সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরতি দিয়ে সাংগঠনিকভাবে শক্তি বৃদ্ধির জন্য দল পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেছিল বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু নানা জটিলতায় আন্দোলনের মত দল গোছানোর কাজেও সফল হতে পারেনি ৮ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি।
বিএনপির প্রথম উদ্যোগে তৃণমূল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সারা দেশের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি পুনর্গঠনে নেয়া সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর পার হয়েছে গতকাল বুধবার। কিন্তু বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠনেও ব্যর্থ হয়েছেন। তারা নানা প্রতিবন্ধকতার কথা বলে কমিটি পুনর্গঠনে আরো সময় চাচ্ছেন।
তবে কেন্দ্রের নির্দেশনার পরও যারা এখনো কাজ শুরু করেননি, তাদের বিরুদ্ধে দেশে ফিরেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, দলের একটি সূত্রের এমনটিই দাবী।
সারাদেশে তৃণমূল থেকে দল পুনর্গঠনের লক্ষে গত ৯ আগস্ট ৭৫টি সাংগঠনিক ইউনিটের সংশ্লিষ্ট সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর কেন্দ্র থেকে চিঠি পাঠায় বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে যুগ্ম-মহাসচিব মো. শাহজাহান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দলের প্রতিটি পৌর, থানা, উপজেলা, জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করে কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার কোনোটিই কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি। একইভাবে ওয়ার্ড-থানা-পৌর কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিতেও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। এমনকি অনেক সাংগঠনিক ইউনিটের জেলা ও মহানগরের নেতারা তৃণমূলে পুনর্গঠন সংক্রান্ত কেন্দ্র থেকে পাঠানো চিঠির সাড়া দিচ্ছেন না।
এমতাবস্থায় কোনো অগ্রগতি না হওয়া অন্তত ১৫টি সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি ভেঙে দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে দলটি। তবে ইতোমধ্যে কেন্দ্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য লিখিত ও মৌখিকভাবে অন্তত ৪৫টি জেলা সময় চেয়ে কেন্দ্রের কাছে আবেদন করেছে বলে দফতর সূত্র জানিয়েছে।
আরও জানা গেছে, বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে কাউন্সিল করতে না পারলেও প্রায় ১৫টি জেলা সবগুলো ইউনিটের কমিটি গঠনের প্রাথমিক কাজ শেষ করেছে। অক্টোবরের মধ্যেই ওইসব জেলা কাউন্সিল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কেন্দ্রের নির্দেশ পেলেই তারা কাউন্সিলের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঠিক করবে।
সূত্র জানায়, বরিশাল মহানগর ও জেলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, রাজশাহী মহানগর, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা জেলা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম মহানগর, খুলনা জেলা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
কমিটি পুনর্গঠন প্রসঙ্গে সাংগঠনিক জেলার একাধিক নেতা জানান, কমিটিতে ত্যাগী পরীক্ষিতদের অগ্রাধিকার রয়েছে। এসব নেতাকর্মীদের অনেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়ে এখনো জেলে রয়েছেন। অনেকে আগাম জামিন না পাওয়ায় এলাকায় যেতে পারছেন না।
এছাড়া পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রস্তুতি সভা করলেও তাতে পুলিশ বাধা দিচ্ছে। ক্ষমতাসীনরাও পুনর্গঠনের কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তাই নীরবে কমিটি গঠন চলছে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা কঠিন। তাই সময় চেয়ে আবেদন করেছি বলেও জানান জেলা পর্যায়ের ওই নেতারা।
এছাড়াও দলের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ অঙ্গ-সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকদল, মহিলাদলসহ অন্যান্য সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচনও ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রায় একবছর হতে চললেও ছাত্রদলের পূর্নাঙ্গ কমিটি করা হচ্ছে না। আটকে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাখা ছাত্রদলের কমিটিও।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দল গোছানোর কাজ ব্যর্থ হয়েছে সেটি বলা যাবে না। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে যতটুকু অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। কারণ আমরা স্বাভাবিক রাজনীতি করতে পারছি না। নেতাকর্মীরা কোথাও জড়ো হতে পারছেন না। নেতাকর্মীরা জেলে থাকায় এবং অনেকে এলাকায় থাকতে না পারায় এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দল পুনর্গঠনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, দলের পুনর্গঠন চলছে। ঈদের ছুটির কারণে অনেক জায়গায় এখনও কমিটি গঠন হয়নি। আরো কিছু দিন লাগবে। অনেকে যোগাযোগ করেছেন তাদেরকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে যত দ্রুত সম্ভব কমিটি গঠন করে কেন্দ্রে পাঠাতে।
কমিটি পুনর্গঠনের সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে কাজ করছেন বিএনপির সহদফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। সারা দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে প্রতিনিয়ত অগ্রগতির খোঁজ-খবর নিচ্ছেন তিনি।
তাইফুল ইসলাম টিপু টাইমনিউজবিডিকে বলেন, কমিটি পুনর্গঠনে কেন্দ্র থেকে পাঠানো চিঠির সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশে ফিরলেই তৃণমূল পুনর্গঠনের চিত্র তার কাছে তুলে ধরা হবে। এজন্য কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, তৃণমূলের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রায় সারাদেশের ৭০ ভাগ থানা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিছু কিছু যায়গায় সমস্যা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করেছি। ঈদের কারণে প্রক্রিয়া কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এমএইচ/ এআর/কেবি





