়ায় বাস্তব ঘটনাটা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে হলে ঘটনাটা ভিন্নরূপ নিতে পারতো।

আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এমন অভিযোগ যে কত শত হয়েছে, আর কতলোক যে সর্বশান্ত হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করা বেশ দুষ্কর। তাই এ ধরনের স্পর্শকাতর অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রেই আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণই কাম্য। আর এ বিষয়ে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

একজন আমলার সম্মানহানীর ঘটনা নিয়ে সারা দেশেই তুলকালাম কান্ড ঘটে গেছে। এমনকি যে বিচারক তার বিরুদ্ধে আদেশ দিয়েছেন তার নাড়ী-নক্ষত্রের খোঁজ নেয়া শুরু হয়েছে। তিনি কোথায় কী করেছেন তা নিয়েও ব্যাপক পর্যালোচনা চলছে। তিনি সার্কিট হাউসের ভাড়া পরিশোধ করেননি এ বিষয়টিও গণমাধ্যমে এসে গেছে।

কিন্তু যাদের দায়িত্বহীনতার কারণে এই বিচারিক কর্মকর্তার কাছে সরকারি তহবিলের অর্থ অনাদায়ি থেকে গেল তাদের সম্পর্কে কিছুই বলা হচ্ছে না। একজন আমলা নাজেহাল হয়েছেন সত্য কিন্তু একশ্রেণির আমলার দ্বারা যে কত মানুষ নাজেহাল হয়েছেন তা কিন্তু আমরা একবারও ভেবে দেখছি না। একশ্রেণির অসাধু আমলার কারণে কত মানুষ যে সর্বশান্ত হয়েছেন তাও তো খতিয়ে দেখার বিষয়। সব আমলার আমলনামা যে সমান তা কিন্তু নয়।

আমলা কর্তৃক শিক্ষক পেটানোর ঘটনা আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রত্যক্ষ করেছি। শিক্ষক বলে সম্মান নেই এমনটা মনে করা সুস্থ্য চিন্তার পরিচায়ক নয়। তাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা জনগণের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন তাদের আত্মসমালোচনা করার সময় এসেছে। নিজেরা ক্ষতির সম্মুখীন হলে অতিপ্রতিক্রিয়া দেখাবেন আর অন্যের অধিকার নষ্ট করবেন এমনটা যেন কখনো না দেশের দেশের মানুষ সংশ্লিষ্ট সকালের কাছেই দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।

মূলত সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। প্রত্যেকটি নাগরিক আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা একটি মহতি উদ্যোগ নিয়ে মানহানীর শিকার হয়েছেন।

আর একজন ক্ষুদে চিত্রশিল্পি অদ্রিজা কর প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়েই এখন আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে। তাই এদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকেই বলষ্ঠ ভূমিকা লালন করতে হবে। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উড্রো উইলসন বলেছেন, ‘ A state is a people organized for law within a define territory.

অর্থাৎ ‘কোন নির্দিষ্ট ভূ-ভাগের মধ্যে আইনের মাধ্যমে সংগঠিত জনসমূহকে রাষ্ট্র বলে’। তাই রাষ্ট্রের সকল শ্রেণির নাগরিকের জন্য আইনের আশ্রয় লাভ ও অধিকার নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব কোন ভাবেই এড়াতে পারে না। তাই তারেক সলমনের পেশাগত দায়িত্ব পালন নির্বিঘ্নে ও অদ্রিজা করকে আতঙ্কমুক্ত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

(বি. দ্র: মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)