আমরা এখন হীরক রাজার দেশে বসবাস করছি। জনগণ যদি ভোট বাক্সে লক্ষাধিক ভোট দিয়ে কাউকে নির্বাচিত করে তাহলে সে তার কাঙ্খিত চেয়ারে বসতে পারবে না। কারণ হীরক রাজার নির্দেশের প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘ আইনী লড়াই লড়ে রাজশাহী, সিলেট ও হবিগঞ্জের মেয়ররা যখন নিজেদের কাঙ্খিত চেয়ারে বসতে গিয়েছিলেন ঠিক সেই মুহুর্তে একটি অকাঙ্খিত আদেশ তাদের বসার জায়গাকে নিষিদ্ধ করে ফেলেছে।বেচারাম ! দীর্ঘদিনের আইনী লড়াই, অর্থ সবকিছু শুভংকরের ফাঁকি।
আমি বলছিলাম আমাদের প্রিয় রাজশাহীর মেয়র বুলবুল ভাই, সিলেটের মেয়র আরিফ ভাই ও হবিগঞ্জের মেয়র গউসের কথা। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কি নির্মম দৃষ্টান্ত। জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হল শুধুমাত্র সরকারি দলের ক্রীড়ানক হতে না পারার কারণে ক্ষমতার চেয়ারে বসতেই পারল না। দেখতে দেখতে সময় পার হয়ে গেল হীরক রাজার দেশের নির্বাচন কমিশনার আগামী বছরের প্রথম দিকে নতুন নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়ে দিলেন।
কুমিল্লার জনগণ বুকে নৌকা নিয়ে ভিতরে গিয়ে ধানের আবাদ করলেন। সবাইকে চমকে দিয়ে সাক্কু জনগণের বিজয়ে আবারো মেয়র হলেন। এখন ভয় হচ্ছে তিনিও তো একই দেশে বসবাস করছেন। চেয়ারে বসার আগেই আবার নতুন আদেশে অন্য জনকে বসিয়ে না দেন।
দেশে এখন গণতন্ত্রের বিশাল চর্চা চলছে। গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে নেতাদের মুখে ফেনা তুলছে। আর অন্যদিকে গণতন্ত্র উন্নয়নের মোড়কে তলিয়ে গেছে।
চারিদিকে শুধু ব্রীজের ওপর ওভার ব্রীজ। মেধা উন্নয়ন মেধা চুরির উৎসবে দেশ মেতে উঠেছে। মালিবাগ-মৌচাকের জনগণের ভোগান্তির কথা মনে হলে আৎকে উঠি। এই তো সেদিন উন্নয়নের ছোয়াতে দুজন অকালে মৃত্যুবরণ করলো। তাদের জন্য কেউ শোকও দিল না। শোক দিবসও পালন করল না। কারণ তারা তো সাধারণ শ্রমিক অসাধারণ মানুষদের জন্যই যতসব উৎসব।
গত ২৮ মার্চ মোড়েলগঞ্জের নদীতে ট্রলার ডুবিতে ২২ জন না ফেরার দেশে চলে গেলেন। এখনো স্বজনরা অনেকের লাশ খুঁজছে। সেখানে ছোট্ট একটি সেতু হলে এভাবে বছরের পর বছর অপমৃত্যুর কবলে মানুষ পড়তো না। এতো উন্নয়নের ভিড়ে এই বাস্তবতাটুকু হয়তো কর্তাবাবুরা ভুলে গেছেন। পদ্মা, মেঘনা সেতু হলেও সেই ছোট্ট কচা নদীটির সেতু হওয়ার কোন নাম গন্ধই নেই। অথচ সেই এলাকায় বছরের পর বছর যোগাযোগ মন্ত্রীর বসবাস ছিল। একসময় মতিউর রহমান ছিলেন, পরবর্তীতে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও ছিলেন। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে তাদের ছোট্ট নদীটি একটি বারও পড়লো না। যে কথা শুরুতেই বলছিলাম প্লিজ চুপ করুন। কথা বলবেন না। কথা বললে হয় হামলা, নয় মামলা নতুবা চট্টলার জনপ্রিয় ছাত্রনেতা নুর আলম নুরুর মত নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হতে হবে।
আজো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় খিলগাঁওয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা নুরুজ্জামান জনির জন্য। যার মৃত্যুর ৩ মাস পর পৃথিবীতে নহর এসেছে। একটি দিনের জন্যও নহর তার বাবাকে বাবা ডাকতে পারেনি। গুম হওয়া ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ যারা আজো ফেরেনি তাদের পরিবার তাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতে থাকতে কেউ কেউ অন্ধত্ব বরণ করেছেন। তাদের জন্মদিন এখন দোয়ার দিনে পরিণত হয়েছে। এভাবে অবাক গণতন্ত্রের দিকে আমরা আর কত চেয়ে থাকবো। আজকাল আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কলম থেমে গেছে। কথা বন্ধ হয়ে গেছে।
ভয় আর আতংক আমাদেরকে মায়াপুরীতে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে আমরা কেউ বের হতে পারছি না। হতাশা আমাদেরকে নতুন মোড়কে গ্রাস করেছে। কিছু বলার আগেই আমরা হতাশ হয়ে যাচ্ছি। যেখানে সূচনাতেই হতাশা সেখানে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি কতটুকু ? যারা তৃণমুলে রাজনীতি করে গত ১০ বছরে অনেকের জীবনের কালবৈশাখী এসে গেছে। টর্নেডোর মতো সোনার সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। অপেক্ষা আর অপেক্ষা। সোনালী দিন আসবে। কিন্তু সেই দিন কবে আসবে। সেই সুর্য কবে উঠবে।
আসুন হতাশার সাগরে না ডুবে দৃঢ়তার মধ্যে নিজেদেরকে ডুবিয়ে ফেলি। অন্ধকার ভেদ করে নতুন সূর্য অবশ্যই উঠবে।
লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





