দেশের মানুষের মধ্যে ফরমালিন আতংক ভর করেছে। চারিদিকে ফরমালিনে সয়লাব। শুধু মাছে নয়, শাকসবজি থেকে শুরু করে মধু মাসে মৌসুমি ফল, এমনকি জাতীয় রাজনীতিতে পর্যন্ত ফরমালিনের বিচরণ। এখন মধু মাস জৈষ্ট শেষের দিক। এ সময় ফলে ফলে ভরে যায় বাংলাদেশের প্রতিটি বাজার। দেশের মানুষও এ সময় তাদের চাহিদামত ফল বাজার থেকে কিনে । বাঙ্গালির এতিহ্যবাহী এ মাসে সকলের ঘরে ঘরে ফল উৎসব হয়। বিশেষ করে এ সময় গ্রামঞ্চলে মানুষেরা তাদের আত্বীয়স্বজনকে দাওয়াত করে ফল উৎসবের আয়োজন করে।
কিন্তু সবরকমের ফলে ফরমালিন মেশানোর কারণে বাজার থেকে ফল কিনে খাওয়ার প্রবণতা খুব কমে গেছে। মানুষ ফরমালিন আতংকে বাজার থেকে ফল কিনছে না। শুধু ফল নয় মাছের মধ্যে প্রচুর ফরমালিন থাকায় ক্রেতারা মাছ কিনতেও ভয় পাচ্ছে। মাছের বদলে তারা মাংস কিনছে। মাছে-ভাতে বাঙ্গালী এখন ফরমালিনের কারণে মাংস ভাতে বাঙ্গালী হয়ে যাচ্ছে। কারন ইদানিং শাক-সবজিতেও ফরমালিন মেশানোর প্রমান পাওয়া গেছে।
গত ২৭ মে মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করার সময় মাছে যথেষ্ট পরিমান ফরমালিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
শুধু ফরমালিন নয়। এ আদালত পরিচালনা করার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাছের মধ্যে কাপরের রং ও ঢেড়সের রসের অস্তিত্বও পায়। মাছের মধ্যে কাপরের রং দেয়ার উদ্দেশ্য হলো ক্রেতারা যাতে মাছের কানসা যাচাই করার সময় লাল রং দেখতে পায়। আর ঢ়েড়সের রস মিশানের হয় মাছের গায়ে এক ধরনের পিচ্ছিল আবরন পড়ার জন্য যাতে মাছকে তাজা মনে হয়। মাছের মধ্যে ফরমালিন মেশানোয় স্বাস্থ্য ক্ষতিতো রয়েছেই পাশাপাশি যোগ হয়েছে কাপরের রং যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
দেশের বাজারে মৌসুমি ফল আম, জাম, কাঠাল, লিচু ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমান ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। যার প্রমান প্রতিনিয়ত পত্রিকায় প্রকাশিত ভ্রাম্যমান আদালত অভিযানের মাধ্যমে জরিমানা। পত্রিকার পাতাজুড়ে পাওয়া যায় সারাদেশের ভ্রাম্যমান আদালতের জরিমানার খবর। ভ্রাম্যমান আদালত প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। এতে ফলে প্রচুর পরিমান ফরমালিন মেশানোর প্রমান মিলছে। ভ্রাম্যমান আদালত জরিমানাসহ ফরমালিনযুক্ত ফল ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর এই নিউজ প্রতিনিয়ত দেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াতে প্রকাশ হওয়ায় মানুষের মধ্যে এক ধরণের আতংক বিরাজ করছে। যার ফলে মানুষ বাজার থেকে ফল কেনা থেকে বিরত থাকছে। যাদের সামর্থ আছে বা যাদের পক্ষে সম্ভব তারা রাজশাহীর বাগান থেকে সরাসরি আম নিয়ে আসছে। যদিও এ সংখ্যা খুব সীমিত। আর বেশীর ভাগ মানুষ ফলের মৌসুমে আতংকে ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকছে যা সত্যিই অনাকাঙ্খিত এবং দু:খজনক।
কিছুদিন আগে সিদ্ধেশরী মাঠে রাজশাহী ও চাপাই নবাবগঞ্জের আমের মেলা বসেছিল সে মেলাতেও ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে আমে ফরমালিন খুঁজে পায় এবং বিক্রেতার উপর জরিমানা করে। পাশাপাশা ফরমালিনযুক্ত আমগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়। এ ধরনের আমের মেলায়ও যদি ফরমালিন পাওয়া যায় তাহলে মানুষের মধ্যে ফরমালিন আতংক সহসাই বাড়বে। ফলে মানুষ বাজার থেকে আম কিনে খাওয়াই এক রকম বন্ধ করে দিয়েছে। এ সময় ঢাকার রাস্তায় প্রচুর পরিমান আম বা অন্যান্য মৌসুলি ফলের দোকান দেখতে পাওয়া যায় যেখানে ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।
গত ২৫ মে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুসারে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ ও ‘খাদ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠনের বিষয়ে গেজেট প্রকাশ এবং তা বাস্তবায়নে দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ মে রাজধানীর মিরপুর, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি পান্থপথ, রামপুরা ও মতিঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ টিম। এ সময় সকল প্রজাতির দেশীয় ফলে উচ্চমাত্রার ফরমালিন পায় এ টিম।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আম, লিচু, মাছ ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমানে ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে যা উদ্বেগের বিষয়। পুরো জাতী আজ ফরমালিন আতংকে ভুগছে। আর আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা এ সমস্যা সমাধানের কাজ করা তো দূরের কথা তারা এটা নিয়ে রাজনীতি করছেন। ফরমালিনকে ব্যবহার করে একে অন্যকে ব্যঙ্গ করছে। এ ধরনের কর্মকান্ড আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে কাম্য নয়। রাজনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত এ সমস্যা সমাধানে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করা। জনগণের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ফরমালিন ব্যবহারের উপর বিধি-নিষেধ জারি করতে হবে। যেখানে সেখানে যাতে ফরমালিন বিক্রি না হয় সেদিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দিতে হবে। কারন, ফরমালিন সহজলভ্য হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সহজেই খাদ্যে ফরমালিন প্রয়োগ করছে।
এনজিও কর্মী ও কলাম লেখক, ঢাকা
ই-মেইল: [email protected]





