‘কারেন্ট হিস্ট্রি’র এপ্রিল সংস্করণে ‘দ্য ক্রাইসিস অব ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন আমার বন্ধু আলী রিয়াজ। এটা আমাকে এ. ই হাউজম্যানের স্মৃতিকাতর কবিতা ‘দ্য ল্যান্ড অব লস্ট কনটেন্ট’কে মনে করিয়ে দিয়েছে। হতে পারে তা সুখস্মৃতি। তার চেয়ে বেশি কষ্টের, বেদনার। হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ অথবা সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়ার মাঝে তা হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে চলমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে বর্তমানের রাজনৈতিক সঙ্কটের যোগসূত্র স্থাপন করতে রিয়াজ দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিয়েছেন। এটি একটি জটিল ইস্যু। রাজনৈতিক বৃত্তে এই ইস্যুটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা যেখানে টেনে নিয়ে এসেছেন নিঃসন্দেহে বলা যায় তা অবশ্যই গত দু’ দশকে বাংলাদেশ যে প্রভূত অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে, যারা অনেক দশক ধরে নিশ্চুপ ছিলেন অথবা সুপ্ত অবস্থায় ছিলেন তারা বেরিয়ে আসবেন। বেশির ভাগ মানুষ যে ইস্যুকে সরকারের ম্যান্ডেট হিসেবে দেখে তাকে একদলীয় সরকার ঠেলে একপাশে সরিয়ে রেখেছে। একদলীয় এই সরকারে রয়েছে একটি বিরোধী দল, যাদেরকে কিনে নেয়া হয়েছে এবং তার জন্য মূল্য দেয়া হয়েছে। রিয়াজ এটাকে প্রকাশ্য প্রহসন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সরকারের সামনে দু’টি কাজ ও আরেকটি নির্বাচন দেয়ার কথা। ১. বিরোধী দলের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতায় আসতে হবে যার প্রেক্ষিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন হতে পারে এবং সহিংসতার ইতি ঘটতে পারে। ২. স্বাধীনতা যুুদ্ধের সময় যারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছিল বলে অভিযোগ আছে জামায়াতে ইসলামীর সেই সব সদস্যের বিচার সম্পন্ন করা।
দৃশ্যত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করাকেই বেছে নিয়েছে এবং তারা নির্বাচন না দিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করছে। বিরোধীদলীয় নেতাদের অব্যাহতভাবে গ্রেপ্তার করে, কোন বিরোধী দলকেই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার সুযোগ না দিয়ে সরকার প্রধান বিরোধী দলকে প্রান্তসীমায় পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। বিরোধী দলপন্থি মিডিয়াকে নীরব করে রাখা হয়েছে অথবা তাদেরকে হুমকি দেয়া হয়েছে। শাসক গোষ্ঠীর সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’কে আহ্বান করছেন, যেমনটা আমরা শুনেছি বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী সম্পর্কে। মানবাধিকার লঙ্ঘন বেড়েছে। বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। সর্বশেষ স্থানীয় নির্বাচনে ব্যালট বাক্সভর্তি করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নেতারা তা নিয়ে বিজয়ের গর্বে বুক উঁচিয়ে চলছেন।
২০১৯ সাল নাগাদ এই হারে যদি এসব প্রক্রিয়া চলতে থাকে তাহলে শক্তিশালী আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো নিয়মিত কোন বিরোধী পক্ষ থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে বহুল আলোচিত উদার ধর্মনিরপেক্ষ মধ্য-ডানপন্থি তৃতীয় শক্তি সুশীল সমাজও থাকবে না। তারপরও যদি হুমকি থেকে যায় তবে আওয়ামী লীগ আইনগত পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে। তা হলো সম্ভাব্য কোন বিরোধী পক্ষ থাকলে তাদেরকে নির্মূল করতে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
মজার ব্যাপার হলো, জঙ্গি (কট্টরপন্থি) মুক্ত করার জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে এবং এতে সমর্থন দিয়েছে ভারত। কিন্তু অন্য অনেক পর্যবেক্ষকের মতো রিয়াজও বিশ্বাস করেন যে, সরকারের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী আচরণ কট্টরপন্থাকেই উৎসাহিত করবে। এটা পরিষ্কার বলা যায়। তিনি ঠিক বলেছেন। আমি জানি, তিনি কট্টরপন্থি (এক্সট্রিমিস্ট) শব্দটা অনেকটা বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করেছেন। হ্যাঁ, বাংলাদেশে কিছু জঙ্গি আছে। সরকারের পদক্ষেপে তাদের গায়ে নাড়া লাগবেই। এতে তারা নতুন করে সদস্য সংগ্রহে নামবে। কিন্তু এমন কিছু কট্টরপন্থি আছেন যারা জঙ্গি নন। তাদের সংখ্যাও অসীম নয়। তবে তারাও ভয়ানক। রাজনৈতিক দলের মধ্যে, বিশেষ করে বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যেও আছে এই কট্টরপন্থিরা। তারা তাদের নেতাদের অধিক কট্টর পদক্ষেপ নিতে পরিচালিত করবে সরকারকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে অথবা সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কট্টরপন্থিরা চলে যেতে পারেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। তাদের হাতে তখন অন্য কোন কাজ থাকবে না। তারা শুধু সহিংসতা ঘটাতে থাকবে।
জোর দিয়ে বলা যায়, এটাই সেই দল, যারা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারে, যাকে আওয়ামী লীগ ধ্বংস করার শপথ নিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার পাখার ওপর ভর করে অপেক্ষায় আছে। তাদের সৎ ও কার্যকর সুশাসনের বিষয়ে যে খ্যাতি রয়েছে তা বাংলাদেশীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এরা সেই সব বাংলাদেশী যারা দুর্নীতি ও বড় বড় দলগুলোতে স্বজনপ্রীতি দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তাই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার আগ পর্যন্ত যেসব স্থানীয় নির্বাচনগুলো হয়েছে তাতে তাদের বিস্ময়কর অর্জন প্রত্যক্ষ করা গেছে। যদি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের পুনর্জন্ম হয়, নাম পাল্টে ফেলা হয়, সংস্কার করা হয় এবং তারা যদি তাদের ভাবমূর্তিতে যে কলঙ্ক লেগেছে তা সাফ করতে পারে তাহলে তারাই হয়ে উঠতে পারে যোগ্য বিরোধী দল। আমি বিশ্বাস করি যে, জামায়াতে ইসলামীর ধর্মীয় যে দর্শন আছে তা বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ ভোটারের মাঝে আবেদন সৃষ্টি করবে না। কিন্তু যদি নতুন নামে আসা এই দল যদি একটি কার্যকর এবং সৎ সরকারের প্লাটফর্ম পায় তাহলে তারা দৃশ্যপট পরিবর্তন করে দিতে পারে। আমি শুনেছি বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধী তারা এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলছেন: আমরা আর কোথায় যাবো?
[b]লেখক:[/b] উইলিয়াম বি মাইলাম, ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন সেন্টারের একজন সিনিয়র স্কলার। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত।
[b]সূত্র:[/b] দ্য এক্সপ্রেস টিব্রিউন
মতামত
জনগণের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করেছে আ'লীগ
‘কারেন্ট হিস্ট্রি’র এপ্রিল সংস্করণে ‘দ্য ক্রাইসিস অব ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন আমার বন্ধু আলী রিয়াজ। এটা আমাকে এ. ই হাউজম্যানের স্মৃতিকাতর কবিতা





